খোলা দরজা দিয়ে ঢুকছে এক তালপাতার সেপাই।
ঢলঢলে শার্ট, প্যান্ট আর কালো গাত্রবর্ণ দেখলেই বোঝা হয়ে গেল, সে কে।
কুমুদরঞ্জন ঘোষ।
পেছন-পেছন এল যে মেয়েটি, তাকেও চিনতে দেরি হল না! এরকম সুবেশা কিন্তু সুরূপা নয় একজনই হতে পারে। পাঁচতলা হোটেলের সেই রহস্যময়ী।
খুব আওয়াজ করে নস্যি নিয়ে ইন্দ্রনাথ বলেছিল, ব্যস, এবার শুরু হোক শেষ অঙ্ক। মাধুরী ঘোষদস্তিদার, ওরকম কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে পেশি টেনে ধরবে–তখন ওই কুমুদরঞ্জন ঘোষকে দিয়েই পা টেপাতে হবে। যেখান থেকে দাঁড়িয়েছেন, ওখানেই টুপ করে বসে পড়ুন। শ্ৰীযুক্ত কুমুদরঞ্জন ঘোষ, আপনার রঞ্জনরশ্মির আশ্চর্য কাহিনি শুনব সব শেষে। বসুন, বসুন, মাধুরীর পাশে বসুন। ফাইন। এইবার শেফালিকা নন্দী। আপনিই যত নষ্টের গোড়া। আপনার কাহিনি শুরু হোক সবার আগে। স্টার্ট।
.
শেফালিকা
নন্দী টাইটেলটা এখনও নিয়ে রেখেছি, রাখবও চিরকাল। কিন্তু ছাদনাতলায় দাঁড়িয়ে যে লোকটা আমার পদবী আর গোত্র পালটে দিয়ে গেল, সে যদি থাকত, আমার মতো সুখী মানুষ দুনিয়ায় আর কেউ থাকত না।
জন্মেছিলাম শেফালিকা দত্ত হয়ে। অনেক আশা আর আনন্দ নিয়ে বিয়ে করেছিলাম ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে। কুবেরদের বাজারদর অনেক।
রমাপতি নিজেও তো ছিল ছোটখাট এক কুবের। নন্দী পদবী শুনেই বুঝছেন? সুবর্ণবণিক সম্প্রদায়ের চাপা টাকার খবর অনেকেই রাখে না। কলকাতায় এখনও কত প্রপার্টি ধরে রেখে দিয়েছে, তাও ঢাক পিটিয়ে কাউকে জানায় না।
কুবেরের বিষয়-আশয় পেয়েই বোধহয় এত নির্লোভ আর এত নীতিবাগীশ ছিল রমাপতি। সোনার খাটে গা আর রূপোর খাটে পা দিয়ে যে লোকটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারত–সে এসেছিল লাইনে–খেটে রোজগার করতে। বলত বাপঠাকুরদা বাগানবাড়ি বানিয়ে আর মেয়েছেলে রেখে যত পাপ করেছে, তার প্রায়শ্চিত্ত করছি।
সেইটুকু করলেই তো হত। কেন ও দৌড়ল কালো টাকা লুটেরাদের পেছনে। কেন তাদের মুখোশ খসানোর জন্যে কোমর বেঁধে লাগতে গেল। কুচক্রের অচলায়তন ভাঙার ক্ষমতা ওর ছিল না–টলানো তো দূরের কথা।
কিন্তু পায়ের তলায় যারা ঘাস গজাতে দেয় না তারা পায়ের তলায় কাঁটার খোঁচা কখনও সয়?
তাই একদিন কসবার খোলা হাইড্রেনের মধ্যে একটা লাশ পাওয়া গেল।
শেষ হয়ে গেল রমাপতি নন্দী। শেষ হয়ে গেল পুলিশি তদন্ত। অপরাধী রয়ে গেল অন্ধকারে।
আর রইল আমার বৈধব্য। থাকবে সারাজীবন।
সেই সময়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াল এক আদর্শ মানুষ। এই কুমুদরঞ্জন ঘোষ।
আমাকে বললে,–আমি সব জানি। সন্দেহ আমারও হয়েছে। আমি কিন্তু সাবধানে এগোচ্ছি। এই কুচক্র আমি ভাঙব, রমাপতির অপঘাত মৃত্যুর বদলা নেব, দেশের জন্যে একটা অদ্ভুত ভালো কাজ করে যাব–তাতে আমারও মৃত্যু হয় তোক।
.
রঞ্জন
হ্যাঁ, একথা আমি বলেছিলাম শেফালিকাকে। আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম বদলা আমি নেবই।
সেইদিন থেকে কুমুদরঞ্জন ঘোষ হয়ে গেছিল রঞ্জনরশ্মি ঘোষ। মাধুরীকে এর বেশি আর বলিনি। বিয়েটা শুধু আটকে রেখেছিলাম। বিধবা থাকার চেয়ে আইবুড়ো থাকা অনেক ভালো।
দেশসুদ্ধ লোক এখন জেনে গেছে স্ক্যাম নামে শব্দটা। তিন হাজার কোটি টাকা উধাও হওয়ার চাঞ্চল্যকর অপব্যবস্থা। Scam শব্দটা কিন্তু ব্রিটিশ ডিক্সনারিতে খুঁজে পাবেন না। এটা একটা আমেরিকান স্ল্যাং। নিশ্চয় সেদেশেও এইরকম ব্যাঙ্ক কেলেঙ্কারি হয়।
দেশজুড়ে এই হইচই পড়ার অনেক আগে থেকেই টাকা সরে যাচ্ছিল ব্যাঙ্ক থেকে। কোটি কোটি টাকা। চোখের সামনে দিয়ে টাকার এই রকম উড়ে যাওয়া দেখার পর মানুষের মতো মানুষরা চুপ করে বসে থাকতে পারে না। রমাপতিও পারেনি। ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু ধমক খেয়েছিল। শাস্তির হুমকি শুনেছিল। বেপরোয়া রমাপতি তখন একা এগিয়ে গেছিল। তাই ওর লাশ পড়েছিল। যেখানে কোটি-কোটি টাকার খেলা চলে, সেখানে দু-দশ হাজারেই একটা মানুষ খুন করিয়ে দেওয়া যায়, নিখুঁতভাবে কোথাও কোনও সূত্র না রেখে। রমাপতি কিন্তু একটু সূত্র রেখে গেছিল আমার কাছে, মরার আগে। অন্য ম্যানেজারদের সঙ্গে ওর তেমন দহরম-মহরম ছিল না। আমার সঙ্গে ওর মনের মিল ছিল অনেকগুলো বোকামির জন্য। আমরা সৎ, আমরা ঘুষ নিই না, আমরা মুখ বুজে অন্যায় বরদাস্ত করি না। অতএব আমরা মূর্খ।
টাকা জমা রেখে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলিয়ে দেওয়ার বা তুলিয়ে নেওয়ার অনেকগুলো অপব্যবস্থা আছে। এদের নাম ও রিফান্ড অর্ডার, ডিবেঞ্চার ইন্টারেস্ট, ডিভিডেন্ড ওয়ারেন্ট, ইন্টারেস্ট ওয়ারেন্ট, কমিশন ওয়ারেন্ট ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় আরও অনেক পেমেন্ট।
এজন্যে ডেসিগনেটেড অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। এগ্রিমেন্ট করতে হয় ওয়ারেন্ট ইস্যু করার আগে। তারপর টাকা জমা দিতে হয়। তখন ব্যাঙ্ক হেড অফিস সার্কুলার ইসু করে দেয়। কোম্পানি তখন ওয়ারেন্ট বা পোস্ট-ডেটেড ওয়ারেন্ট বাজারে ছেড়ে দেয়। সার্কুলার অনুযায়ী ব্যাঙ্ক ম্যানেজাররা টাকা দিয়ে যেতে থাকে।
আমার প্রথম সন্দেহ দেখা দেয় একটা পাঁচতারা হোটেলের অ্যাকাউন্ট নিয়ে। নামটা বলব না। অফিসিয়াল সিক্রেসি।
প্রথমেই যে টাকা জমা দেওয়া উচিত, এই হোটেল কোম্পানি তা না জমা দিয়ে অর্ডিনারি অ্যাকাউন্টের মতোই আস্তে-আস্তে টাকা জমা দিয়ে যাচ্ছিল। অপরেটিং ব্রাঞ্চের ম্যানেজার আমি। কিছু নিয়ম আমাকে মেনে চলতে হয়। আর তখনি আমার সন্দেহ হয় এত কম টাকা জমা পড়ছে। কেন?
