কৌতূহলের শুরু তখন থেকেই।
তখন আমি ধাপে-ধাপে এগোতে লাগলাম। ছাত্রজীবনে সংগঠন করেছি, আন্দোলন চালিয়েছি, অন্যায়ের প্রতিকার করেছি। কিন্তু হঠকারিতা কখনও করিনি। এটাই আমার ছাত্র জীবনের শিক্ষা।
প্রথম ধাপেই ওয়াকিবহাল করলাম ওপরওলাদের। তাদের জানিয়ে দিলাম, কী ধরনের বেআইনি কাণ্ড চলছে আমার নাকের ডগায়। যে রিকুইজিট ফান্ড জমা দেওয়ার কথা–এই পাঁচতারা হোটেলটি তা না দিয়ে বাজার থেকে কোটি-কোটি টাকা তুলিয়ে নিচ্ছে।
রমাপতির কপালে যা ঘটেছিল, আমার কপালে ঘটল ঠিক তাই। ধমক আর শাস্তির হুমকি।
আমি যে ভুল সন্দেহ করিনি, এই হল তার প্রমাণ। চক্রান্ত একটা রয়েছে। হাতে হাত মিলিয়ে রয়েছে ব্যাঙ্কের উধ্বর্তম ম্যানেজমেন্ট আর পাঁচতারা হোটেল। নিচুতলার ম্যানেজাররা নাক গলালেই নাক উড়ে যাবে। যেমন গেছে রমাপতির।
আমি তখন অপারেশন শুরু করলাম সম্পূর্ণ নিজের ঝুঁকিতে কারও সাহায্য না নিয়ে চাকরির পরোয়া না রেখে। একেবারে নিজের মনগড়া নিয়মে।
ব্যাঙ্ক-নিয়ম অনুযায়ী পাঁচতারা হোটেল কোম্পানির উচিত, বাজারে চলতি ইসুগুলোর যোগফল-টাকা ব্যাঙ্কে জমা দেওয়া।
কিন্তু তা তারা করছে না। ডেলিডেবিটেড টাকার চাইতে মাত্র দশ-বিশ হাজার টাকার বেশি করে জমা দিচ্ছে।
আমি ঠিক করলাম, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাব পাঁচতারার প্যাঁচ।
কোম্পানির গড়পরতা যত সংখ্যক চেক ডেবিট হত, তা করে, নামমাত্র দু-একটা চেক ডেবিট করে, বাকি চেকের আলাদাভাবে হিসেব তৈরি করে রেগুলার যোগ দিয়ে রাখতে শুরু করলাম।
এ হিসেব গোপনে রাখলাম নিজের কাছে।
ফলে, পাঁচতারা কোম্পানি সন্দেহও করতে পারল না, কত টাকার সত্যিকার চেক ব্যাঙ্কে জমা হয়ে গেছে। শুধু জানল, অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট ব্যালান্স রয়েছে। অডিটিং-এর নিয়ম অনুসারে তাই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। পাঁচতারার অফিসার নিয়মিত পজিশন দেখে খুশি হয়ে চলে যায়– জানতেও পারে না আসল পজিশনটা।
সে হিসেব তো আমার কাছে।
এইভাবে একটু-একটু করে পাঁচতারাকে টেনে নিলাম আমার পাতা ফাঁদে।
তারপর গেলাম দ্বিতীয় ধাপে।
তিন-চারদিনের টানা ছুটি ব্যাঙ্কে প্রায়ই থাকে। তক্কেতক্কে রইলাম এইরকম একটা ছুটির। ছুটির ঠিক আগের দিন দুম করে একদিনেই ২৪ কোটি ৯৮ লক্ষ টাকা ডেবিট করে দিলাম।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষদের তোষামোদ করার লোকের অভাব নেই কোনও ব্যাঙ্কেই। অভাব ছিল না আমার ব্রাঞ্চেও। ঝড়ের বেগে খবর চলে গেল সেখানে।
চাপ এসে গেল সঙ্গে-সঙ্গে। কাজটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। যা করছ, কোম্পানিকে জানিয়ে করো।
আমার বয়ে গেছে জানাতে, ছুটি তো পড়ে গেছে। এই কদিন ব্যাঙ্ক বন্ধ। ২৪ কোটি ৯৮ লক্ষ জমা দেওয়ার সুযোগ তো পাচ্ছে না পাঁচতারা কোম্পানি।
এ টাকা খাতাকলমে ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিলে ব্যাঙ্ককে দিতে হত বেশি করেও শতকরা ২৫ সুদ। কিন্তু কলমানি মার্কেটে খাঁটিয়ে পাঁচতারা কোম্পানি লুটে নিচ্ছে শতকরা ৩০ থেকে ৫০ সুদ।
কর্তৃপক্ষ তা জানে। জেনেশুনেও পাঁচতারাকে দিয়ে যাচ্ছে টাকা। রমাপতি বলতে গেছিল, তাকে লিখে জানিয়েছিল বকেয়া টাকার জন্যে কোনও সুদ নিতে পারবে না। কেন?
আরে, ওই পরিমাণ টাকা তো ওরা অন্য জায়গায় রেখেছে। তোমার বাগড়া দেওয়ার কী দরকার।
বোকা রমাপতি তা সত্ত্বেও বাগড়া দিতে গিয়ে মরেই গেল।
আমি কিন্তু মরলাম না–যদিও যে-কোনওদিন বডি পড়তে পারে। মাধুরী ভয় পাবে বলেই এতদিন এসব বলিনি। কিন্তু কঁহাতক আর সহ্য করা যায়? আমরা যারা খেটে খাই, সভাবে খেয়ে পরে বাঁচতে চাই আমরা চাকরি পাচ্ছি না কিন্তু কালো টাকার মালিকরা ব্যাঙ্কের টপমোস্ট ম্যানেজমেন্টদের নিয়ে ফুর্তির ফোয়ারা ছুটিয়ে যাচ্ছে পাঁচতারার ঘরে-ঘরে। কত মধ্যবিত্তের মেয়ে কৌমার্য বলি দিচ্ছে সেখানে কেউ তার খবরও রাখে না। যে পাপাচার কল্পনাতেও জানা যায় না–তাই চলছে অবাধে কারণ সর্ষের মধ্যেই ঢুকে রয়েছে ভূত। রক্ষক যে, সেই হয়েছে ভক্ষক। পাবলিক তা জানবে কী করে?
ভাগ্যিস আমি ব্যাঙ্ক ম্যানেজার হয়েছিলাম। তাইতো জানতে পারলাম। জানতে যখন পেরেছি, বিহিত না করলে আমি কি মানুষ পদবাচ্য?
যাক, যা বলছিলাম, ছুটির ঠিক আগের দিন আমার ওই কীর্তির ফলে পাঁচতারা কোম্পানির বেআইনি দাদন লেখা হয়ে গেল ২৪ কোটি ৯৮ লক্ষ টাকা। ব্যাঙ্কের ভাষায় যাকে বলে, Clean Advance–সিকিউরিটি ছাড়াই।
আনন্দে ডগমগ হয়ে আমি চলে গেলাম ছুটিতে। রমাপতির আত্মা বোধহয় সেদিন কিছুটা শান্তি পেয়েছিল।
ছুটি কাটিয়ে ফিরে এসে শুনলাম, ব্যাঙ্কের শিরায়-উপশিরায় রটে গেছে সেই খবর। কুমুদরঞ্জন ঘোষ ঘায়েল করেছে পাঁচতারাকে। পালটা প্যাঁচে ধরাশায়ী কোম্পানি পাগলের মতো ধর্না দিয়েছে টপমোস্ট ম্যানেজমেন্টের কাছে।
মুখরক্ষা করার জন্যে ম্যানেজমেন্ট চিঠি দিয়েছে পাঁচতারাকে–কিন্তু তুলোধোনা করছে বেঁড়ে ব্যাটাদের নিয়ে। পাচ্ছে না কেবল এই পাতি অফিসারকে।
অনেক চিঠির ঝড় বয়ে গেল দুই তরফে। পাতি অফিসারের সুবাদে প্রায় দশ লক্ষ টাকারও বেশি সুদ আদায় পেয়ে গেল ব্যাঙ্ক।
লাভ হল ব্যাঙ্কের।
আমার লাভও হল না, ক্ষতিও হল না। মাইনে তো পেলাম। মাইনে পাওয়ার কর্তব্য করে গেলাম–যা আর কেউ করতে সাহস পায় না।
