পদবী তো আচারিয়া।
ওরফে আচার্য। মাধবেন্দ্র আচার্যর শেষ বংশধর।
ও মা!…আর অয়েল পেন্টিং?
জীনতত্ত্ব যেন তার প্রমাণ রেখে গেছে চোয়াল, চোখ, নাকে। একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায়–বংশের ছাপ রয়েছে।
কিন্তু মাধবেন্দ্রর ছেলে ছিল তো জারজধমনীতে ছিল ইংরেজের রক্ত–তার বংশধরের চোয়াল, চোখ, নাক মাধবেন্দ্রর মতন হবে কেন?
প্লাস্টিক সার্জারির দৌলতে। প্রতিহিংসাপাগল বিলকুলের মাথা থেকেই বেরিয়েছিল আইডিয়া। প্রথমে এসেছিল কটেজের গেস্ট হয়ে মাধবেন্দ্রর ফটো নেয় অয়েল পেন্টিং থেকে। যায় প্লাস্টিক সার্জনের কাছে–ফাঁসিতে লটকানো পূর্বপুরুষের আদল অর্জনের পরেই মাথাটা বিগড়োয় একেবারে। চাকরি নেয় ধনগোপালের কাছে তাকে নির্বংশ করবে বলে। করেছে। সেইসঙ্গে মিটিয়ে নিয়েছে। যৌনক্ষুধা। মৌমিতাকেও বাদ দেয়নি।
কিন্তু ইকবাল হোসেনকে ডেকে আনলে কেন?
কী মুশকিল! বড্ড লেটে বোঝ বউদি। নীল কপোত হোটেলে স্টাফ তো দেখেছিল নটগোপাল সহায়-কে। তাদের বর্ণনা থেকে স্কেচ আঁকিয়ে খুনির মুখের চেহারা দাঁড় করিয়েছিলেন দক্ষ অফিসার ইকবাল হোসেন। কিন্তু সে ছবি কাগজে ছাড়েননি খুনি হুঁশিয়ার হয়ে যাবে বলে। তবে থানায়-থানায় ফটো চলে গেছিল। আমি হাতিয়েছিলাম কৌতূহলকে বাগে রাখতে। নিয়ে গেছিলাম লাটনগরে। বিলকুলকে প্রথম দেখেই চিনেছিলাম–তারও হাইট ছফুট।
সিগারেট প্যাকেট আর নস্যির ডিবে অমনভাবে ফাটল কেন?
খুব সম্ভব আর ডি এক্স ছিল ভেতরে। এখনকার ছেলেরা যে বোমা ছোঁড়ে–তা পাট দিয়ে বাঁধা নয়–অবিকল সিগারেট প্যাকেট আনকোরা নতুন, নয়তো ম্যাচবক্স। নস্যির কৌটোয় বোমা বানিয়ে এনেছিল বিলকুল, অতীতের খুনের দৃশ্যটাকে আরও নারকীয়ভাবে দেখানোর জন্যে। ফাঁসির দড়িতে ঘাড় ভেঙেছিল মাধবেন্দ্র আচার্যর–বিলকুল আচার্যর বোমাবাজিতে উড়ে যেত বৈকুণ্ঠ বরাটের শেষ বংশধরের গোটা মুণ্ডটাই। হলও তাই।
বিলকুল বলেছে বুঝি?
সব। আরও বলেছে, এখন ওর মাথা ঠিক হয়ে গেছে–ছেড়ে দিলে আর মেয়ে খুন করবে না।
পাগল শিউরে উঠে বললে কবিতা।
* সানন্দা পত্রিকায় প্রকাশিত। (ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৫)।
পায়রাকুঠীর রহস্য
আসলে বাড়িটা সাহেব বাড়ি। অনেককাল আগে যখন সাহেবরা রাজত্ব করত এদেশে, এবাড়ি তখনকার তৈরি। মোটা মোটা থাম। এত মোটা যে দু-হাতেও আঁকড়ে ধরা যায় না। চুনবালির তৈরি হলেও দারুণ মজবুত, কামান দাগলেও ভাঙতে সময় লাগবে।
দুশো বছরের পুরোনো বাড়ি। কিন্তু আজও যেন নতুন। সামনে পেছনে ডাইনে বাঁয়ে প্রকাণ্ড বাগান। জনসন সাহেব যদ্দিন ছিলেন, সেখানে ফুলের বাহার দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত। এখন শুধু জঙ্গল।
জনসন সাহেবের বউ মারা যেতেই মনের দুঃখে তিনি বিলেতে চলে যান। বাড়িটা জলের দরে কিনে নেয় নীলমাধব সিংহ। ভদ্রলোক পকেটে তামার পয়সা নিয়ে এসেছিল ব্যবসা করতে। কয়েক মাইল দূরে পাহাড়ের গায়ে তখন মিলিটারি ব্যারাক বসেছে। হরদম গাড়ি যাতায়াত করছে। রাস্তার ঠিক ধারে একটা পেট্রল পাম্প খুলে বসতেই দুদিনেই ফুলে লাল হয়ে গিয়েছিল সিংহমশায়।
সে আজ অনেকদিনের কথা। সিংহমশায় এখন মরে হেজে স্বর্গে। এত বড় বাড়িটা দিয়ে গিয়েছিল দুই ছেলেকে। বেণীমাধব আর ননীমাধবকে। দুজনেই দুধরনের মানুষ। বেণীমাধব শুধু পায়রা ওড়ায়। পায়রাকে এমন শিক্ষা দেয় যে অনেক মাইল দূর থেকে ছেড়ে দিলেও ঠিক উড়ে আসে কবুতর খোপে। বাড়ির মধ্যে ঘরে ঘরে নাকি শুধু পায়রার খোপ বানিয়েছে সে। দামি দামি পায়রা কিনে নিয়ে যাচ্ছে দেশ-বিদেশের লোকরা গোপনে খবর পাঠানোর জন্যে। পায়রার পায়ে চিঠি বেঁধে ছেড়ে দিলেই হল–ঠিক উড়ে ফিরে যাবে নিজের জায়গায়। পায়রা রেস জেতবার জন্যেও খদ্দের আসছে দামি দামি গাড়ি চেপে। আর আসছে নানারকমের লরি আর ভ্যান–পায়রাদের খাবার নিয়ে।
পাহাড়ি মানুষরা তাই সাহেব বাড়ির নাম দিয়েছিল–পায়রাকুঠী। দিনরাত পায়রা উড়ছে, নামছে বকবকম করছে সেখানে। এ নাম সে বাড়িকেই মানায়। মাঝে মাঝে পেল্লায় মোটর হাঁকিয়ে পায়রাদের নিয়ে অনেক দূরে চলে যেত বেণীমাধব। পাহাড়ের ওদিকে গিয়ে পায়রাগুলোকে ছেড়ে দিয়েই জোরে মোটর হাঁকিয়ে ফিরে আসত পায়রাকুঠীতে। কিছুক্ষণ পরেই দেখা যেত নীল আকাশ থেকে দল বেঁধে পতপত করে নেমে আসছে ফেলে আসা পায়রার দল।
পায়রার মাস্টার বেণীমাধব বিয়ে-থা করেনি। বেণীমাধবের ভাই ননীমাধবও করেনি। বেণীমাধব পায়রা নিয়ে মশগুল। ননীমাধব মঠ-মন্দির নিয়ে উদাসীন। একমুখ দাড়ি, গেরুয়া বসন, রুদ্রাক্ষের মালা–এই ছিল ননীমাধবের সম্বল। মাঝে মাঝে আসত দাদার কাছে। স্টেশন থেকেই শোনা যেত তার হর-হর-ব্যোম-ব্যোম ডাক। হেঁটেই আসত। দুপাশের লোক সরে যেত তাকে দেখে। কেউ কেউ পেন্নাম ঠুকত ভক্তিভরে। মৃদু হেসে সবাইকেই নমস্কার করত ননীমাধব।
পায়রাকুঠীতে তাই কোনও রহস্য ছিল না। কিন্তু সংসারে কিছু রহস্যসন্ধানী আছেন মামুলী বস্তুর মধ্যে থেকেও যাঁরা চমকপ্রদ চক্রান্তকে উদ্ধার করতে পারেন। যেমন আমাদের ইন্দ্রনাথ রুদ্র। প্রাইভেট ডিটেকটিভ। চেহারাটা কবি কবি হলেও স্বভাবটা ঈগলপাখির মতো। শিকারকে ফসকাতে দেয় না।
এ কাহিনি সেই ইন্দ্রনাথ রুদ্রেরই।
