শুধু একটা প্রমাণ লক্ষ্য করোনি।
কোনটা বৎস?
চারমিনারের এই ছেঁড়া কাগজদুটো।
বলো কি হে? আমিই তো দিলাম তোমাকে।
শোভনলাল একটা প্যাকেটের কাগজ ছিঁড়েছিলেন। আর একটা প্যাকেটের কাগজ কে ছিঁড়ল?
নিশ্চয় শোভনলাল।
মোটেই না।
কী করে বুঝলে?
সেটাই তো আমার মন্ত্রগুপ্তি, রহস্যগম্ভীর হেসে বলল ইন্দ্রনাথ। ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে না পড়েও যে ডিটেকটিভ হওয়া যায়, সে প্রমাণ এইবার তোমায় হাতেনাতে দেব।
.
নিশুতি রাত।
পায়রাকুঠীর বিশাল বাগানের অযত্নবর্ধিত ঝোঁপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে এগুচ্ছে একটি কৃষ্ণকালো কৃশ মূর্তি। মার্জারের মতো লঘুচরণ তার। এক হাতে পেনসিলটর্চ। আরেক হাতে মিশমিশে রিভলভার।
এখন আর তার পরনে মুগার পাঞ্জাবি নেই। কবি-কবি দেহ আবৃত কালো ট্রাউজার্স আর নাইলন পুলওভারে ইন্দ্রনাথ রুদ্র নিশীথ অভিযানে বেরিয়েছে।
কৃশ কিন্তু ব্যায়ামপটু ইন্দ্রনাথ পিচ্ছিল গতিতে এসে দাঁড়াল জলের পাইপের তলায়। বেল্টের আংটায় টর্চ ঝুলিয়ে রিভলভার রাখল চামড়ার খাপে। তারপর গিরগিটির মতো সরসর করে উঠে গেল ছাদে।
একঘণ্টা পরে ফের পাইপ বেয়ে নেমে এল ইন্দ্রনাথ। নিঃশব্দ চরণে মিলিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।
অন্ধকারে ইনফ্রারেড ফোটোগ্রাফ তুললে ইন্দ্রনাথের মুখে তখন দেখা যেত আশ্চর্য হাসি। যুদ্ধ জয়ের শব্দহীন অট্টহাসি।
.
সকালে বিষেণাদকে ঘুম থেকে টেনে তুলল ইন্দ্রনাথ।
বলল–তোমার হাতে সেপাই কজন আছে?
হকচকিয়ে গিয়ে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বললেন বিষেণচাঁদ-ইয়ার্কি মারছ নাকি?
আমার হাতে আর সময় নেই। নটার ট্রেনেই কলকাতা ফিরব। তাই যা বলবার তোমাকে বলে যাচ্ছি।
এবার ঘুম ছুটে গেল বিষেণাদের চোখ থেকে। বললেন–কি বলবে?
বলব যে তোমার চাকরি যাওয়া উচিত। তোমার মতো একটা গর্দভ পাঁঠা উজবুককে দারোগা বানিয়ে আমাদের সর্বনাশ হচ্ছে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ! তোমার নাকের ডগা দিয়ে এতবড় কাণ্ডটা হচ্ছে, কোনও খবরই রাখো না?
ভীষণ ভড়কে গিয়ে এবং দারুণ রেগে গিয়ে বিষেণচাঁদ তেড়ে উঠলেন–খবরদার ইন্দ্রনাথ, মুখ সামলে কথা বলবে।
তুমি মুখ সামলে কথা বলবে। নাদাপেটা হাঁদারাম কোথাকার! পায়রাকুঠীর রহস্য অ্যাদ্দিনেও মাথায় আসেনি কেন?
পায়রাকুঠীর রহস্য!
আজ্ঞে হ্যাঁ, পায়রাকুঠীর রহস্য! শুনেছ কোনওদিন এই আক্রাগন্ডার বাজারে শুধু পায়রাদের খাওয়ানোর জন্যে লরি-লরি খাবার আসে তেরপল চাপা দিয়ে? হেঁড়েমাথায় এতদিন কেন খেয়াল হয়নি যে পৃথিবীর সব গুপ্তচর আর বিপ্লবীরা একটা-না-একটা উদ্ভট রকমের পেশা নিয়ে লোকের চোখে সাধু সেজে থাকে? স্পাইরা সাজে আর্টিস্ট, বিপ্লবীরা কয়লাওলা, কেউ খোলে পোলট্রি, কেউ করে মাছের ব্যবসা। পায়রা ট্রেনিং সেন্টারের আড়ালেও যে এরকম একটা ব্যাপার চলছে না, এটা মাথায় আসেনি কেন মেড়াকান্ত হাঁদারাম?
ইন্দ্রনাথ! ইন্দ্রনাথ! কী বলতে চাইছ তুমি?
নিজে গিয়ে দেখগে যাও। পায়রাকুঠী ঘেরাও করো আর্মড পুলিশ দিয়ে। সাংঘাতিক গুলিগোলা চলতে পারে। মিসেস শিকদারের হত্যাকারীকেও সেখানে পাবে।
কে? কার কথা বলছ?
বেণীমাধব।
প্রমাণ?
সিগারেটের প্যাকেট ছোঁড়া এই কাগজ দুটো।
ব্রাদার, আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে।
মাথায় গোবর থাকলে ওই রকমই হয়। আগেই তোমাকে বলেছিলাম, দুটো প্যাকেট ছেঁড়া হয়েছিল ওখানে। একটা শোভনলাল ছিঁড়েছেন–আর একটা অন্য কেউ।
কি করে বুঝলে অন্য কেউ?
আচ্ছা ইডিয়ট তে। প্রত্যেকেই সিগারেটের প্যাকেট ছেড়ে বিশেষ এক কায়দায়। পাশাপাশি দুটো ছেঁড়া কাগজ রেখে মুখে মুখে মেলালেই মাইক্রোসকোপের তলায় তফাতটা ধরা পড়ে। তুমি আমায় দুটো কাগজ দিয়েছিলে। একটা হুবহু মিলে গেল শোভনলালের প্যাকেটের কাগজের সঙ্গে। আর একটা মিলল বেণীমাধবের চারমিনার প্যাকেটের কাগজের সঙ্গে।
তুমি–
আমি পায়রাকুঠী থেকেই আসছি। শোভনলাল যে খুনি নন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ কিন্তু রগের বাঁদিকের গুলির চিহ্ন। কেন জানো তো?
এতক্ষণে হাসি ফুটল বিষেণাদের মুখে। বললেন–শোভনলালের ল্যাটা বলে। ল্যাটা হাতের গুলি রগের ডানদিক দিয়ে মাথায় ঢুকত।
যাক খানিকটা বুদ্ধি আছে তাহলে। আর হ্যাঁ ভালো কথা। ননীমাধবকেও গ্রেপ্তার করতে ভুলো না।
সন্ন্যাসী ননীমাধবকে? কেন বন্ধু, কেন?
কেননা বেণীমাধব শুধু অস্ত্রাগারের মালিক। লরি আর ভ্যান বোঝাই পায়রার খাবার আসত হে, আসত শুধু রিভলভার, বোমা, নাইট্রোগ্লিসারিন আর বন্দুক। পাঠাত এই ননীমাধব। সে-ই যে এই গুপ্ত দলের অধিনায়ক।
অ্যাঁ! বলো কী হে! কিন্তু বিধবাকে মারা হল কেন বুঝলাম না তো?
অস্ত্রাগারের সন্ধান জেনে ফেলেছিলেন বলে। শোভনলালকে ডেকে সেই কথাটাই বলতে চেয়েছিলেন মিসেস শিকদার। কিন্তু শোভনলাল রেগে চলে এলেন। তার পরেই বেণীমাধব এল। মিসেস শিকদারকে চেয়ারে বসা অবস্থাতেই সামনে দাঁড়িয়ে গুলি করল বাঁ-রগে। চেনাজানা ছিল বলেই ভদ্রমহিলা চুপ করে বসেছিলেন সোফায়,–ভাবতেও পারেননি বেণীমাধব এসেছে তাঁকেই নিকেশ করতে। তারপর চারমিনারের প্যাকেট ছিঁড়ে সিগারেট ধরিয়ে ফিরে গেল পায়রাকুঠীতে।
আর তুমি সেই প্যাকেট ছেঁড়া কাগজটা দেখেই বুঝলে–
যে ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে পড়েও তোমাদের মাথা কত মোটা হয়। বিদায় বন্ধু, ফির মিলেঙ্গে।
