কিন্তু ক্ষতি হয়ে গেল পাঁচতারা আর টপমোস্ট ম্যানেজমেন্টের। দশ লাখ কি কম কথা। কত বখরা থাকত ম্যানেজমেন্টের?
ফলে, মিটিং-এর পর মিটিং হয়ে গেল আমাকে নিয়ে আমাকে ঠান্ডা করার জন্যে নরমে গরমে কতভাবেই না বোঝানো হল আমাকে আর বেড়ো না–যা হচ্ছে তোক।
কিন্তু তাই কি হয়! কতরকম টোপ যে পড়েছিল আমাকে কজায় আনার জন্যে–তা বললে মাধুরী হয়তো মূৰ্ছা যাবে। কতরকম ঘেরাটোপ যে রচনা হয়েছিল আমার হাত-পা বেঁধে ঠুটো বানিয়ে রাখার জন্যে–তার বিশদ বর্ণনাও আর দিতে চাই না।
আমি শুধু চালিয়ে গেলাম। কে তখন রোখে আমায়। উচ্চিংড়ের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে যেখানে ফাঁক পেলাম, সেখানেই প্যাঁচ কষে গেলাম। কুকাজ ফঁস করে দিলাম। যা কিছু পাওনা, আদায় করে গেলাম।
ফল হল ভয়ানক।
আমাকে বদলি করে দেওয়া হল।
পাঁচতারাকে প্যাঁচ কষবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হল। তাতে কিন্তু ব্যাঙ্কের ক্ষতিই হল। কিন্তু তাতে কার কী এসে যায়? ওই ব্রাঞ্চে যদি আরও দশ থেকে পনেরো বছর আমি থাকতাম, ব্যাঙ্কের মুনাফা বা লভ্যাংশ হিসেবে কম করেও ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা ব্যাঙ্ককে হাতেকলমে পাইয়ে দিতামকাগুঁজে হিসেব নয়কড়কড়ে টাকায়। ভাবতে পারেন? একটা ব্যাঙ্কের একটা শাখায় একজন মাত্র অফিসার যদি এই লভ্যাংশ এনে দিতে পারে, তাহলে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত কনজার্ভেটিভ হিসেবে শতকরা দশটা শাখায় এই পরিমাণ লাভ এলে প্রতি বছরে আমাদের দেশের একটা করে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা কার্যকর করা যায়। চরম অসংযমী ন্যায় নীতিহীন মুনাফাখোরদের হাতে পড়ে আপামর জনসাধারণের ভোগান্তি কোন পর্যায় পৌঁছেছে, তাও কি ব্যাখ্যা করে দিতে হবে?
না। কক্ষনও না। আজও গায়ের রক্ত টগবগিয়ে ওঠে সেই নাটকীয় মিটিং-এর কথা মনে পড়লেই। ২৪ কোটি ৯৮ লক্ষ টাকার ভাউচার নিয়ে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল আমাকে। ভাউচার লিখেছিলাম আমি–সই করেছিলাম আমি। পাঁচতারার ওপরতলায় বসেছিল জরুরি অধিবেশন। মিটিং তো নয়–কাঠগড়া। সেখানে হাজির হয়েছিলেন পাঁচতারার চিফ সেক্রেটারি, ফিন্যান্স ডিরেক্টর, জয়েন্ট সেক্রেটারি, কমপিউটার অপারেশন-এর ডিরেক্টর আর ডিলিং অফিসার।
ব্যাঙ্কের তরফ থেকে হাজির হয়েছিলেন জেনারেল ম্যানেজার, একজন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, তিনজন অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার, একজন ডেপুটি ম্যানেজার আর এই পাতি অফিসার।
কত গুরুত্বপূর্ণ সেই মিটিং আন্দাজ করতে পারছেন? পাপচক্রের অংশীদার কারা, তা কি আর খুলে বলার দরকার আছে? ব্যাঙ্কের লাভকে এঁরাই এতদিন ভাগ করে নিয়েছেন–আমি বাগড়া দিয়েছি বলে আমাকে কাঠগড়ায় তুলেছেন।
রমাপতি মরেছে, আমিও না হয় মরব, কিন্তু মেরে মরব।
চিফ সেক্রেটারি ভদ্রলোককে এমনিতেই একটা ভদ্র বাঘ বললেই চলে। না…না..ভদ্র সিংহ। সিংহের মতোই তো কেশর, আলমগিরের মতো দাড়ি। চোখ দুটোয় সুমেরুকুমেরুর জমাট বরফ।
কনকনে চোখে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে স্রেফ তুলোধোনা করে গেলেন চোস্ত ইংরেজিতে। ভাগ্যিস ভাষাটায় দখল ছিল। তাই রক্ষে। ভদ্র সিংহ আমার চেহারা দেখে বোধহয় ভেবেছিলেন–কিংস ইংলিশ শুনলেই নিশ্চয় প্যান্ট নষ্ট করে ফেলব।
ধোপা, নাপিত, কুলি, মজুরকেও এভাবে আমরা গালাগাল দিই না।
আমি চুপ করে রইলাম।
ব্যাঙ্কের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার আমাকে একটু স্নেহ করতেন। আমার হাড়মজ্জার খবর রাখতেন। কিন্তু আমি যে রঞ্জনরশ্মি হয়ে গিয়ে তাঁদেরও হাড়মজ্জার খবর রাখতে শুরু করেছিলাম, তা জানতেন না।
এই ভদ্রলোকই আমার হেনস্থা দেখে নরম গলায় আমার সেন্স অফ ডিউটি সম্বন্ধে দু-চারটে ভালো-ভালো কথা সেদিন বলেছিলেন।
ভদ্র সিংহ কনকনে চোখে তাকিয়েই রইলেন আমার দিকে। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, কুমুদরঞ্জন ঘোষ!
সবিনয়ে আমি বললাম, আজ্ঞে হ্যাঁ, অধীনের নাম কুমুদরঞ্জন ঘোষ। ওরফে কে আর ঘোষ। সংক্ষেপে রঞ্জন ঘোষ। আরও একটা নাম আছে আমার। রঞ্জনরশ্মি ঘোষ।
হোয়াট?
মানে, এক্স-রে ঘোষ। আপনার কোম্পানির ভেতর পর্যন্ত দেখে ফেলেছি তো।
ইউ পেটি অফিসার।
ও ইয়েস, আই অ্যাম এ ভেরি-ভেরি পেটি অফিসার। কিন্তু আপনার কোম্পানির সব অফিসার ঠিক আছে তো?
অ্যাকাউন্ট কীভাবে রাখতে হয়, শিখে নিন আমার কাছ থেকে।
আপনার কাছ থেকে? সরি, স্যার। আপনার কোম্পানির অ্যাকাউন্ট শিখে আমার কী লাভ?
ইউর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট—
সেটাও আপনার কাছ থেকে শিখব না।
ইউ ব্লাইটার।
ল্যাঙ্গুয়েজ প্লিজ। আপনার কোম্পানি-অ্যাকাউন্ট ঠিক আছে তো?
মানে?
যে টাকা রেখে যে টাকা তোলার কথা–তা কি হচ্ছে?
হু দ্য হেল ইউ আর টু কোশ্চন মি?
কত টাকা ব্যাঙ্কে রেখে, কত টাকার চেক ছেড়েছেন বা কত টাকা তুলিয়ে নিয়েছেন– তা তো আপনাকে জানাতে হবে–এখুনি।
আপনার সাহস তো কম নয়। আপনার ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যানও আমাদের Credential নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। আপনার কি অথরিটি আছে?
আছে, আছে। তাছাড়া, এটা তো আপনার কোম্পানির Credential-এর প্রশ্ন নয় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের প্রশ্ন। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রিকনসাইল করতে গেলে এ প্রশ্নের সদুত্তর তো চাই।
সবেগে মাথা ঘুরিয়ে ফিন্যান্স ডিরেক্টরের দিকে তাকালেন ভদ্র সিংহ। বললেন, এর সঙ্গে আপনি কথা বলুন।
