ধনগোপাল বললেন, বিলকুলের ডানদিকের দেওয়ালে আলমারিতে রয়েছে কাটা চাবুক। দেখুন আপনি–আমি একটু মাল খেয়ে আসি।
বিদায় হলেন ধনগোপাল–কেঁচা লুটিয়ে। বিলকুল আর ইন্দ্রনাথ তাঁর গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল সেকেন্ড কয়েক।
তারপর বললে ইন্দ্রনাথ, আপনার নামটা অদ্ভুত।
অবাঙালি বলে মনে হয়? হাড় খটখটে চেহারা হলেও বিলকুলের গলা মার্জিত মিষ্টতা আছে।
তা বটে। পদবী কী আপনার?
আচারিয়া। ইন ফ্যাক্ট, আমরা ইউ-পির মানুষ। বাঙালি বনে গেছি।
বিদ্রোহিনী বরাটের খবর আপনি পেলেন কী করে?
এস্টেট ম্যানেজ করতে গেলে শহরে যেতেই হয় সর্বত্র গতিবিধি রাখতে হয়। এসব কটেজ যারা ভাড়া নেয় তারা কেউ নিখাদ সোনা নয়। এ-ওর বউকে ভাঙিয়ে নিয়ে রাত কাটিয়ে যায়, কখনও অফিসের মেয়ে, কখনও পাড়ার দিদি-বোন-বউদি, কখনও স্রেফ কলগার্ল।
বুঝেছি। লাটনগর তাহলে আসল পাপনগর?
গম্ভীর মুখে কিন্তু শান্ত চোখে সংক্ষেপে জবাব দিল বিলকুল, ব্যাবসা।
কালো ব্যাবসা। পাপ তো এই প্রাসাদেও, তাই না?
চুপ করে রইল বিলকুল। কিন্তু জবাবটা ভেসে এল দূর থেকে একটা নারী কণ্ঠের আর্ত চিৎকারের মধ্যে দিয়ে। সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়ে, ঝাউ গাছগুলোর মর্মরধ্বনি ডুবিয়ে–ক্ষণস্থায়ী কিন্তু আকুল সেই চিৎকার রণরণিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে গেল প্রাসাদের অলিন্দে-অলিন্দে বেশ কয়েক সেকেন্ডে। তারপর সব চুপ।
দেওয়ালে প্রলম্বিত অয়েল পেন্টিং-এর দিকে চোখ তুলে নিশ্চুপ দেহে দাঁড়িয়ে বিলকুল। নির্বিকার।
কার কণ্ঠ? প্রশ্ন ইন্দ্রনাথের।
মৌমিতার।
ধনগোপাল বরাটের পুত্রবধু?
হ্যাঁ।
চেঁচাল কেন?
অয়েল পেন্টিং থেকে চোখ নামিয়ে ঠান্ডা গলায় বললে বিলকুল, আপনি তা জানেন।
এত নিশ্চিতভাবে বলছেন কেন?
কারণ, বস সবার কাছে বড়াই করেন।
এই প্রথম বিলকুলের কণ্ঠস্বরে ঈষৎ উত্তাপের আভাস লক্ষ করল ইন্দ্রনাথ। বললে, যে অয়েল পেন্টিংটা এতক্ষণ চোখের পাতা না কাঁপিয়ে দেখছিলেন–সেটা কার, তাও বলেছেন।
অয়েল পেন্টিংয়ের দিকে ফের চোখ ঘুরে গেল বিলকুলের, বেচারা। কিন্তু শেষ অভিশাপ ঘুরছে এই প্রাসাদের বাতাসে।
কেন?
কয়েকটা রাত থাকলেই বুঝবেন।
প্রেতাত্মার কথা বলছেন?
হ্যাঁ। শুনেছি, ফাঁসিতে ঝোলাবার আগে বৈকুণ্ঠ বরাটের দিকে তাকিয়ে তিনি দাঁতে দাঁত পিষে বলেছিলেন–আমার জারজ সন্তান এর শোধ নেবে বৈকুণ্ঠ।
আপনি জানলেন কী করে?
আপনিও জানতে পারবেন। কদিন থাকুন। এই ঝাউবনের বাইরে যারা থাকে, তারা জানে। দেখছেন না, এ বাড়ির কেউ স্বাভাবিক নয়। বিধবা পুত্রবধূর মৃত্যুও বুঝি এর চাইতে ভালো ছিল। বিদ্রোহিনী পালিয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল কিন্তু কী হল!
মাধবেন্দ্রর ছেলে তো এখন বেঁচে নেই–থাকলে বলতাম খুনটা করেছে সেই।
থাক সে কথা।
আমার তো মনে হয় এ ভিটেতে ঘুঘু চড়িয়ে ছাড়বে মাধবেন্দ্রর প্রেতাত্মা।
পূর্ণ চোখে ইন্দ্রনাথের পানে তাকাল বিলকুল–আশ্চর্য নয়।
কাঁটা চাবুকটা দেখান।
আসুন। এই দেখুন। লাল ভেলভেটের ওপর কত যত্নে সাজিয়ে রাখা–যেন অমূল্য ধন। শেষের দিকের শ্লেষ আর প্রচ্ছন্ন রইল না বিলকুলের কণ্ঠে।
আলমারিটা খুলুন—
হাতে নিয়ে দেখবেন? দেখুন।
কী লাগানো রয়েছে বলুন তো? ভেসলিন নয়কালচে…এ যে রক্ত…শুকনো রক্ত!
পাথরের মতোন শক্ত হয়ে গেল বিলকুলের দুই চক্ষু দুই মণিকা এখন গ্র্যানাইট কঠিন—রক্ত!
হ্যাঁ।–পুত্রবধূকে পেটান হয়েছিল নাকি?
হলে জানতে পারতাম।
আপনাকে মৌমিতা সব কথা বলে মনে হচ্ছে?
ঠিক ধরেছেন। আমার কিছু করার নেই। গৃহভৃত্য ছাড়া আমি কিছুই নই।
চাবুকের রক্ত খুব পুরোনো নয়।
তাই তো দেখছি।
কার রক্ত বলে মনে হয়?
চোখ নামিয়ে নিয়ে বললে বিলকুল, সেটা আপনি বলবেন। আমি যাই, আপনার আহারাদির ব্যবস্থা করি।
ঘর যখন ফাঁকা হয়ে গেল, তখনও ইন্দ্রনাথ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল অয়েল পেন্টিংয়ের সামনে। কাটা চাবুক তার দু-হাতে।
চমক ভাঙল মরণাত্মক আর্তনাদে।
নারীকণ্ঠের আর্তনাদ। একবার…দুবার…তারপর নৈঃশব্দ্য।
ধাবমান পায়ের আওয়াজ শোনা গেল চওড়া বারান্দায়–যেদিকে রয়েছে সমুদ্র।
ঘরে ঢুকল বিলকুল। চক্ষু বিস্ফারিত। হাঁপাচ্ছে, শুনলেন?
কার কণ্ঠ? একইরকম নিরুত্তাপ স্বরে বললে ইন্দ্রনাথ।
মৌমিতার।
সে এখন কোথায়?
আসুন।
বারান্দার শেষের দিকে যাওয়ার পথে পাশের একটা ঘর থেকে হাঁক শোনা গেল ধনগোপালের, কে যায়?
আমি। বললে বিলকুল।
কে চেঁচাল অমন করে?
আপনার পুত্রবধূ? এবারের জবাবটা ইন্দ্রনাথের। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। সাদাকালো মার্বেল বাঁধানো মেঝের ওপর কার্পেট পাতা। মখমলের তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে ধনগোপাল। সামনে হুইস্কির বোতল আর গেলাস। বললে স্থালিত স্বরে, মাগির বড় বাড় বেড়েছে। যাচ্ছি।
বিলকুল ঢুকল ঘরে। কার্পেট থেকে ধনগোপালকে টেনে তুলল দুই বগলের নীচে হাত গলিয়ে, চলুন।
ফের বারান্দা। দু-খানা ঘর পরেই ডানদিকের দরজা খোলা। আলো জ্বলছে।
চৌকাঠে থমকে দাঁড়াতে হল তিনজনকেই।
মাতালের গলা দিয়ে বেরিয়ে এল শুধু একটা শব্দ, যাচ্চলে।
বিশাল পালঙ্কে এলিয়ে রয়েছে অর্ধনগ্না গৌরবর্ণা এক নারীদেহ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত।
গোটা শরীর ফালাফালা হয়ে গেছে ধারাল নখের খাবলানিতে। লম্বালম্বি টান। বুকের ফুল টুকরো-টুকরো। ঠোঁট আধখানা নেই। সবচেয়ে বেশি আঁচড়ানি দুই জঙঘার মাঝে–পৈশাচিক আক্রোশ যেন সেইখানেই।
