.
পায়রাকুঠীর সিকি মাইল পূবদিকে থাকেন মিসেস শিকদার। বিধবা। ভীষণ মোটা। কিন্তু অনেক টাকার মালিক। জমিজমা বিস্তর। দেখাশুনার জন্যে এমন একজনকে রেখেছিলেন যিনি সারাজীবন আরবের মরুভূমিতে কাটিয়েছেন ভারত সরকারের চাকরি নিয়ে। তারপর রিটায়ার করে ফিরে এসেছেন দেশে দুই ছেলেকে মানুষ করার জন্যে।
শোভনলাল তার নাম। মেজর শোভনলাল। আকারে বেঁটেখাটো। ল্যাটা, কিন্তু রীতিমতো কর্মঠ। কম কথা বলেন। কেননা তার মনে অনেক দুঃখ। অল্প বয়েসেই বউ মারা যান দুই ছেলেকে রেখে। ছেলেদের মুখ চেয়েই আর বিয়ে করেননি শোভনলাল। কিন্তু ছেলেদের শ্রদ্ধা ভালোবাসাও পাননি।
মদন আর বিজন ছেলেদুটি হয়েছে বিশ্ববকাটে। মা না থাকলে যা হয় আর কি। বাপ চাকরি নিয়ে ব্যস্ত, ছেলেরা ছিল বোর্ডিং হাউসে। কিন্তু সেখানে সুশিক্ষার বদলে কুশিক্ষাই শিখছে শুনে শোভনলাল ছেলেদের এনে রাখলেন নিজের কাছে কিন্তু ছেলেদের দু-চোখের বালি হয়ে রইলেন।
অথচ ছেলেদের ভালোবাসা পাওয়ার জন্যে চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি শোভনলাল। মা-মরা ছেলেদের মায়ের মতোই স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করার জন্যে আরবদেশের এক শেখ সাহেবের মোটা মাইনের চাকরির প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করলেন। মিসেস শিকদারের ফল আর ফুলের বাগান দেখাশুনোর চাকরি নিলেন নামমাত্র মাইনেতে। সারা জীবন মরুভূমিতে কাটানোর জন্যে বাগান তৈরির দিকে ঝোঁক ছিল অনেকদিন থেকেই। শেষ জীবনের শান্তির আশায় তাই নিজেই ফল ফুলের চারা লাগাতেন, জল দিতেন, ফুল তুলতেন। এত কষ্ট করতেন শুধু দুই ছেলের মুখে চাঁদের হাসি ফোঁটানোর জন্যে।
ছেলেরা কিন্তু তাকে দেখলেই গম্ভীর হয়ে যেত। এতদিন শাসন না পেয়ে যারা বজ্জাতের বাড়ি হয়েছে, হঠাৎ শাসন তাদের সইবে কেন? তাই বেশিরভাগ সময় কাটাত বাইরে–পায়রাকুঠীতে–
নিঃসন্তান বেণীমাধব মদন আর বিজনকে খুব ভালোবাসত। পায়রাকে কীভাবে শিখিয়ে পড়িয়ে চিঠি বওয়াতে হয়, তা হাতেনাতে দেখিয়ে দিত। মদন আর বিজনও তো তাই চায়। লেখাপড়া ডকে উঠল। দিনরাত পায়রাকুঠীর পায়রা নিয়ে ব্যস্ত রইল মাঠে ঘাটে।
তিতিবিরক্ত হয়ে গেলেন শোভনলাল। বেশ বুঝলেন ছেলেরা শাসনের বাইরে চলে গেছে। সারা জীবন তিনি বাবার কর্তব্য করেননি–এখন কি পারবেন? মনে মনে নিজেকেই দোষী সাব্যস্ত করলেন ছেলেদের এই অধঃপতনের জন্যে। ভাবতে লাগলেন সত্যি সত্যিই শেখ সাহেবের চাকরিটা নিয়ে ফের আরবের মরুভূমিতে ফিরে যাবেন কিনা।
এই সময় একদিন সন্ধে নাগাদ শহর থেকে ফিরে স্টেশনে নামলেন শোভনলাল। কাঁধে ঝোলা নিয়ে রাস্তায় পা দিয়েছেন, এমন সময়ে দেখলেন মিসেস শিকদার তার ফিয়াট গাড়িটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গেটের কাছে।
শোভনলালকে দেখেই এগিয়ে এসে বললেন–আমার সঙ্গে আসুন, কথা আছে।
ফিয়াট এসে থামল মিসেস শিকদারের বাড়িতে। গাড়ির মধ্যে একটা কথাও বলেননি ভদ্রমহিলা। শোভনলাল নিজেও কম কথার মানুষ। তাই চুপচাপ চেয়েছিলেন জানলা দিয়ে বাইরে।
গাড়ি থেকে নামবার পর মিসেস শিকদার ভেতরে গিয়ে বললেন,–আপনি আজ এখানেই খেয়ে যান।
কিন্তু–মৃদু আপত্তি জানালেন শোভনলাল।
কোনও কিন্তু নয়। খেতে খেতে কথা বলব। বলে মিসেস শিকদার রান্নাঘরে চলে গেলেন। বসবার ঘরে একা বসে রইলেন শোভনলার। হাতের ব্যাগটা পাশের সোফায় রেখে ভাবতে লাগলেন, কী এমন দরকার পড়ল মিসেস শিকদারের যে স্টেশন থেকে তুলে আনলেন গাড়িতে? ভদ্রমহিলা একা থাকেন। বিধবা তো, ভীষণ পিটপিটে। ঝি-রাঁধুনি একদম বরদাস্ত করতে পারেন না।
ভাবতে ভাবতে আনমনা ভাবে বাঁ-হাতে চারমিনার সিগারেটের নতুন প্যাকেট বের করে কাগজটা ছিঁড়ে মেঝেতে ফেললেন এবং একটা সিগারেট ঠোঁটের ডগায় ঝুলিয়ে নিলেন।
ছেঁড়া কাগজটা কিন্তু মেঝেতেই পড়ে রইল এবং সেইটাই হল তার মৃত্যুবাণ।
.
যা বলতে চেয়েছিলেন মিসেস শিকদার, তা খানিকটা আঁচ করতে পেরেই অত আড়ষ্ট হয়েছিলেন শোভনলাল। কথাটা অনেকদিন ধরেই বলি বলি করেও বলতে পারছেন না। কিন্তু আভাসে ইঙ্গিতে শোভনলাল জেনে ফেলেছেন মিসেস শিকদারের মূল অভিপ্রায় কী।
খারাপ কিছু নয়। কিন্তু এই বয়েসে নিতান্তই অশোভন। বিশেষ করে ছেলেরা আর কচিখোকা নেই। শৈশবে যারা মা হারিয়েছে, অন্য মায়ের হাতে তাদের তুলে দেওয়া যায় কী?
হ্যাঁ, মিসেস শিকদারের এই হল মনোগত অভিপ্রায়। তার বিরাট সম্পত্তি তিনি মদন আর বিজনকে দিয়ে দিতে চান–কিন্তু মা হিসেবে। ওদের ভালো বোর্ডিংস্কুলে রেখে লেখাপড়াও শেখাতে চান, কিন্তু শর্ত ওই একটাই। শোভনলালের মন সায় দেয়নি মিসেস শিকদারের এ-হেন উদারতায়। গর্ভধারিণী মায়ের স্থান কি অন্য মা এসে পূরণ করতে পারে?
রান্নাঘর থেকে ফিরে এলেন মিসেস শিকদার। ভীষণ মোটা হলেও ভদ্রমহিলা হাঁটাচলা করেন লঘুচরণে–দেহের ওজন নিয়ে কাতর নন মোটেই। শাড়ির খুঁট দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে হাসিমুখে বললেন–আপনি কঁচা লঙ্কার ঝাল খান তো?
খাই, চারমিনার নামিয়ে গম্ভীরমুখে বললেন শোভনলাল–তার আগে একটা জবাব চাই।
বলুন, হাত মুছতে মুছতে বললেন মিসেস শিকদার।
আমাকে কি বলতে চান?
সটান প্রশ্ন শুনে সটান চেয়ে মুচকি হাসলেন মিসেস শিকদার–ধরুন মদন আর বিজনের ভার নেওয়ার প্রস্তাব।
