মাধবেন্দ্র কিন্তু টলেনি।
তাই একদিন দেখা গেল, ব্রিটিশ সৈন্য অতর্কিতে হানা দিয়ে মাধবেন্দ্রকে ঝুলিয়ে দিয়েছে ফাঁসির দড়িতে–তাঁরই প্রিয় বটগাছের ডালে। অপরাধ–সিপাই বিদ্রোহে মদত দেওয়া।
পালিয়ে বাঁচল মাধবেন্দ্রর কিশোর পুত্র–যার ধমনীতে রয়েছে ইংরেজ রক্ত স্ত্রীর মৃত্যু আগেই ঘটেছিল।
যে কজন জানল ব্যাপারটা, তারা মুখে চাবি দিয়ে রইল বৈকুণ্ঠর ভয়ে।
প্যালেস ঘিরে গড়ে উঠল বসতি। বরাট এর ব বাদ দিয়ে নাম দেওয়া হয়েছিল রাটনগর। কালক্রমে তা দাঁড়িয়েছে লাটনগর।
এই লাইনগরের বর্তমান মালিক ধনগোপাল বরাট দিন কয়েক আগে এসেছিলেন আমার কাছে। বিদ্রোহিনীর মার্ডারারকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে।
দৈনিক ক্রাইমে খবরটা পড়ে?
হ্যাঁ। প্রথমে গেছিলেন পত্রিকা অফিসে। আত্মপরিচয় দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, বিদ্রোহিনীকে তিনি ত্যাগ করেননি বিদ্রোহিনীই তাঁকে ত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হয়েছিল। কারণ, তিনি তাঁর বিধবা পুত্রবধূর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করে চলেছেন।
চোখের তারা স্থির হয়ে গেল কবিতার। মুখে কথা নেই।
জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে গেল ইন্দ্রনাথ।
.
ভদ্রলোকের মুখাবয়ব শেয়ালের মতোন ছুঁচোল। চোখ কোটরে ঢোকানো। কান খাড়া– খরগোশের কানের মতোন। ভয়ানক ফরসা রং যেন ফেটে পড়ছে। নিখুঁতভাবে কামানো গাল আর চিবুক–ঠোঁটের নীচের গোঁফজোড়া কিন্তু বাইসনের বাঁকানো শিং-এর অনুকরণে মোম দিয়ে সযত্নে পাকানো। গায়ে গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি। চাহনি চঞ্চল এবং ধূর্ততায় পিচ্ছিল। প্রথম দর্শনেই তার চরিত্রের সততা সম্বন্ধে সন্দেহ জেগেছিল দৈনিক ক্রাইম পত্রিকার নিউজ এডিটরের মনে।
জিগ্যেস করেছিলেন, আপনার স্ত্রী? ত্যাগ করেছিলেন কেন?
আমি করিনি। অম্লানবদনে বলেছিলেন ধনগোপাল, পালিয়ে গেছিল।
কেন?
আর বলেন কেন। বউ মরে গেল–ছেলেটার বিয়ে দিলাম–একই ছেলে। সে ব্যাটাও অক্কা পেল। কী করি বলুন? ঘরের বউকে তো পরকে দেওয়া যায় না। তাই একটু ইয়েটিয়ে করতাম।
শাট আপ। আপনি আসতে পারেন।
আসব মানে? লাটনগর থেকে এতটা পথ ঠেঙিয়ে এলাম কি আপনার বদনচন্দ্র দেখে বিদায় নেব বলে? মেয়েটাকে কে মারল, তা জানব না!
আপনি যান।
না, যাব না। দ্বিতীয় পক্ষের বউ হয়ে এসেছিস, সেইভাবে থাকলেই পারতিস। খাওয়া পরার অভাব তো ছিল না–তা না, আমি আমার ছেলের বউয়ের সঙ্গে কী করছি তাই নিয়ে মাথা গরম।
গেট আউট।
বুঝেছি। আপনার কম্ম নয়। ইন্দ্রনাথ রুদ্র নামে কে একটা ডিটেকটিভ যেন আছে? সত্যি, না সেটাও বোলচাল কাগজ কাটানোর গল্প? আছে? দিন, দিন, ঠিকানা দিন–দেখি তার মুরোদ।
আপনিই ইন্দ্রনাথ রুদ্র? চেহারাটা বাগিয়েছেন খাসা–লায়ক-লায়ক।
লায়ক নয়–নায়ক।
নস্যি-নস্যি…নাক বুজে গেছে মশায়–আপনিও নেন? দিন।
আপনার কুকীর্তি এখুনি শুনলাম–টেলিফোনে।
ভ্যানতারা নিউজ এডিটরটা ফোন করেছিল? বোগাস লোক মশায়–আমি চাই বিদ্রোহিনীর মার্ডারারকে। কেন? দূর মশায়, গলা কাটতে যাব কেন? গালে চুমু খাব। মাগিকে টাইট দিয়েছে ভালোই।
আপনি খুশি?
বিলক্ষণ। পেটের ভাত জোগাতে বেশ্যাগিরি করছে, সে খবর পেয়েছিলাম। ঘরে ফিরিয়ে আনতেও চেয়েছিলাম।
আপনার মনে লম্পটের ঘরে?
সে নিজেই বা কম যাচ্ছিল কীসে! এইসব মেয়েদের পিটোতে আমার ভারি–
তাই ফিরিয়ে আনতেন?
হা-হা! ঠিক ধরেছেন। কাটাওলা চাবুক তো ঘরেই আছে।
আপনার ঘরে?
মাইরি মশায়, কী ভাবেন আমাকে? বাপ চোদ্দো পুরুষের চাবুক যত্ন করে রাখব না? ছেলের বউ তো চাবুকের ভয়েই–
আমাকে দেখাবেন?
নজর দেবেন? যা ফিগার আপনার—
চাবুকটা দেখতে চাই।
তাই বলুন! চলুন না–গাড়ি রেডি।
ঝাউবন দিয়ে ঘেরা সারি-সারি কটেজ। একপ্রান্তে একটা দোতলা বাড়ি। ব্রিটিশ স্থাপত্য বনেদ থেকে ছাদ পর্যন্ত। বড়-বড় থাম কলকাতার সেনেট হাউসের অনুকরণে।
এই বাড়িটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাগান সমেত। পাঁচিলের বাইরে ঝাউবনের মাঝে-মাঝে কটেজ ভাড়া দেওয়া হয়। তিন দিকে। আর একদিকে সমুদ্র।
দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধনগোপাল বললেন, অনেকটা পথ এসেছেন। রাতও হয়েছে। একটু মাল চেখে নেবেন?
চাবুকটা দেখান।
অ্যাবাউট টার্ন করুন। ওই যে হলঘর–এ বাড়ির নাচঘর। দেওয়ালে-দেওয়ালে ওই যে অয়েল পেন্টিংগুলো দেখছেন–আমার পূর্বপুরুষদের শুরু সেই বৈকুণ্ঠ বরাট থেকে। এই যে এই ছবিটা–পাশেরটা কার বলুন তো? হা-হা–সেই গবেটটার–যাকে ফাঁসিতে লটকে ছিল বৈকুণ্ঠ বরাট কায়দা করে–
মাধবেন্দ্র আচার্য।
নামটা মনে রেখেছেন তাহলে! গাড়ির ঝাঁকুনিতে অনেক কথাই পেট থেকে বেরিয়েছে দেখছি। –কে?
হলঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে একটা লম্বা ছায়ামূর্তি, আমি।
বিলকুল?
আজ্ঞে।
মশায় ডিটেকটিভ, এই আমার ম্যানেজার–এর মুখেই খবর পেয়েছিলাম, কেলে বউটা কেলোর কীর্তি করে বেড়াচ্ছে–জানতেও পাঠিয়েছিলাম–তার আগেই গেল ফরসা হয়ে। বিলকুল, ওই ঝাড়বাতিটা জ্বালো।
জ্বলে উঠল ইলেকট্রিক ঝাড়বাতিলাটনগরের পাওয়ার হাউস চলে হাওয়া কলের দৌলতে সমুদ্রের হাওয়ায়। ধনগোপালের ব্রেন।
ম্যানেজার বিলকুল ঘুরে দাঁড়াল দেওয়ালের সুইচ বোর্ডের সামনে। লোকটা যেমন দীর্ঘকায়, তেমনি অস্থিময়। রোগা হাড় নয়–মোটা হাড়। চোয়াল বুলডগের চোয়ালের মতোন চৌকো। চোখ দুটো ধীর স্থির শান্ত।
