এ হেন পরেশনাথ পুরকায়স্থকে চোখের সামনে দেখে তাই উত্তেজনায় দম আটকে এল তদন্তের। ইন্দ্রনাথ কিন্তু চোখ কুঁচকে দেখছিল পুরকায়স্থ মশায়ের বাঁ-পা টেনে-টেনে চলার ধরন…একটু পরেই দেখা গেল সে ফিকফিক করে হাসছে।
তদন্ত করল তদন্ত–হাসি কেন?
অভিনয় দেখে।
কার অভিনয়?
প্রাণকুমারের অভিনয়।
বলে হনহন করে এগিয়ে গিয়ে পরেশনাথ পুরকায়স্থর কাঁধে হাত রাখল ইন্দ্রনাথ–অভিনন্দন নিন।
বোঁ করে ঘুরে গিয়ে শুয়োপোকা ভুরুর তাণ্ডব নাচ দেখিয়ে ভস্মলোচন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন পুরকায়স্থ।
কিন্তু ভারী অমায়িক হেসে ইন্দ্রনাথ বললে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছি না– এত সুন্দর অভিনয়..এত নিখুঁত ছদ্মবেশ সাবাস প্ৰাণকুমার।
প্রাণকুমার। শুয়োপোকা ভুরুজোড়া মাথা ঠোকাঠুকি করে স্ট্রেটলাইন হয়ে গেল চক্ষের নিমেষে–আমার নাম পরেশনাথ…
নো ম্যান, নো–নেভার। ওটা আপনার বাইরের খোলস। রিপোর্টার এড়ানোর চমৎকার ফন্দি বানিয়েছেন ভদ্রলোক। পরেশনাথ পুরকায়স্থ আছেন ল্যাবরেটরিতেই। কিন্তু ঘেঁটু পুজোতে ঢোল সানাইয়ের দরকার কী? বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না? তবে হ্যাঁ তদন্তকে বেশ ভড়কে দিয়েছেন। আমাকেও দিতেন–যদি না–।
যদি না…কি? পারলেন না তো?
.
গোয়েন্দা ধাঁধার সমাধান
পরেশনাথ পুরকায়স্থর বাঁ পায়ে গুলি লেগেছিল। সুতরাং বাঁ-দিকের দেহের ভর রাখার জন্যে ছড়িটা তার বাঁ হাতে থাকা উচিত। কিন্তু তিনি প্রমোদ মহলে ঢুকলেন ডানহাতে ছড়ি নিয়ে। সন্দেহ হল সন্দেহবাজ ইন্দ্রনাথের। তারপর পুরস্কার পাওয়া শ্রেষ্ঠ অভিনেতাকে চেনা কি খুব কঠিন?
* সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত। ১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৮২।
এডগার ওয়ালেস-এর গল্প নিয়ে গোয়েন্দা ধাঁধা
পুলিশের ঘাড়ে কবিতা ভূত
ব্যাঙ্কটা লুঠ হওয়ার মতো নয়, তবুও লুঠ হয়ে গেল।
ছোট শাখা হলেও ব্যাঙ্কের লেনদেন বড় কম নয়। তিন-তিনটে পেল্লায় কোম্পানির টাকা পয়সা থাকে সেখানে। মাইনে দেওয়ার আগের দিন যথারীতি একলক্ষ পাউন্ড এনে রাখা হয়েছিল স্ট্রং রুমে। রাত ফরসা হওয়ার আগেই টাকার কাড়িও ফরসা হয়ে গেল সুরক্ষিত পাতালকুঠরী থেকে।
আশ্চর্য! সত্যিই আশ্চর্য! স্ট্রং রুমটা ইস্পাত আর কংক্রিট দিয়ে তৈরি। কুঠরীর ছাদে ব্যাঙ্ক ম্যানেজারের প্রাইভেট অফিস। সে-ঘরে ঢুকতে হলে বাইরের অফিস দিয়ে আসতে হয়। দরজা একটাই। ইস্পাতের দরজা। এই দরজা পেরোলে তবে ম্যানেজারের অফিস।
সুতরাং দরজাটা দারুণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই দরজার মাথায় সারারাত জ্বলে একটা বিদ্যুৎ বাতি। সেই আলোয় রাস্তা থেকেই দেখা যায় দরজাটা বন্ধ রয়েছে। একজন পুলিশ কনস্টেবল ঠিক চল্লিশ মিনিট অন্তর সামনের রাস্তা দিয়ে যায়।
শুধু পুলিশ আর ইস্পাতের দরজাতেও নিশ্চিন্ত হয়নি ব্যাঙ্কের মালিক। তাই একজন রাতের পাহারাদার মোতায়েন করা হয়েছে প্রাইভেট রুমে। জানলা দিয়ে সে মুখ বাড়িয়ে বলে দেয় রাতের পুলিশকে–সব ঠিক হ্যায়!
সে রাতেও যথারীতি চল্লিশ মিনিট অন্তর ঘুরপাক দিচ্ছে পুলিশ কনস্টেবল বার্নেট। হঠাৎ দেখলে আলোটা নেভানো। পিলে চমকে উঠল বার্নেটের। রাতের পাহারাদারের জন্যে দাঁড়িয়ে না থেকে দৌড়ে এল দরজার সামনে। বুক ধড়াশ করে উঠল পাল্লা দু-হাট দেখে। জড়ের মতো ভেতরে ঢুকলে দেখলে একটা অদ্ভুত দৃশ্য।
রাতের পাহারাদার শুয়ে আছে মেঝেতে। হাতে আর পায়ে হাতকড়া। নাকের ওপর তুলোর প্যাড। ইঞ্চি কয়েক ওপরে ঝুলছে একটা ফুটো টিন। টপটপ করে ক্লোরোফর্ম ঝরছে তুলোর প্যাডে। মিষ্টি গন্ধে ঘর ভরপুর।
রাতের পাহারাদারের নাম আর্থার মলিং।
তৎক্ষণাৎ ফোন করা হল পুলিশ ফাঁড়িতে। ওই রাস্তাতেই থাকতেন মিস্টার গ্রীন–ব্যাঙ্ক ম্যানেজার। পুলিশ আগে দৌড়ল তার কাছে। গিয়ে কী দেখল?
বাক্স-বিছানা বেঁধে চম্পট দেওয়ার আয়োজন করছেন মিস্টার গ্রীন। ভীষণ উত্তেজিত। এত রাত্রে যাওয়া হচ্ছে কোথায়, এই প্রশ্নের উত্তরে বললে আমতা আমতা করে, কাজ আছে। মালিককে একটা চিঠি লিখে যাচ্ছেন অবশ্য। চিঠি আর চাবি অফিসঘরের ড্রয়ারে রেখে এসেছেন।
কিন্তু ড্রয়ারে চাবি বা চিঠি কোনওটাই পাওয়া গেল না। স্ট্রং রুমেও পাওয়া গেল না এক লক্ষ পাউন্ড।
সোজা কেস! দিনের আলোর মতো স্পষ্ট! খাঁচায় পোরা হল মিস্টার গ্রীনকে। টাকা? ধোলাই দিলেই বেরিয়ে পড়বেখন।
পুলিশ কতকগুলো আঁচড়ের রহস্য কিন্তু ধরতে পারল না। আর্থার মলিংয়ের হাতের তেলোয়। পাওয়া গিয়েছিল রক্ত রেখাগুলো।
ব্যাঙ্ক লুঠের দিনই সক্কালবেলা চার্জ বুঝে নিতে এলেন মিস্টার রীডার। ইন্সপেক্টর হলফর্ড কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়ে বললে–ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের সেই ভীষণ চুরি আপনিই ধরে দিয়েছিলেন। কিন্তু দোহাই আপনার, আজকের চুরি নিয়ে খামোকা মাথা ঘামাতে যাবেন না। মিস্টার গ্রীন জেলখাটা
আসামি। ব্যাঙ্কেরই কেস। নাম ভঁড়িয়ে ম্যানেজারি করেছে অ্যাদ্দিন।
জানি, বিষণ্ণ চোখে বললেন মিস্টার রীডার, আমিই ধরে দিয়েছিলাম গ্রীনকে। টাকা ধার দিয়ে ফেঁসে গিয়েছিল। স্বীকার করলেই ল্যাটা চুকে যেত বেচারা।
ভুরু কুঁচকে বললেন ইন্সপেক্টর হলফর্ড–গ্রীনের সঙ্গে মোলাকাত করার ইচ্ছে আছে নাকি?
আছে।
ফলে, হাজতে হাজির হলেন মিস্টার রীডার। দেখেই চিনতে পারলেন মিস্টার গ্রীন। হাউ হাউ করে বললেন অনেক কথা। একটা উড়ো চিঠি পেয়েই দেশ থেকে পালাচ্ছিলেন তিনি। চিঠিতে লেখা ছিল, গ্রীন যে জেলখাটা আসামি, পত্রলেখক তা জানে। পাছে মুখে চুনকালি পড়ে তাই নতুন জায়গায় গিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করবেন ভেবেছিলেন গ্রীন। এই বয়েসে বিয়ের ইচ্ছেও হয়েছিল। মেয়েটার বয়স যদিও তার চাইতে তিরিশ বছর কম কিন্তু পোড় খাওয়া মেয়ে তো, এক বদমাসকে বিয়ে করে অনেক জ্বলেছে। সে বিয়ে ভেঙে গেছে। নাম তার মিস ম্যাগডা গ্রেন। থাকে এই পাড়াতেই। পাড়ার কিছু ছেলেছোকরা এর মধ্যেই ঘুরঘুর করতে শুরু করেছে বাড়ির আশেপাশে। উদ্দেশ্য, প্রেম করা। এদের মধ্যে পুলিশ কনস্টেবল বার্টেও আছে। সে আবার কবিতা লিখেলিখে ছুঁড়ে দেয় তার ভাবী বউকে। যাক, এখন আর সে ভাবী নয়। এ মুখও তিনি দেখাতে চান না ম্যাগডাকে।
