মাথার মধ্যে চিন্তার বোঝা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন মিস্টার রীডার। সারারাত ঘুমোতে পারলেন না। হাজতে যাওয়ার আগেই কনস্টেবল বার্নেটের রিপোর্টটা তিনি পড়েছিলেন। তাতে লেখা আছে, ব্যাঙ্কের কাছাকাছি আসতেই একটা লোককে মোড় ঘুরতে দেখেছিল সে। ভালো করে দেখবার আগেই হোঁচট খেল একটা লোহার নালে। নীচু হয়ে নালটা দেখে ফের সিঁধে হয়ে লোকটাকে সে আর দেখতে পায়নি।
সকাল আটটা নাগাদ–পাড়া ঘুরতে বেরোলেন মিস্টার রীডার। দেখলেন ম্যাগডার বাড়ির সামনে একটা ছোট্টা বাগান। বাগানের কাছে একটা গোলাপগাছ। ধুকছে বললেই চলে। বাদামি হয়ে গেছে পাতা।
শহরের মস্ত বাগানের ধারে গিয়ে ফুলগাছগুলোর দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলেন মিস্টার রীডার। ফিরে এলেন ম্যাগড়ার বাড়িতে। ম্যাগডার সঙ্গে কথা বলতে বলতে দেখলেন একটা ফুলদানিতে একগুচ্ছ গোলাপ। বাজে অছিলায় পাশের ঘরে পাঠালেন ম্যাগডাকে। গোলাপগুচ্ছ টেনে নিয়ে দেখলেন। বোঁটাগুলো কঁচি দিয়ে কাটা নয়–টেনে ছেঁড়া। নোট বইয়ের একটা পাতা দিয়ে আগে মোড়া হয়েছে বোঁটাগুলো তার ওপর জড়ানো সুতো। ভিজে পাতার ওদিকে লাল কালি দিয়ে কী যেন লেখা।
নেমে এলেন মিস্টার রীডার। বাগানে পেলেন একটা লোহার নাল। জানলা থেকে ম্যাগড়া ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল বাগানে।
গেলেন কনস্টেবল বার্নেলের কাছে। কথায় কথায় জানলেন, লোহার নালে হোঁচট খাওয়ার পরেই রাত দুপুরে কবিতা লেখার ইচ্ছে হয়েছিল বার্নেটের। শহরের বাগানে গিয়ে অনেকগুলো গোলাপ ছিঁড়ে ছিল। নোটবইয়ের পাতায় কবিতা লিখেছিল। সেই কবিতা দিয়েই গোলাপগুলো মুড়ে লোহার নাল দিয়ে ভারী করে ছুঁড়ে দিয়েছিল ম্যাগডার জানলা দিয়ে।
সেইদিনই বিকেলবেলা জানলা থেকে ম্যাগডা দেখলে বিষণ্ণ মুখ সেই লোকটা ফের আসছে। পেছনে একজন পুলিশ ডিটেকটিভ।
নিমেষ মধ্যে বিছানার গদি তুলে ফেলল ম্যাগডা। প্যাডের মতো সাজানো ব্যাঙ্ক নোটের বাণ্ডিলগুলো তুলে নিয়ে ঠাসল একটা ব্যাগে। পেছনের জানলা খুলে রান্নাঘরের ছাদে ব্যাগটা ফেলে দিয়ে নিজেও লাফ দিয়ে নামল ছাদে। সেখান থেকে বাগানে। বাগান থেকে রাস্তায়। চলন্ত ট্যাক্সি থামিয়ে উঠে বসল টাকার থলি সমেত। মিশে গেল জনারণ্যে।
.
গোয়েন্দা ধাঁধার সমাধান
ঠকে গেলেন। মেয়েটা মোটেই চুরনী নয়, হত্যাকারীও নয়।
চোর রাতের পাহারাদার নিজেই। হত্যাকারীও সে নিজে! মানে, নিজেই খুন করে ফেলেছে টাকার আলি চুরি করার পরেই! কিন্তু খুন সে হত না। যদি রাতের পুলিশের ঘাড়ে কবিতার ভূত না চাপত।
প্ল্যানটা অনেক দিনের। আর্থার মলিং নিজেও দাগী আসামি। ম্যাগডা তারই মেয়ে।
ষড়যন্ত্র মতো ম্যাগড়া তালাক দেওয়া ম্যাগড়া গ্রেন সেজে বাড়ি নিয়েছিল ব্যাঙ্ক পাড়ায়। তারপর ছেনালি করে পটিয়ে ফেলেছিল গ্রীনকে। মেয়ের মুখেই স্ট্রংরুমের খবরাখবর সংগ্রহ করত আর্থার মলিং।
তারপরেই মনিকাঞ্চন যোগ ঘটল। উড়ো চিঠি এল গ্রীনের নামে। চম্পট দেওয়ার আয়োজন করলেন গ্রীন। সেইদিনই এক লাখ পাউন্ড এসেছে স্ট্রং রুমে।
আর্থার মলিংয়ের কাছে নকল চাবিও ছিল। কিন্তু ড্রয়ারের চাবি দিয়েই স্ট্রং রুম খুলল। টাকার আণ্ডিল এনে পুঁতে রাখল গোলাপ গাছের তলায়। ফিরে এল অফিসে। যেই দেখলে বার্নেট আসছে, ঝাঁ করে গিয়ে হাত-পায়ে হাতকড়া লাগিয়ে শুয়ে পড়ল ফুটো টিনভরতি ক্লোরোফর্মের তলায়।
জ্ঞান হারাল সঙ্গে-সঙ্গে। হিসেব মতো তখনি বার্নেটের এসে পড়ার কথা। প্রাণটা তাহলে বেঁচে যেত। কিন্তু তার মাথায় তখন কবিতা ভূত চেপেছে। ফুল ছিঁড়ে, কবিতা পাঠিয়ে ফিরে এল দশ মিনিট পরে। ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।
কিন্তু ষড়যন্ত্রটা মিস্টার রীডার আঁচ করলেন কী করে?
ম্যাগডার বাড়ির বাগানে নেতিয়ে পড়া গোলাপ গাছ দেখে। নিজের মনটাও ক্রিমিন্যালের মন তো। তাই তক্ষুনি মনে হয়েছে, মাঝরাতে এক কাড়ি টাকা গোলাপগাছের তলায় তাড়াতাড়ি পুঁততে গেলে হাতে কাটার আঁচড় তো লাগবেই।
পুলিশ যে রহস্যের সমাধান করতে না পেরে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল, সে রহস্যের সমাধানও হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ!
মৃত আর্থার মলিংয়ের হাতের তেলোর রক্তরেখাগুলো আর কিছুই নয়–গোলাপ কাঁটার রক্ত-সূত্র!
* সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত।
প্রতিবিম্ব স্মৃতি
গোলপার্কের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা যাদবপুরের দিকে গেছে, অবনীশ ফিরছিল সেই পথ দিয়ে। বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা মারা শেষ হয়েছে, এখন ধরবে শিয়ালদার যে-কোনও বাস। তাই হাঁটছে রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার-এর পাশ দিয়ে ফুটপাত ধরে।
জায়গাটা বেশ অন্ধকার। প্রদীপের নীচেই অন্ধকার থাকে জানা ছিল অবনীশের। সাধন ভজন-সংস্কৃতি-কেন্দ্র এই ভবনের ঠিক পাশের রাস্তাটি কেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন, তা বুঝতে পারেনি। পারল একটু পরেই।
রাস্তার সবকটা ল্যাম্পপোস্টের আলো নিভনো। ওপাশের ফুটপাতের দোকান থেকে বিচ্ছুরিত আলোর আভাস পড়েছে এদিকের ফুটপাতে। লোহার রেলিং-এ পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে একটি তরুণী।
মেয়েটির দিকে অবনীশের চোখ আকৃষ্ট হওয়ার কারণ আছে। প্রথমত ওই রকম আঁধারঘেরা নিরালা জায়গায় মেয়েটি একেবারে একা। দ্বিতীয়ত, মেয়েটির অঙ্গে ঝলমলে পোশাক। ক্ষীণ আলোয় ঝলসে উঠছে নাকের নাকছাবি। ঝলসে উঠছে এই কারণে যে মেয়েটি একদৃষ্টে চেয়েছিল অবনীশের দিকে। চোখাচোখি হতেই এক ঝটকায় মুখখানা ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে যেন দেখেও দেখছে না। পরক্ষণেই অবশ্য ঘাড় কাত করে চেয়ে রইল অবনীশের দিকে। বুকটা আরও একটু চিতিয়ে শরীরটাকে লীলায়িত ভঙ্গিমায় এনে যেন লাস্যময়ী হয়ে উঠল নিমেষ মধ্যে।
