মূর্চ্ছিতা।
কেন? কেন? কেন?
দৈনিক ক্রাইম রিপোর্টেড ওই পাষণ্ডটার কাণ্ড পড়বার পর।
পাষণ্ড করেছে পাষণ্ডর কাজ–তাতে তোমার মস্তিষ্ক লণ্ডভণ্ড কেন?
তার আগে বলো, দৈনিক ক্রাইম তোমাকে অ্যাপয়েন্ট করেছে?
হ্যাঁ। নটগোপাল সহায়কে ধরবার জন্যে?
হ্যাঁ।
সন্ধান পেয়েছ?
না।
ইকবাল হোসেন ত্বরিৎ গতিতে এগিয়ে গেলেন, খুনির নাম বের করে ফেললেন, আর তুমি তার—
টিকি ধরতে পারছি না, এই তো? হে বউদি, ইকবাল যা কিছু খবর পেয়েছেন সবই তো
ওই নাইট ক্লাব থেকে। সেখানে রেগুলার যারা আসে, তাদের নামধাম রেজিস্টারে লেখা থাকে। তারপর?
তারপর কী?
সব ফলস। ইকবাল হোসেন তাই এখন ল্যাজেগোবরে।
বিশদ করো ঠাকুরপো।
ইকবাল খোঁজ নিয়েছিলেন নটগোপালের রেসিডেন্সে–সেখানে ওই নামে কেউ থাকে না।
নটগোপাল তাহলে আর্মিতেও ছিল না?
মনে তো হয়।
তার ক্রিমিন্যাল কীর্তিকলাপ ইকবাল হোসেন জানলেন কী করে?
ক্লাবেই বড়াই করত নটরাজ—
নটগোপাল।
ওই হল গিয়ে। মদের বেঁকে এন্তার কথা বলেছে সমাজশ্রেণির মানুষদের কাছে। নাইট ক্লাবে কখনও যাওনি–গেলে বুঝতে সেখানে কী শ্রেণির লোক আসে।
তুমি যাও বুঝি?
পা নাচিয়ে গুনগুন করে গান গাইতে লাগল ইন্দ্রনাথ। তারপর পকেট থেকে বের করল পাইপ আর টোব্যাকো।
কবিতা বললে, তবুও ভালো। নস্যিটা ছেড়েছ।
কিছুই ছাড়িনি। সবই আছে। দরকার মতো ইউজ করি। যেমন করেছি ধনগোপালকে কজা করার জন্যে।
ধনগোপাল আবার কে?
বিদ্রোহিনীর হাজব্যান্ড।
ঝট করে শিরদাঁড়া সিধে করে ফেলল কবিতা, বিদ্রোহিনী! সেই কুলটা মেয়েটা?
মেয়েরাই মেয়েদের বড় শত্রু। কুকর্মের এহেন সাজাপ্রাপ্তির পরেও তাকে কুলটা বলাটা অন্যায়।
কে এই ধনগোপাল?
লাটনগরের নাম শুনেছ? শোনোনি। শিগগিরই দৈনিক ক্রাইমে বেরোবে দ্বিতীয় কিস্তি– তখন জানতে পারবে।
তার আগে তোমার মুখে শুনব।
শোনো।
সমুদ্রের ধার বরাবর পান্থনিবাস গড়বার একটা হিড়িক খুব লক্ষ করা যাচ্ছে। ইদানীং দেশ বেড়ানোর বাতিক যাদের, তারা এইসব জায়গায় কিস্তিতে টাকা নিয়ে ফ্ল্যাট কিনেও রাখছে।
লাটনগরও সমুদ্রের ধারে–গভীর ঝাউবনের মধ্যে। কিন্তু এ যুগের প্রোমোটারদের জন্ম হওয়ার আগে পরিকল্পিত। সিপাই বিদ্রোহের ঠিক পরে লাটনগরের পত্তন ঘটে সুন্দরবনের গভীর গহন অঞ্চলে। সেখানে গেলে ইতিহাস যেন গাছের পাতায়-পাতায় কথা কয়। আমি সেই কথা শুনে এসেছি।
সিপাই বিদ্রোহ যখন শুরু হয়নি, মঙ্গল পাণ্ডে যখন ব্যারাকপুরে রুখে দাঁড়ায়নি, তখন এক কর্মঠ ব্রাহ্মণ যজমানি ত্যাগ করে সেই অঞ্চলে চলে যান শান্তিতে থাকবেন বলে। মানুষের সঙ্গ তার ভালো লাগেনি বিশেষ একটা কারণে। নাম তার মাধবেন্দ্র আচার্য বারেন্দ্র। ঘণ্টা বাজানো তিনি ঘৃণা করতেন, কিন্তু কুড়ুল চালাতে পারতেন ভালো। বন্দুক আর তলোয়ার ছিল তার নিত্য সঙ্গী। তার ভেতরে ছিল বজ্র–আগুন ছিল চোখে। এই পৃথিবীর একটা মানুষ জাতকে তিনি অন্তরের দাবানল দিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিলে স্বস্তি পেতেন।
সে জাতটা ইংরেজ জাত।
কারণ, তাঁর সুন্দরী যুবতী বধূকে উপভোগ করে গেছিল এক ইংরেজ সামরিক অফিসার। ছফুট লম্বা মাধবেন্দ্র আচার্য তাকে ক্ষমা করেননি কুড়ুলের এক কোপে খুলি দু-ফাঁক করে দিয়েছিলেন।
ধর্ষিতা স্ত্রীকে নিয়ে চলে গেছিলেন জঙ্গলে। সেইখানেই ফুটেছিল ধর্ষণের ফুল। মাধবেন্দ্র তাকে নিজের ছেলে বলেই গ্রহণ করেছিলেন। বড় করে তুলেছিলেন।
সেই যুগে জায়গাজমি নিয়ে এত লেখাজোখা হত না। জঙ্গলের জমিতে কে বাড়ি বানিয়ে জমি দখল করেছে–অত ভাববার দরকার হত না। কুড়ুল চালিয়ে গাছ সাফ করে সুন্দর একটা আস্তানা বানিয়ে তুলেছিলেন মাধবেন্দ্র। কুড়ুলের কোপে বাঘ মেরেছেন, সাপ সাফ করেছেন।
এই সময়ে সিপাই বিদ্রোহ শুরু হল এবং শেষও হয়ে গেল। আঁচ পৌঁছল না জঙ্গলের শান্তিঘেরা অঞ্চলে।
ব্রিটিশ সরকার কিন্তু বিদ্রোহের গতিপ্রকৃতি আর নেতৃত্বের পরিচয় জানবার জন্যে খোঁজ নেওয়া শুরু করেছিল। দেখা গেছিল, বিদ্রোহ ঘটেছে শুধু উত্তরভারতেই–যে জায়গাটা আর্যদের বাসভূমি বৈদিক আর্যাবর্ত। বিদ্রোহের নায়করা প্রায় সকলেই ব্রাহ্মণ।
সেনাদলে নৈতিক নেতৃত্ব নিল কীভাবে ব্রাহ্মণরা? খোঁজ নিয়ে জানা গেছিল–সবই বেদের ক্ষমতা। ব্রিটিশ সরকার তখন বেদের ব্যাখ্যা করিয়েছিল ম্যাক্স মুলারকে দিয়ে। একই সঙ্গে খতম করতে চেয়েছিল ব্রাহ্মণদের–শুরু হয়েছিল শত্ৰুসংহার বড় ভয়ানকভাবে। শাহী সড়ক বা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের দু-ধারে গাছে-গাছে ফাঁসিতে লটকে দেওয়া হয়েছিল পৈতেধারী ব্রাহ্মণদের–গাঁয়ে হানা দিয়ে ব্রাহ্মণ পেলেই ধরে এনে ঝুলিয়ে দিয়েছে। ঝুলন্ত ব্রাহ্মণদের নামিয়ে এনে সৎকার করতেও দেওয়া হয়নি।
এই সময়ে বৈকুণ্ঠ বরাট নামে এক ধনকুবের সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ জায়গা ইজারা নেয় ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে বিদ্রোহ দমনে বিস্তর সাহায্য করার পারিতোষিক হিসেবে।
মাধবেন্দ্রকে উৎখাত করার দরকার হয়েছিল তখনই। অথচ তাকে যমের মতোন ভয় পেত বৈকুণ্ঠ। প্রথমে বন্ধুত্ব দিয়ে জয় করার চেষ্টা করেছিল মাধবেন্দ্রকে। সমুদ্রের ধারে নিজের প্যালেস যখন তৈরি হচ্ছে, মাধবেন্দ্রকে ডেকে এনে খাইয়েছে, নামী আর্টিস্টকে দিয়ে তার অয়েল পেন্টিং আঁকিয়ে ঘরে ঝুলিয়েছে, টাকা পয়সাও দিতে চেয়েছে।
