বাড়ি যাওয়া বন্ধ করলাম। বিনয় লজে ঘরভাড়া নিলাম। সেখানে অনেক লোকজন। খুনখারাপি এত সোজা নয়।
দুদিনেই টের পেলাম, অফিস থেকে বেরোলেই পেছনে ফেউ লাগছে।
তখন থেকেই বিনয় লজে এ দরজা দিয়ে ঢুকে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া আরম্ভ করলাম। রাত কাটানোর জন্যে মুচিপাড়ার এক বস্তিঘর ভাড়া নিলাম। বিনয় লজ থেকে বেরিয়ে কিছুটা সময় নিরাপদে কাটানোর জন্যে ঢুকতাম খোদ সিংহের গহ্বরে–পাঁচতারা হোটেলে। কেউ অন্তত সেখানে আমাকে খুঁজবে না। ওপরতলার বড় সাহেবরাও তো নিচে নামে না। রেস্তোরাঁয় ঢোকে না।
সঙ্গে নিয়ে যেতাম শেফালিকাকে। তাতে সন্দেহটা কম থাকে। ওসব জায়গায় একলা গেলেই তো সন্দেহ বাড়ে। শেফালিকা আমার প্ল্যানে সাহায্য করেছে। বৈধব্য বেশ ঘুচিয়ে সেজেগুজে হাজির থাকতে কষ্ট অবশ্য হয়েছে। মাধুরী কিন্তু ভুল ভেবেছে।
বেশ বুঝেছিলাম, এভাবে বেশিদিন চলবে না। মাধুরী যদি টিকি ধরে ফেলতে পারে–ওরাও ধরবে।
খবরটা পেলাম ইন্দ্রনাথবাবুর কাছে। মাধুরী আমাকে ফলো করেছে জেনে প্রথমে খুব হাসলাম। তারপর বুঝলাম খেল খতম হতে আর দেরি নেই।
কী করব জানি না। ইনি বললেন এখানে আসতে, তাই এলাম, এরপর?
.
শেষের নাটক
কবিতা বললে, আপনি আমার এই ঠাকুরপোটাকে চেনেন না। ও যদি মনে করে…সত্যিই যদি মনে করে…তাহলে পৃথিবীর কোনও শক্তিকে আপনার মাথার চুল ছুঁতে দেবে না। বলে, চাইল ইন্দ্রনাথের দিকে।
ইন্দ্রনাথ সশব্দে এক-টিপ নস্যি নিয়ে বললে, তাই হবে।
তাই হয়েছে। ইন্দ্র ওর মন্ত্রগুপ্তি খাঁটিয়েছে। কুমুদরঞ্জনের কেশাগ্র কেউ স্পর্শ করতে পারেনি পারবেও না।
মাধুরীর গলায় মালা দেওয়ার সময়ে নারদকে ডাকতে হয়নি। খুব খেয়েছিলাম সেদিন। কঞ্জুষ দুর্নাম ঘুচিয়েছিল কুমুদ–একদিনের জন্যে।
সবচেয়ে বড় কথা, আজও সত্যিকারের দেশপ্রেম দেখিয়ে যাচ্ছে কুমুদরঞ্জন–অন্য এক ব্রাঞ্চে বসে।
* প্রসাদ পত্রিকায় প্রকাশিত। (শারদীয় সংখ্যা, ১৯৯২)
পাগল খুনি
কাগজটার চারদিক দিয়ে চার হাত-পা বেরিয়েছিল। চুরি পরা হাত, শাড়ি ঢাকা পা। যেন কাগজটারই হাত-পা বেরিয়েছে। একটু পরে কাগজই যেন কথা বলে উঠল নারীকণ্ঠে, পড়েছ? আমি বললাম, পড়ব কখন? কাগজ বলল, কাগজ নিয়ে তোমার মাথাব্যথা নেই বলেই আমাকে পড়তে হয়।
জোর খবর আছে মনে হচ্ছে?
লোম খাড়া করা খবর।
যথা?
খুন।
রোজই হচ্ছে।
এ-খুন সে-খুন নয়।
তবে?
রহস্যজনক খুন।
কাগুজে ভাষা। জোলো হয়ে গেছে।
খুনি হয় বর্বর, নয় উন্মাদ।
খুন হয়েছে কে?
একটা মেয়ে।
সেক্স ম্যানিয়াক মনে হচ্ছে?
ও ইয়েস, মাই বর্বর স্বামী। তুমি কি শুনবে?
তোমার কৌতূহল যখন জাগ্রত হয়েছে–
এবং গা শিরশির করছে–
তখন শুনব বইকি। হতভাগিনীর বডি নিয়ে নিশ্চয় ছিনিমিনি খেলেছে সেক্স ম্যানিয়াক?
কাগজ নামিয়ে বড় বড় চোখে তাকাল কবিতা। লাল হয়ে উঠেছে ফরসা মুখ-চোখে গা রিরি করার আভাস। বললে সামান্য ভাঙা গলায়, কুৎসিতভাবে। বলতেও কষ্ট হচ্ছে। তুমি পড়ে নাও।
অবাক হলাম। ক্রাইমের গল্প আর খবর কবিতাকে চুম্বকের মতো টানে চিরকাল। বীভৎস খুন দেখেওছে। কিন্তু ঠিক এভাবে কখনও শিউরে উঠতে দেখিনি।
হাত বাড়িয়ে বললাম, দাও।
কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে কবিতা বলে, শুধু মেরে ফেললেই পারত। ওইভাবে–
কীভাবে?
বলতে পারব না। পড়ো।
সত্যিই তা বলা যায় না। কাগজ পড়বার পর বুঝলাম। বর্বর খুনি মেয়েটার…
অসম্ভব! লিখতে পারছি না। সাংবাদিক যা পারে, সাহিত্যিক তা পারে না। তাই সংবাদটা হুবহু তুলে দিচ্ছি।
.
বীভৎস হত্যা–কামিনী নিয়ে ছিনিমিনি
রঙ্গিলানগর। দুপুরের খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। অথচ সাড়া নেই নীল কপোত হোটেলের চার নম্বর ঘরে। প্রাণের স্পন্দন যেন মুছে গেছে ঘরের ভেতরে ঠিক এই রকমেরই মনে হয়েছিল যোড়শী পরিচারিকা কাত্যায়নীর–ঘর পরিষ্কার করা যার রোজকার কাজ। মেজাজ খিঁচড়ে গেছিল প্রথমে দুপুর গড়িয়ে গেলে রাগ হওয়া স্বাভাবিক। সব ঘরেই ঝটপাট চুকে গেছে বাকি শুধু এই চার নম্বর। মরে গেল নাকি ঘরের মানুষ দুটো? কড়া নেড়ে আর ধাক্কা মেরেও যখন কেউ সাড়া দেয়নি–তখন চাবির ফুটো দিয়ে উঁকি মেরেছিল যুগলবন্দি দৃশ্য দেখবার মতলবে। সারারাত দাপাদাপি করেছে নিশ্চয়–এখন ঘুমিয়ে মড়া হয়ে গেছে। ষোড়শী কাত্যায়নীর ঔৎসুক্য কিন্তু মেটেনি। বাদ সেধেছিল চার নম্বর ঘরের নিকষ অন্ধকার। দিনের বেলাতেও ঘরের মধ্যে এককণা আলো নেই। দিনকে রাত বানিয়ে রেখেছে মানুষ দুটো। বলিহারি যাই আদিম রিপুর তাড়নাকে।
ফের দুমদাম ঘুসি মেরেছিল কাত্যায়নী দরজার কপাটে। নিথর কক্ষে জাগ্রত হয়নি এতটুকু শব্দতরঙ্গ। নিস্তব্ধ ঘরে শুধু প্রতিধ্বনিত হয়েছে কপাট কাঁপার আওয়াজ–তার বেশি কিছু না।
কুম্ভকর্ণের ঘুমও যে হার মেনে যায়!
কাত্যায়নী তখন খবর দিয়েছে বৌদিমণিকে। উনিশখানা ঘরওলা নীল কপোত হোটেলের দেখাশুনো করতে হয় এই মহিলাকেই। নাম তার শ্রীমতী চারুবালা মৈত্র। সংক্ষেপে ম্যাডাম। ঝি চাকরদের কাছে বউদিমণি। কারণ, হোটেলের মালিক গগনচাঁদ মৈত্রর তিনি পুত্রবধূ।
কাত্যায়নীর ব্যাজার মুখ দেখেই দেওয়ালের কোয়ার্জ ঘড়ির দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করেছিলেন ম্যাডাম। দেখেছিলেন, কাঁটায়-কাঁটায় দুটো। কাত্যায়নীর রাগ কি অকারণে হয়েছে?
