তবে ভুরু কুঁচকে গেছিল ম্যাডামের। বঙ্কিম হয়েছিল ললাটরেখা। উনিশখানা ঘরে উনিশটা উপন্যাস রচিত হয়েছে প্রতিরাতে। অবশ্যই মিলনান্তক। বিয়োগান্তক কিছু ঘটে গেল নাকি?
তদন্ত প্রয়োজন–অবিলম্বে।
পাশ কী বের করেছিলেন ম্যাডাম। হোটেলে নিশা সমাপনের অভিলাষে যাঁরা কক্ষ দখল করেন, তাঁদের হাতে একখানা চাবি গছিয়ে দিয়ে বলে দেওয়া হয়–একটাই চাবি এই ঘরের, হারিয়ে ফেলবেন না যেন।
কিন্তু তা নয়। ডুপ্লিকেট চাবি থাকে হোটেল মালিকের কাছে। পাশ কী যার নাম। সঙ্কট মুহূর্ত ছাড়া যে চাবি অদৃশ্যই থাকে।
এখন দৃশ্যমান হল সেই চাবি। প্রবিষ্ট হল চাবির গর্তে। উন্মুক্ত হল কপাট।
কিন্তু ঘর যে কবরখানার মতোই নিস্তব্ধ। শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজও যে নেই!
চৌকাঠে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন ম্যাডাম। উৎকর্ণ হয়েও যখন সক্রিয় ফুসফুঁসের ক্রিয়াকলাপের কীর্তি কানে ধরা পড়েনিনয়নশক্তি তীক্ষ্ণতর করেও যখন নিশ্চিদ্র তমিস্রায় কিছুই অবলোকন করতে পারেননি তখন তিনি পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেছিলেন জানলার দিকে। টেনে সরিয়ে দিয়েছিলেন পরদা। ছিটকিনি খুলে দু-হাট করে দিয়েছিলেন বাতায়নের পাল্লা।
আলোর ভেসে গেছিল ঘর। সেই আলোর উদ্ভাসিত হয়েছিল লোমহর্ষক এক দৃশ্য।
দুশয্যার এই ঘরে পাশাপাশি লাগানো রয়েছে দুটো সিঙ্গল বেড। একটা খাটে শয়ান এক কৃষ্ণকেশী কৃষ্ণা। বিছানার চাদর আর কম্বল দিয়ে মোড়া তার গলা থেকে পা পর্যন্ত। বস্ত্রাবরণ
সরিয়েই বলা যায় শূন্য হয়েছে তার প্রাণপিঞ্জর। পাশের সিঙ্গল খাটের চাদরে অজস্র রক্তচিহ্ন বহন করছে সেই কাহিনি।
শিহরিত ম্যাডাম তৎক্ষণাৎ সচকিত করেছিলেন আরক্ষা বাহিনীকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাদের আবির্ভাব ঘটেছিল রুধিরলাঞ্ছিত চার নম্বর ঘরে। চাদর আর কম্বল তারাই অপসারণ করেছিলেন বিগতপ্রাণার হিমশীতল নশ্বর দেহ থেকে। দেখেছিলেন নিষ্করুণ এক দৃশ্য।
পৈশাচিকভাবে বিকৃত করা হয়েছে শরীরটাকে।
সে দৃশ্য বাস্তবিকই অবর্ণনীয়। সুস্থ চিন্তার অধিকারী কোনও পুরুষের পক্ষে কি কোনও নারীর অঙ্গহানি করা সম্ভব এইভাবে?
লেখনী মন্থর হলেও পাঠকদের জ্ঞাতার্থে লিখতেই হবে। জনগণ জানুক, আজ এই মুহূর্তে এক নররূপী পশু বিচরণ করছে এই শহরে…স্টোনম্যান-এর চাইতেও যে বিকট এবং বিকৃত যৌনানন্দের অভিলাষী…
কৃষ্ণা সুন্দরীর বক্ষদেশের পদ্মকোরক দুটি কামড়ে প্রায় কেটে ফেলা হয়েছে ঝুলছে চিবোনো চামড়ার ওপর।
বিবমিষা জাগ্রত হলেও এই সংবাদ যাঁরা পাঠ করছেন, তাঁদের কাছে একান্ত অনুরোধ আরও একটু ধৈর্য ধরুন। কসাই-খুনির কদাকার অন্তর-প্রকৃতি এখনও যে উদঘাটিত হয়নি।
নির্মমভাবে পেটানো হয়েছিল মেয়েটাকে। ভয়াল কামনা যখন প্রকৃতই নারকীয় হয়ে ওঠে তখনই বুঝি এইভাবে কোমলাঙ্গী নারীদেহকে চাবুক মেরে ক্ষতবিক্ষত করা যায়। মোট সতেরোটা রক্তজমা গভীর ক্ষতচিহ্নময়, লম্বা দাগ ভয়াবহরূপে মুখব্যাদান করে রয়েছে হতভাগিনীর মুখে, বুকে, পেটে ও পিঠে।
মোট সতেরোবার তাকে কষাঘাত করা হয়েছে। কখনও চিৎ করে, কখনও উপুড় করে।
সাধারণ চাবুক নয়, অসাধারণ চাবুকের প্রহারে শক্তিমান উচ্চৈঃশ্রবাও উন্মাদ হয়ে গিয়ে নিশ্চয় মৃত্যুবরণ করত। নরম মেয়েটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে গুনে-গুনে সতেরোবার সেই চাবুক হাঁকড়েছে বর্বর খুনি চোখের পাতা না কাঁপিয়ে এবং চাপা অট্টহাসিতে ঘর মুখর করে।
নরদানব অবশ্যই।
চাবুকটা? ছ-ইঞ্চি অন্তর লোহার কাঁটা বল লাগানো। মোট ছটা কন্টকময় লৌহগোলক। বাদশাহী আমলেও এরকম নির্যাতন বোধহয় কল্পনাতেও আনতে পারেনি কেউ। এক-একবারের কষাঘাতে ছটা কাটাবল একই সাথে, ছটি করে কূপ রচনা করে গেছে মাংস ভেদ করে, অস্থি পিঞ্জর চূর্ণ করে দিয়ে। ললাট ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছে। নাক ভেঙে হেলে পড়েছে, মেরুদণ্ডের কশেরুকা আস্ত থাকেনি।
পাশের খাটে রক্ত থইথই করেছিল কেন? এখন তা জমে শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে বটে– কিন্তু অত রক্ত অবশ্যই অভাগিনীর শরীর থেকে অবিরল ধারায় ঝরানো হয়েছিল ওই খাটে– কণ্টকাকীর্ণ লৌহবর্তুলের মুহুর্মুহুঃ প্রহারে–তারপর দেহটাকে টেনে এনে ফেলা হয়েছে এই খাটে– চাদর আর কম্বল দিয়ে সযত্নে মুড়ে রেখেছে বিকট চাবুকের মালিক।
বালিশের ওপর তখন রাখা হয়েছিল চাবুকটা। রক্তমাখা চাবুকের দাগ জেগে রয়েছে শুভ্র ওয়াড়ে।
কদর্যতম বিকৃতির কাহিনি লিখতে কলম সরতে চাইছে না, কিন্তু তা লিখতেই হবে। নইলে যে জনসাধারণ জানতেই পারবেন না, কতবড় নরাধম বিচরণ করছে এই মুহূর্তে আমাদের আশেপাশে –পরবর্তী নারীশিকারের প্রতীক্ষায়।..কদর্যতম বিকৃতিটা এই : ঘরের খিল উপড়ে এনে ঘাতক তা দিয়ে তলপেটে আঘাত করেছে। তখন সে দুই গোড়ালি বেঁধে রেখেছিল বড় রুমাল দিয়ে।
কিন্তু হতভাগিনীকে কি জ্যান্তই পিটিয়ে গেছিল নরদানবটা তার যন্ত্রণা তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করার জন্যে? ভয়াল চাবুকের এক ঘা-ই যথেষ্ট প্রাণপাখিটাকে উড়িয়ে দেবার পক্ষে বাকি ষোলটা কশাঘাত কি টের পেয়েছিল কালো সুন্দরী?
এ প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারেননি মর্গের পোস্টমর্টেম করার প্যাথলজিস্ট। তিনি শুধু বলেছিলেন, মেয়েটা মারা গেছে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার দরুন। হয়তো মুখের মধ্যে ন্যাকড়া ঠুসে দিয়ে ফুসফুঁসে বাতাস যাতায়াতের পথ রোধ করে দেওয়া হয়েছিল–অথবা, বালিশ চেপে ধরা হয়েছিল মুখে।
