পেছনে মস্তান দুটো ছুটে আসছে। ধর ধর করে চেঁচাচ্ছে। এই বাসে তারা উঠবেই।
কন্ডাক্টর পাদানিতে দাঁড়িয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে দেখল ধাবমান দুজনকে। বাস ছুটছে, তারাও ছুটছে।
শুধলো অবনীশকে, কী হয়েছে?
বদমাস।
বাসশুদ্ধ লোক চেয়ে আছে অবনীশের দিকে। ভাবলেশহীন মুখ। কেউ যদি কাউকে তাড়া করে এবং ধরে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে, কারও কিছু এসে যায় না। বরং নির্লিপ্ত থাকাই ভালো।
বাস থামাল না কন্ডাক্টর। পরের স্টপ গোলপার্কের সামনে। পেছনে মস্তান দুটি এসেও চেঁচাতে চেঁচাতে ছুটে আসছে। এই স্টপে বাসে তারা উঠবেই। তারপর কী হবে ভাবতেই আবার উপস্থিত বুদ্ধি খেলে গেল অবনীশের মাথার মধ্যে।
বাসে উঠেছিল পেছনের দরজা দিয়ে। স্টপে বাস থামতে না থামতেই নেমে পড়ল সামনের দরজা দিয়ে। ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ফুটপাত ঘেঁষে। ড্রাইভার বসে সিটে ঘাড় বেঁকিয়ে দেখছে কীসের এত শোরগোল।
বাস থেকে লাফ দিয়ে নেমেই ট্যাক্সির রাস্তার দিকের দরজা এক হ্যাঁচকায় খুলে ভেতরে ঢুকে গেল অবনীশ। সংযত স্বরে বললে, শিয়ালদা। ট্যাক্সি ড্রাইভার বোধহয় ওয়াকিবহাল এই ধরনের ফঁদ সম্পর্কে। তিলমাত্র কৌতূহল প্রকাশ করল না। একটা কথাও বলল না। স্টার্ট দিল ইঞ্জিনে।
মস্তান দুটি তখন ট্যাক্সির ঠিক পেছনে–বেঁধে! বেঁধে! কিন্তু বাঁধল না ট্যাক্সি ড্রাইভার। সে কারবার করতে বসেছে, শিয়ালদার প্যাসেঞ্জার ছাড়তে যাবে কেন? অথবা হয়তো কোনও ঝামেলায় জড়াতে চায় না। নয়তো স্রেফ মানবিকতা। ফঁদ কেটে সুদর্শন কিন্তু অনভিজ্ঞ একজন তরুণকে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যাওয়ার উদারতা।
মুহূর্তে বাঁ-দিকে টার্ন নিয়ে গোলপার্ক ঘুরে গড়িয়াহাটার মোড়ের দিকে ছুটল ট্যাক্সি।
.
ডক্টর বোস ঠক ঠক করে ছাইদানিতে পাইপ ঠুকে ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে টেবিলের দিকে চোখ নামিয়েই বললেন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডক্টর কাঞ্চন ঘোষকে, তুলে এনেছ?
ইয়েস স্যার।
খুব ট্রাবল দিয়েছে নাকি?
খুবই। চারজনে হিমসিম খেয়ে গেছি। গোড়ালি আর কবজি চেপে না ধরলে খাট থেকে নামানো যেত না।
কী করেছিল?
ঘুমোচ্ছিল।
ঠিক কটা বাজে তখন?
ঠিক একটা।
এই দুপুরে ঘুম। কেস-হিসট্রি অবশ্য তাই, চোখ তুললেন ডক্টর বোস।
অবসেশনাল ডিসঅর্ডার। চোদ্দো ঘণ্টা খালি স্নান আর পায়খানা। নিজেকে নোংরা বোধ করে। সন্ধে পর্যন্ত গরম লেবুর জল আর নুন খায় চারবারে চার লিটার। তারপর কলতলা। দশটা থেকে শুরু হয় খাওয়া। তিন লিটার দুধ, আমসত্ত্ব আর জোলাপ। তোমার কী মত, কাঞ্চন?
যা শুনেছি আর যা দেখলাম, তাতে মনে হয় হয় ইসিটি শক দিতে হবে–তাতেও না হলে ব্রেনের নার্ভ পাথওয়ে কেটে দিতে হবে।
হাসলেন ডক্টর বোস। পাইপ এখন দাঁতের ফাঁকে। ধোঁয়া বেরোচ্ছে নাকমুখ দিয়ে। কাঞ্চন, ইউ নো ভেরি ওয়েল, ওই দুটো পথ আমি মাড়াতে চাই না। ইসিটি শক রিমার্কেবল কাজ দেয় ঠিকই কিন্তু কীভাবে, নোবডি নোজ। ব্রেনের নার্ভ পাথওয়ে কেটে দিতে হলে ভেলোর যেতে হবে–রেজাল্ট ইজ আনোন। নো কাঞ্চন, নো সব ব্যাপারের কজ অ্যান্ড এফেক্ট আছে। মেয়েটির এই উল্কট ঘুচিবাই রোগেরও মূলে যে ঘটনা বা ঘটনাগুলো আছে–আমাদের তা জানতে হবে। যেদিন ও তা কবুল করবে, ওর ইমোশনাল টারময়েল চলে যাবে। এভরিথিং উইল বি নরম্যাল।
তা ঠিক। বিহেভিয়ার থেরাপির ম্যাজিক তো অনেকেই দেখে গেল। আমিও আপনার কাছে এসে দেখছি, হাসল কাঞ্চন। পাতলা পাকানো চেহারা। পাতলা হয়ে এসেছে মাথার চুলও। শ্যামবর্ণ। চাহনি কঠোর। মনের রুগিদের কাছে চাহনি আর কথার ম্যাজিক যে কি অদ্ভুত ফল সৃষ্টি করে, তা সে শিখেছে ডক্টর বোসের কাছে। টক থেরাপি ইদানীং পাশ্চাত্যের বহু মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে চমৎকৃত করেছে। কোনও ওষুধ না দিয়ে, শক না দিয়ে, অথবা নামমাত্র ওষুধ দিয়ে দিনের পর দিন গ্রুপ ডিসকাশন আর নানারকম কাজকর্মের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে পাগল হয়ে থাকা মানুষকেও উনি সুস্থ করে তুলেছেন।
চার্জ অবশ্য খুব বেশি। এই যে মেয়েটিকে এইমাত্র অভিজাত পল্লী থেকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে এল কাঞ্চন, এর জন্যেও প্রথম মাসে দিতে হবে চার হাজার। তারপর তিন হাজার। তারপর দু-হাজার। তারপর দেড় হাজার। জটিল কেস বলেই নার্সিং হোমে আনতে হয়েছে–এখানকার রেট তো বেশি হবেই। এত ডাক্তার, নার্স, আয়া–অথচ কম পেশেন্ট–যাতে ওয়ান টু অয়ান অবজার্ভ করা যায়। চব্বিশ ঘণ্টা নানাভাবে ওয়াচ করা যায়। কম জটিল কেসে কম খরচেই টক থেরাপি এবং অ্যাডভাইস চালিয়ে যান ডক্টর বোস অন্য চেম্বারে।
বিলেতের বড় হাসপাতালে ভালো চাকরিতে ছিলেন। কেন যে ইন্ডিয়ায় এলেন। এত বেশি দক্ষিণায় ধনী পেশেন্ট ছাড়া পেশেন্ট পাওয়া যায় না। অন্যান্য মেন্টাল হোমে এক চতুর্থাংশ টাকায় চিকিৎসা হয়। নামেই চিকিৎসা অবশ্য। সমাজ থেকে একটা পাগলকে তুলে এনে অনেক পাগলের সঙ্গে খাঁচায় পুরে রাখা।
জানলা দিয়ে তাকিয়ে কি যেন ভাবছিলেন ডক্টর বোস। তাই এতক্ষণ কথা বলেনি কাঞ্চন। এবার তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। ঈষৎ লালাভ মুখখানায় অজস্র অভিজ্ঞতার ছাপ। কপালের বলিরেখা তারই পদরেখা। সামান্য ধূসর চোখের তারায় চাপা ধীশক্তির রোশনাই। মাথায় বেশ লম্বা। মেদ নেই সারা শরীরে,–সেই সঙ্গে বিস্তর চুলও অদৃশ্য হয়েছে মাথার সামনের দিক থেকে।
