চেঁচিয়েছিল তখনই–যন্ত্রণায় আকুল হয়ে–চেঁচানি স্তব্ধ হয়েছে শাণিত নখ যখন একটানে দু-টুকরো করেছে কণ্ঠনালি।
.
বারান্দায় নীচে বাগানে এখন জঙ্গল বাগানের নামগন্ধ নেই। এই জঙ্গল শেষ হয়েছে সমুদ্রের ধারে বালির সৈকতে।
গভীর রাতে একটা টর্চ বারকয়েক জ্বলে উঠে নিভে গেল এই জঙ্গলের অন্ধকারে।
যেন হারানো নিধি খুঁজছে অন্ধকারের প্রেত।
.
ডেডবডি তখনও চাদর দিয়ে চাপা। পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়াল প্রাসাদের গাড়ি-বারান্দায়। গাড়ি থেকে নামলেন সুদেহী এক অফিসার। কোমরে রিভলভার।
অভ্যর্থনা জানাল শুধু ইন্দ্রনাথ।
অফিসার বললেন, ফোর্স আনতে বারণ করলেন কেন?
দরকার কী? আপনার আর আমার রিভলভারই যথেষ্ট।
যদি গুলি ফসকায়…না, না, আপনার নয়…আমার।
ইকবাল হোসেনের গুলি আকাশের উড়ন্ত পাখিকেও মাটিতে নামিয়ে আনে।
প্রেতের গায়ে কি গুলি লাগবে?
লাটনগরের প্রেত? ওই সেই বটগাছ–ওই সেই ডাল–যেখানে ঝুলছিল তার নশ্বর দেহ। ইকবাল হোসেন, হয়তো তিনি এখনও আছেন।
বাঘের আঁচড় মশায়–বারান্দা টপকে ঢুকেছিল–বারান্দা টপকে পালিয়েছে।
শিকারকে মুখে না নিয়ে?
যা চেঁচিয়েছিল মেয়েটা—
বাঘ কখনও মেয়েদের গোপন জায়গায় আক্রোশ দেখায়?
সেক্স ম্যানিয়াক বাঘ নাকি?
তার চাইতেও জঘন্য–মানুষ।
সে কে?
স্বচক্ষে দেখে যান।
.
নাচঘরে এখন সাদা পাথরের গোল টেবিলে মুখোমুখি বসে বিলকুল আর ধনগোপাল, ইকবাল আর ইন্দ্রনাথ।
শেষের দুই ব্যক্তির সামনে দুটি রিভলভার, বিলকুলের সামনে নামী ব্র্যান্ডের সেলোটেপ আঁটা এক প্যাকেট সিগারেট, ধনগোপালের সামনে রুপোর নস্যির ডিবে।
ইন্দ্রনাথ বললে, গল্পটা ছোট করে আনছি। এ বাড়িতে অভিশাপ লেগেছে। বৈকুণ্ঠ বরাটের শেষ বংশধর ধনগোপাল বরাট মরলেই বংশ ধ্বংস হবে। ওঁর স্ত্রী মারা গেছেন সেক্স ম্যানিয়াকের হাতে। ওঁর পুত্রবধূ মারা গেলেন–
বাঘের নখে, বললেন ধনগোপাল।
না। মসৃণ গলায় বলে গেল ইন্দ্রনাথ, একই সেক্স ম্যানিয়াকের হাতে।
পাগলের হাতেও অমন নখ থাকে না।
বানিয়ে নেওয়া যায়।
ম্যাজিকের মন্ত্র পড়ে?
এইভাবে, পকেট থেকে রুমালের পুঁটলি বের করে টেবিলে বিছিয়ে দিল ইন্দ্রনাথ। পাঁচটা ইঞ্চি দেড়েক লম্বা নরুণ। গায়ে সেলোটেপ জড়ানো।
ইন্দ্র বললে, পাঁচ আঙুলে সেলোটেপ দিয়ে বাঁধা হয়েছিল পাঁচটা খুদে নরুণ। শিবাজির বাঘনখ থেকে আইডিয়াটা ধার করেছিল হত্যাকারী–মেয়েদের নরম শরীর ফালাফালা করে উকট আনন্দ পাওয়ার জন্যে।
বুঝলাম, শেয়াল-চোখে ধূর্ততার ঝিলিক ঝলসিয়ে বললেন ধনগোপাল, মালগুলো পেলেন কোথায়?
আপনার পুত্রবধূ যে ঘরে খুন হয়েছে, সেই ঘরের সামনের বারান্দায় নীচের জঙ্গলে। খুন। করেই সে একটানে নরুণ পাঁচটা খুলে নিয়ে জঙ্গলে ফেলে দিয়েছিল–যেখানে কেউ খুঁজতে যাবে নাজানা না থাকলে চোখে পড়লেও মাথা ঘামাবে না। কিন্তু আমি জানতাম না–তাই খুঁজছিলাম।
নরুণ বাহিনী। মৃদু স্বরে বললেন ইকবাল হোসেন।
হ্যাঁ, বললে ইন্দ্রনাথ, আপনার মুখেই শুনেছি। পার্টির ছেলেরা নরুণ বাহিনী গড়েছে পুলিশি অ্যারেস্ট রোখবার জন্যে। যাক সে কথা। এ নরুণ যে চালিয়েছে, সে চাবুকও হাঁকড়েছে। বিদ্রোহিনীর বডিতে।
চাবুকটা পেয়েছেন?
ওই তো রয়েছে আলমারির মধ্যে…রক্ত লেগে রয়েছে…ফোরেনসিক সায়েন্স বলে দেবে, এ রক্ত বিদ্রোহিনীর।
কিন্তু সে রক্ত ঝরাল কে? ইকবালের প্রশ্ন।
সেক্স ম্যানিয়াক, নরম গলায় বললে বিলকুল। বলে তাকাল ধনগোপালের দিকে।
তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন ধনগোপাল–শুয়ার কা…। গেট আউট। নেমকহারাম!
ধীরে-ধীরে, ধনগোপালবাবু, ভেলভেট কোমল গলায় বলে গেল ইন্দ্রনাথ, আপনি সেক্স ম্যানিয়াক নিঃসন্দেহে চাবুকের ভয় দেখিয়ে বিধবা পুত্রবধূকে উপভোগ করেছেন নিশ্চয় এই চাবুকের ভয়েই আপনার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী পালিয়েছিলেন–এবং হয়তো তাকে চাবুক মারবেন বলেই বিলকুল আচারিয়াকে পাঠিয়েছিলেন তাঁকে পাকড়াও করে আনার জন্যে কিন্তু ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে গেল চোরে-চোরে মাসতুতো ভাইয়ের ব্যাপার বিলকুল আচারিয়া–টেবিল থেকে হাত সরান–
কিন্তু অনেক বেশি ক্ষিপ্র বিলকুল। মুখচোখের ভাব পালটাচ্ছিল একটু-একটু করে ইন্দ্রনাথের শেষ কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই চোখের তারায় অমানবিক নৃশংসতা বিচ্ছুরিত হয়েছিল–এখন বুঝি বিদ্যুতের চাইতেও বেশি গতিবেগে দু-মুঠোয় তুলে নিল সিগারেটের প্যাকেট আর নস্যির ডিবে– চেয়ার উলটে ফেলে দিয়ে পেছনে ছিটকে গিয়েই সিগারেট প্যাকেট ছুঁড়ে দিল ইন্দ্রনাথের দিকে– একই সঙ্গে নস্যির ডিবে নিক্ষিপ্ত হল ধনগোপালের দিকে।
হতচকিত ধনগোপাল চেয়ার ছেড়ে ওঠবার সময় পাননি–তাই নস্যির ডিবে ফাটল তাঁর মুখের ওপর–ভয়ানক বিস্ফোরণ–মুণ্ড উড়ে গেল ধড় থেকে।
সিগারেট প্যাকেটও ফাটল ইন্দ্রনাথের সামনে টেবিলের পাথরে। বিস্ফোরণের পর দেখা গেল, সাদা মর্মর প্রায় সাদা পাউডার হয়ে ঘরময় উড়ছে।
বিলকুল তখন বাইরে। ছুটছে। বারান্দা দিয়ে। দশহাত পেছনে ইন্দ্রনাথ আর ইকবাল। দুজনের হাতেই রিভলভার। গজরাল আগ্নেয়াস্ত্র–একইসঙ্গে ছিটকে পড়ে মসৃণ পাথরের মেঝে দিয়ে পিছলে গেল বিলকুল। তার দুটো মালাইচাকি গুঁড়িয়ে গেছে।
.
কবিতা বললে, বিলকুলকে কেন সন্দেহ করলে?
ওর পদবী শুনে আর অয়েল পেন্টিং দেখে।
