ফিন্যান্স ডিরেক্টর একটি অমায়িক পশু বিশেষ। তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন পাশের কামরায়। জামাই আদরে একটা দামি সোফায় বসালেন। হুইস্কি রেডি ছিল। অফার করলেন। আমি সেদিকে না তাকিয়ে বললাম, কী বলতে চান, বলে নিন।
উনি জবাব না দিয়ে মস্ত টেবিল প্রদক্ষিণ করে পিঠ-উঁচু চেয়ারে বসলেন। তখন আমার খেয়াল হল, আমাকে ডেকে এনেছেন নিজের চেম্বারে। ড্রয়ার টেনে ডানহাতে কী যেন নাড়াচাড়া করতে করতে আমার দিকে হাসি-হাসি মুখে চেয়ে রইলেন। এসব লোকেরা হাসিমুখেই খুন করে। তাই আমি সতর্ক হলাম।
উনি বললেন, চিফ সেক্রেটারির সঙ্গে এভাবে কথা বলতে আপনার ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যানও সাহস পায় না।
আমি চেয়ারম্যান নই, বললাম আমি।
আপনি একটু বুঝেসুঝে কথা বলুন।
কী বলতে চান, প্রাঞ্জল করুন।
এভাবে, এইসব কথা না বললেই ভালো করতেন। এবার দেখলাম ফিন্যান্স ডিরেক্টর তোতলাচ্ছেন।
আমি চালিয়ে গেলাম, আমি নিরুপায়। আপনার কোম্পানির অফিসার আমি নই। কাজেই আপনার চিফ সেক্রেটারির মন জুগিয়ে কথা বলার দরকার আমার নেই।
মিঃ ঘোষ–
কেন উনি আমাকে আপনার সঙ্গে কথা বলতে পাঠালেন, সেটা বলুন। যদি কিছু বলার না থাকে, এখানে সময় নষ্ট করার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।
আপনার যা প্রশ্ন সেটা আমাকে করুন।
প্রশ্ন তো একটাই ও আপনার কোম্পানির অ্যাকাউন্ট ঠিক আছে কি?
ফিন্যান্স ডিরেক্টর জবাব না দিয়ে ড্রয়ারটার দিকে চাইলেন। ডানহাতে যা নাড়াচাড়া করছিলেন, এবার তা বের করে এনে টেবিলের ওপর রাখলেন। একতাড়া নোট।
পাঁচশো টাকার একশোটা নোট। নতুন নোট। নগদ পঞ্চাশ হাজার।
উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, চলুন, আপনার কথা শোনা হয়ে গেছে।
অমায়িক পশু বিশেষের মতোই ফিন্যান্স ডিরেক্টর আমাকে নিয়ে মিটিং রুমে ফিরে এলেন। চিফ সেক্রেটারিকে বললেন, স্যার, ইনি শুধু জানতে চাইছেন, আমাদের কোম্পানি অ্যাকাউন্ট ঠিক আছে কিনা।
চিফ সেক্রেটারি চোখের পাতা না ফেলে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন ফিন্যান্স ডিরেক্টরের দিকে। কথা হয়ে গেল চোখে-চোখে, তাকালেন ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের দিকে।
বললেন, তাহলে তো আপনাদের সঙ্গে একটা সিটিং দিতে হয়।
জেনারেল ম্যানেজারের জবাব যেন তৈরি ছিল। সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, তাহলে এখন যাই। ব্যাঙ্কের মিটিং ডাকছি–আপনারাও আসুন সেখানে।
মিটিং কিন্তু আজও ডাকা হয়নি। যে তথ্য জানতে চেয়েছিলাম, আজও তা ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ জানতে পারেনি। জানতে চায়ও না। জানলে তো আর পাঁচতারার ঘরে-ঘরে মধুযামিনী করা চলবে না।
শুধু বদলি করা হয়েছে আমাকে।
তার আগে অবশ্য জেনারেল ম্যানেজার তলব করেছিলেন আমাকে তার চেম্বারে।
বলেছিলেন রুষ্ট গলায়, তোমার এসব খোঁজখবরে দরকার কী, ঘোষ?
আপনি বলছেন, দরকার নেই? বলেছিলাম বেঁকা সুরে, ভবিষ্যতে তাহলে আর কৈফিয়ৎ চাইবেন না কোনও কাজে গাফিলতির জন্যে।
ঘোষ–
আগে কথা দিন, কৈফিয়ৎ চেয়ে বিরক্ত করবেন না—
ওভাবে ব্যাপারটা নিচ্ছ কেন?
তাহলে কীভাবে নেব?
এরা তো খুব বড় কোম্পানি। এদের ব্যাপারে একটু রয়েসয়ে চারদিক ওজন করে কথা বলা দরকার।
মানতে পারলাম না স্যার, আমার কাছে সব অ্যাকাউন্ট হোল্ডারই সমান–কার বড় কোম্পানি, কার ছোট কোম্পানি–এ বিচার করি না ক্লায়েন্ট হ্যান্ডল করার সময়ে। সবাই খদ্দের, সবাই লক্ষ্মী।
তা তো বুঝলাম–
না স্যার, আপনি বোঝেননি। বুঝলে এই উপদেশ আমাকে দিতে আসতেন না। এই কোম্পানি আপনার আমার পেটের ভাত মেরে দিচ্ছে–চাকরির সুযোগ কেড়ে নিচ্ছে। এদের কাছ থেকে কে কত পেয়েছে জানি না আমি তো কিছু পাইনি।
দুম করে রেগে গেলেন জেনারেল ম্যানেজার। ভদ্রলোক এমনিতেই খুব কম কথা বলেন। যমের মতো সবাই ভয় পায়। আমি কিন্তু মরার ভয় কাটিয়ে উঠেছিলাম বলে যা-যা বলবার, কটাকট বলে যাচ্ছিলাম। রাগ তো হবেই।
কড়া গলায় বললেন, কী বলতে চাইছ?
রেগে গেলে তো চলবে না। যা ঘটবার ঘটে গেছে কজনের চাকরি খাবেন, তাই ভাবুন। তার বাইরেও বড় ভাবনা হয়তো আপনার মাথায় ঘুরছে–আপনার নিজের চাকরিটাই না যায়, কারণ একটাই : এই যে টাকা তোলার হুলিয়া–এতে তো সই দিয়েছেন আপনি। এই হুলিয়ার ফলেই তো পাঁচতারা কোম্পানি গড়পরতা দশ লাখ টাকারও কম রেখে আজ পর্যন্ত ব্যাঙ্ক থেকে প্রায় পঁচিশ কোটি টাকা তুলিয়ে দিয়েছে। আপনার দায়িত্ব আপনি অস্বীকার করতে পারেন, আমি যে ভাউচার লিখেছি সেটা ঘুরিয়ে দিয়ে আপনি লিখতে পারেন? পারলে লিখুন না।
যাও, যাও, পরে ডাকছি।
আমি কিন্তু যাইনি। জবাব না দিয়ে উঠব না ভান করেছিলাম। চোখ রাঙানিতেও ওষুধ ধরল না দেখে হাঁকডাক করে পারসোন্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টকে ডেকেছিলেন জেনারেল ম্যানেজার, এটা করো ওটা করো–আবোলতাবোল হুকুম ছেড়ে গেছিলেন। বেশ বুঝলাম, বিলক্ষণ ঘাবড়ে গেছেন– সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।
আমি তখন উঠে চলে এসেছিলাম। আসবার সময়ে বলে এসেছিলাম, পরে ডাকবেন স্যার।
স্যার আর ডাকেননি শুধু বদলির হুকুম জারি করেছিলেন। তারপর থেকেই আমি হুশিয়ার হয়েছি। রমাপতির কপালে কী ঘটেছিল, তা ভুলিনি। বর্ধমানে আমি একা থাকি পৈতৃক ভিটেতে। কেউ তো নেই। পাড়ার ছেলেদের দিয়ে খবর নিয়ে জানলাম বাড়ির ওপর কেউ বা কারা নজর রাখছে।
বুঝলাম। রাতেই সাবাড় করার মতলব। একবার খতম হয়ে গেলে কে আর দেখছে।
