দু-হাত সামনে দিয়ে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে এগিয়ে গেছিল অবনীশ। মনের পটে ছাপ কিন্তু থেকে গেছে। ধবধবে ফর্সা রং। কাজলটানা কালো চোখ, নাসিকালঙ্কারের দ্যুতি, কর্ণাভরণের ঝিলিক এবং সব মিলিয়ে ছিপছিপে দেহবল্লরীর মধ্যে কামনা-উদ্ধত তেজীয়ান ভঙ্গিমা আর গ্রীবা বেঁকিয়ে একদৃষ্টে অবনীশের দিকে চেয়ে থাকার মানে একটাই হয়।
মেয়েটি কলগার্ল। বেশ বড় ঘরের মেয়ে বলেই মনে হয়। কিন্তু দক্ষিণ কলকাতায় এদের দাপটই তো এখন বেশি। লেকের মাঠে সন্ধ্যার পর একা বসা যায় না, বেড়ানো যায় না। পাশে এসে জুটবেই। বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যা। রক্তে এদের বিদ্রোহ-প্রকাশ বিপথে কুপথে।
অবনীশ ধোয়া তুলসীপাতাটি নয়। ডাক্তারি পড়তে গিয়ে সহপাঠিনী এবং নার্সদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা জমিয়েছে একাধিকবার। নিজেও দেখতে সুপুরুষ। দীর্ঘকায়। গৌরবর্ণ। টান টান চাবুকের মতো চেহারা। বন্ধুরা ওকে হিরো বলে ডাকে। বান্ধবীরা বলে লেডিকিলার।
সুতরাং সুন্দরী মহিলা সঙ্গকামনা জানালে চুঁমার্গের ধার ধারে না অবনীশ কোনওকালেই। রেলিং-এ হেলান দিয়ে বিজয়িনী ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকা এই মেয়েটি অবশ্য অভিজাত বহুবল্লভ ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু চেহারার চমক, নিরালা পরিবেশ আর যৌবন-উষ্ণ রুধির ক্ষণেকের জন্য বিহ্বল করে তোলে অবনীশকে।
ক্ষণেকের জন্যেই বটে। মনোবিশারদরা একেই বলে ঝোঁকের মাথায় অসম্ভব কাণ্ড করে ফেলা। ক্ষণিক ভাবাবেগে আত্মহারা হয়ে কেউ চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কেউ গলায় দড়ি দেয়, কেউ বিষ খায়।
আদিমতম পেশায় রত এ কামিনীকে দেখেও রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠল অবনীশের। মহিলাসান্নিধ্য চিরকালই প্রীতিকর তার কাছে–স্কুল কলেজে কো-এডুকেশন ক্লাসে পড়ার সময় থেকেই।
এমনকী কলগার্লদের সঙ্গসুখ উপভোগ করেছে মন মেজাজ শরীফ থাকলেই। আসলে ওর মধ্যে কোনো ভণ্ডামি নেই। খোলে চোখে দুনিয়াটাকে দেখে, ভাবাবেগবর্জিত বলেই ওর ইনটেলেকচুয়াল ম্যাচুইরিটি এত ঊর্ধ্বে। ইমোশনালি ইমম্যাচিওর্ড হলে যা কখনোই সম্ভব হত না। ওর কাছে নরনারীর নিবিড় সান্নিধ্য নেহাতই প্রাকৃতিক ব্যাপার-বায়োলজিক্যাল লাভ ছাড়া কিছুই নয়।
মেয়েটিকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গিয়েও তাই থমকে দাঁড়াল অবনীশ। ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল ঘাড় বেঁকিয়ে এখনও সে চেয়ে আছে তার দিকে। আলো-আঁধারির মধ্যে দিয়ে অনুভব করা যাচ্ছে তার কালো চোখের আকর্ষণ–চুম্বকের আকর্ষণের মতোই যা অদৃশ্য, কিন্তু অমোঘ।
পায়ে পায়ে মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেল অবনীশ। চোখ এবার রূপসীর দিকে। ষোড়শী বলেই তো মনে হয়। মাদকতা আছে বটে শরীরে। বেশবাস মূল্যবান–কিন্তু স্বল্প। দেহতটরেখাকে সযত্ন প্রয়াসে পরিমিতির মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে জানে। সংস্কৃতিসম্পন্না মেয়ে নিঃসন্দেহে।
শিকার জালে পড়েছে বুঝেছে অপরূপা। অবনীশের দিকে আর ফিরেও তাকাচ্ছে না। সটান চেয়ে আছে সামনের দিকে। গ্রীবাভঙ্গিমা কিন্তু গর্বোদ্ধত। দুহাত দুপাশে ছড়িয়ে রেলিং ধরার মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব।
অবনীশ এবার মন্ত্রমুগ্ধ। মেয়েরা বুঝি চিরকাল এইভাবেই খেলিয়ে তোলে মনের মানুষদের। যারা এই শিল্পটিকে রপ্ত করেছে, তারা পারে আরও সুচারুভাবে। সম্পূর্ণ অপরিচিতা এই মেয়েটির লালসা-মদির আচরণ তাই বিহ্বল করে তোলে অবনীশের মতো খ্যাতিমান লেডিকিলারকেও।
আবার ফিরে আসে অবনীশ। এবার দাঁড়ায় মেয়েটির সামনেই। সামনেই চেয়েছিল রাতের রূপসী। ভ্রূক্ষেপ নেই অবনীশের দিকে। সাহস সঞ্চয় করে সুস্পষ্ট স্বরে অবনীশ বললে, ফ্রী আছেন?
কী বললেন? ঝট করে মুখ ফিরিয়ে অবনীশের চোখে চোখে তাকাল মেয়েটি। কালো চোখে যেন দামিনী খেলছে। নাকের পাটা স্ফীত। ঝিলিক দিয়ে উঠছে নাকছাবি। হীরের নাকি?
মুহূর্তের মধ্যে ইনটেলেকচুয়ালি ম্যাচিওর্ড অবনীশ বুঝে ফেলল, ভুল হয়ে গেছে। এ-মেয়ে সে-মেয়ে নয় কলগার্ল বলে যাদের কৃপা করা যায়। এর ধমনীতে অভিজাত শোণিত। তাই গোখরের মতো ফণা মেলে ফোঁস করে উঠেছে। ছোবল মারার আগেই চম্পট দেওয়া দরকার।
কিন্তু অবনীশের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে তখন আরও কিছু সঞ্চয়ের বাকি ছিল।
ঝটিতি জবাব দিয়েছিল অবনীশ, সরি।
বলেই আর দাঁড়ায়নি। লম্বা লম্বা পা ফেলে যেই দূরত্ব বাড়াতে গেছে মেয়েটির কাছ থেকে অমনি দুপাশের দুটি ল্যাম্পপোস্টের আড়াল থেকে তির বেগে ধেয়ে এল দুটি মূর্তি।
কী হয়েছে? কী হয়েছে?
চিৎকার শুনে ঘাড় বেঁকিয়ে অবনীশ দেখলে, রেলিং থেকে সরে এসেছে রাতের রহস্যময়ী।
কিছুই বলছে না। শুধু চেয়ে আছে অবনীশের দিকে।
ছেলেদুটি ছুটে আসছে অবনীশের দিকে–ও মশাই কী বলছিলেন–
কেন ল্যাম্পপোষ্টের আলো নিভনো এবং কেন ঠিক এই জায়গাটিতে মেয়েটি নিজেকে লোভনীয় করে দাঁড়িয়ে আছে, অবনীশ তা বুঝে নিলে চকিতের মধ্যে। ল্যাম্পপোষ্টের আড়ালে গা মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মস্তান দুটি। উদ্দেশ্য একটাই। অবনীশকে টেনে-হিঁচড়ে আড়ালে নিয়ে যাওয়া, মারধর করে সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া। সৰ্ব্ববল্লভাটি তাদের টোপ, গ্যাং-এর অন্যতম সদস্যা।
অভিনব ফাঁদ। উর্বর মস্তিষ্ক বটে এই তিনজনের।
চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই নিজের দশা কী হতে চলেছে কল্পনা করে নিল অবনীশ। প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব কাজ দিল বিস্ময়করভাবে। মাঝ রাস্তা দিয়ে একটি বাস যাচ্ছে গোলপার্কের দিকে। ছুটে গিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল অবনীশ। কন্ডাক্টর ধরে ফেলল একহাত বাড়িয়ে।
