সেটা সম্ভব নয়, রুক্ষকণ্ঠে কথাটা বলতে চাননি শোভনলাল। তবুও গলাটা বড় কর্কশ শোনাল। তাই পরক্ষণেই মোলায়েম হবার চেষ্টায় হেসে বললেন–ওটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমাকে ভাবতে দিন।
গম্ভীর হয়ে গেলেন মিসেস শিকদার-মদন আর বিজনের মুখ চেয়েই কি বলছেন? চোখের সামনে ছেলেদুটো বয়ে যাচ্ছে দেখেও চুপ থাকতে পারছেন? তাছাড়া আপনাকেও দেখাশুনা করবার জন্যে…
ধাঁ করে রক্ত গরম হয়ে গেল শোভনলালের। মিলিটারি মেজাজ তো। রাগলে আর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। উঠে দাঁড়িয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে শুধু বললেন–আপনি নির্লজ্জ বেহায়া হতে পারেন, আমি নই। সবচাইতে বড় কথা, মদন আর বিজন আমার ছেলে–আপনার নয়। মায়ের চেয়ে মাসির দরদ নাই-বা দেখালেন।
বলেই আর দাঁড়ালেন না শোভনলাল। ছিটকে বেরিয়ে এলেন বাড়ি থেকে। হন হন করে সটান ফিরে এলেন নিজের বাড়ি।
সে-রাতে আর ঘুমোতে পারলেন না শোভনলাল। বুঝলেন, মিসেস শিকদারের চাকরি খতম হয়ে গেল এইখানেই। কাল থেকে অন্য কাজের ধান্দায় বেরুতে হবে।
তার চাইতে বরং আরব দেশেই ফিরে যাওয়া যাক। আরব ভাষাটা তার চোস্ত ভাবে জানা আছে বলেই ওদেশে চাকরির বাজারে তার এত চাহিদা। শেখ সাহেবের মিলিটারি উপদেষ্টা হিসেবেই বাকি জীবনটা মরুভূমিতেই কাটানো যাক। ছেলেরা থাকুক বোর্ডিং হাউসে। এর বেশি আর কি বা করবেন শোভনলাল? তাঁর সব চেষ্টাই তো ব্যর্থ হল।
রাত তখন দুটো। বালিশে মাথা রেখে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলেন মেজর শোভনলাল।
.
পরের দিন সকালে পুলিশ তলব করল মেজরকে।
পুলিশ? অবাক হলেন শোভনলার। ভারত সরকারের আস্থাভাজন অফিসার ছিলেন এককালে। পুলিশ তাকে সমীহ করে সেই কারণেই। সাতসকালে কেন তবে তলব পড়ল?
কারণটা জানা গেল পুলিশ জিপ থেকে নামবার পর। জিপ গিয়ে দাঁড়াল মিসেস শিকদারের বাড়ির উঠোনে। সেপাইসান্ত্রী গিজগিজ করছে বাগানে। উৎসুক জনতা উঁকিঝুঁকি মারছে ভেতরে। বসবার ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়ালেন শোভনলাল।
পিঠ উঁচু সেকেলে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন স্থূলকায়া মিসেস শিকদার। চোখদুটো খোলা–পাতা নড়ছে না–চোখের মণি স্থির প্রাণের চিহ্ন নেই।
বাঁদিকের রগে দুটো পাশাপাশি ফুটো। রক্ত জমে কালো হয়ে গেছে ক্ষতমুখে এবং গালের ওপর।
দারোগা বিষেণচাঁদ স্থির চোখে চেয়েছিলেন শোভনলালের মুখের দিকে–মুখের ভাবান্তর লক্ষ্য করছিলেন।
এখন আঙুল তুলে দেখালেন মিসেস শিকদারের ডান দিকে। শোভনলালের চামড়ার ব্যাগটা রয়েছে সেখানে। কালকে ফেলে গেছিলেন–হঠাৎ মাথা গরম হয়ে যাওয়ায় নিয়ে যেতে ভুলে গেছিলেন।
চিনতে পেরেছেন? কাঠখোট্টা গলা বিষেণাদের।
হ্যাঁ, আমার ব্যাগ, যন্ত্রচালিতের মতো বললেন শোভনলাল।
আপনি কাল এখানেই ছিলেন?
হ্যাঁ।
চারমিনার সিগারেট কি আপনিই খান?
হ্যাঁ।
কাল নতুন প্যাকেট কিনেছিলেন?
হ্যাঁ। কী করে জানলেন?
মেঝে থেকে দুটো প্যাকেট ছেঁড়া কাগজ তুলে দেখালেন বিষেণচাঁদ।
আপনার সিগারেটের প্যাকেট থেকে ছেঁড়া। কিন্তু মেজর, বিধবাকে গুলি করতে গেলেন
কেন?
ফ্যালফ্যাল করে শুধু চেয়ে রইলেন শোভনলাল।
একটা কথাও বলতে পারলেন না।
.
শোভনলালের ভাগ্যক্রমে ইন্দ্রনাথ রুদ্র সেই সময়ে ও-অঞ্চলে গিয়েছিল একটা চোরাই নটরাজ মূর্তির সন্ধানে। মূর্তি উদ্ধার করার পর দারোগা বিষেণাদের ফাঁড়িতে গিয়েছিল বিদায় নিতে, এমন সময় শুনল একটা যাচ্ছেতাই রকমের খুন হয়েছে গতকাল।
বিধবা খুন। কিন্তু টাকাকড়ি গয়নাগাটির জন্য নয়। মিসেস শিকদারের হাতের হিরের আংটি, গলার সোনার হার, এবং কোমরের চাবি স্পর্শ করা হয়নি। লোহার সিন্দুকের লাখখানেক টাকা আর জড়োয়ার গয়নাও কেউ লোপাট করেনি। নিয়ে গেছে শুধু বিধবার প্রাণটা।
।কেন? বিষেণচাঁদের এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সরেজমিন তদন্তে নিজেই এসেছিলেন ইন্দ্রনাথ। স্রেফ কৌতূহল মেটানোর জন্যে। চৈত্র সংক্রান্তির ঢাক বাজলেই যেমন গাজনের সন্ন্যাসীর পিঠ চড়চড় করে, কোথাও কোনও খুন-জখম-চুরি-রাহাজানির খবর শুনলেই ইন্দ্রনাথের পা দুটোও সুড়সুড় করে ওঠে।
বিধবা হত্যাকাণ্ড রীতিমতো রহস্যজনক। শোভনলালের ব্যাগ পাওয়া গেছে অকুস্থলে–নিষ্প্রাণ বিধবার দেহের ঠিক পাশেই। সোফার হাতলে, দরজার গায়ে আঙুলের ছাপের ছবি তুলে দেখা যাচ্ছে। হুবহু মিলে যাচ্ছে–শোভনলালের আঙুলের ছাপের সঙ্গে। শুধু একটা জিনিস এখনো মিলিয়ে দেখা যায়নি–মৃতদেহ নিয়ে কাটা ছেঁড়া করে ময়না তদন্ত করলে সে রিপোর্টও পাওয়া যাবে। গুলি দুটো রগ ফুড়ে মাথার মধ্যে রয়ে গেছে। সেই গুলি শোভনলালের রিভলভারের গুলির সঙ্গে মেলে কিনা দেখতে হবে। কিন্তু বিধবাকে মেরে শোভনলালের লাভ কী? চাকরিটা তো গেল। টাকা-পয়সাও লুঠ করা হয়নি। তবে?
শোভনলাল আর মদন-বিজনের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলার পর ফাঁড়িতে ফিরে এল ইন্দ্রনাথ। বিষেণচাঁদ বললেন–কী হে টিকটিকি, কিছু পেলে?
বিষেণচাঁদ এককালে ইন্দ্রনাথের সঙ্গে স্কটিশচার্চ কলেজে একই ক্লাসে বি-এসসি পড়েছিলেন, সেইসূত্রেই তুমি বলেই সম্ভাষণ করেন ইন্দ্রনাথকে।
ইন্দ্রনাথ বললে–শোভনলাল নির্দোষ।
চোখ নাচিয়ে বললেন বিষেণচাঁদ–কী করে বুঝলে হে গণৎকার?
রগের বাঁ-পাশে ফুটো দেখে।
হেঁয়ালির মানে বুঝেই হেসে বিষেণাদ বললেন–সেটা আমিও লক্ষ্য করেছি।
