মাধুরী বললে, এইমাত্র যিনি এলেন ওঁর সঙ্গে একটু দেখা করে যাব!
কাঞ্চনবাবু? যান, ওপরে চলে যান, দোতলায় বাঁদিকের বারান্দার শেষের ঘর–তিন নম্বর…তিন নম্বর!
যেন ভূতের রাজা বর দিচ্ছে, এমনিভাবে তিন নম্বর তিন নম্বর শব্দদুটো আউড়ে গেছিল বুড়ো। হাসি চেপে সামনের চটাওঠা কানাভাঙা সিমেন্টের সিঁড়ি বেয়ে দোতলার তিন নম্বর ঘরের সামনে গিয়ে মাধুরী দেখেছিল, দরজায় তালা ঝুলছে।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আকাশপাতাল ভেবেছিল মাধুরী। রঞ্জন তাহলে এখানে কাজে আসেনি, তিন নম্বর ঘরে এসেছে। কেন? কেন সে কাঞ্চন নামে পরিচিত?
নিচে নেমে এসে বুড়োকে জিগ্যেস করেছিল, কই, দেখলাম না তো। দরজায় তালা ঝুলছে।
তাহলে বেরিয়েছে। আশ্চর্য লোক, মা। ঠিক এই সময়ে রোজ আসে, পেছনের সিঁড়ি বেয়ে বেরিয়ে যায়। কিছু বলতে হবে?
না, না, আমি ব্যাঙ্কে দেখা করে নেব। হঠাৎ দেখলাম, তাই ভাবলাম একটু মুখটা দেখিয়ে যাই।
তাই করো। আমার সঙ্গে দেখাও হয় না। এখানে তো বসি না।
নেমে এসেছিল মাধুরী। রঞ্জনের অদ্ভুত রুটিন শুনে অবাক হয়েছিল। ও যে বর্ধমানে রাতে থাকে না কলকাতায় হোটেলে ওঠে, তাতো বলেনি। নাম ভাড়িয়েছে, তাও বলেনি। রাত কাটায় কোথায়, তাও তো বলেনি।
পরের দিন ঠিক ওই সময়ে বিনয় লজ-এর উলটোদিকের ফুটপাতে হিন্দু মহাসভার বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে রইল মাধুরী।
বি.বি.ডি. বাগ এর দিক থেকে এল তালপাতার সেপাই। রঞ্জন চিরকাল মাথা হেঁট করে হাঁটে–যেন একটা গণ্ডার। এদিক-ওদিক তাকায় না। সেদিনও গণ্ডার-হাঁটা হেঁটে বিনয় লজে ঢুকে গেল…
এবং বেরিয়ে এল পেছনের ঘোরানো লোহার সিঁড়ি বেয়ে।
পেছনের সিঁড়িটা আগেই দেখে নিয়েছিল মাধুরী। তিনতলার ছাদ থেকে ঘুরে-ঘুরে, সব তলার বারান্দার প্রান্ত ছুঁয়ে নেমে এসেছে একতলায়। সেখানে রিক্সওলাদের মালিকের আড্ডা। টিনের শেড। এখান দিয়েই বেরিয়ে এল রঞ্জন।
কিন্তু এত ফিটফাট হয়ে এল কেন? এ যে একেবারে সাহেব। টাই কোট বুট ঝকঝক করছে। কেনা সুট নয়–বানানো। দারুণ মানিয়েছে। ছিপছিপে মানুষটাকে এখন ভোলা কৃপাণ বলেই মনে হচ্ছে।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরল রঞ্জন।
চোখ কপালে উঠে গেছিল সেদিন। কিপটের রাজা রঞ্জন ট্যাক্সি চড়ছে অম্লান বদনে। চা খাওয়াতে গিয়ে যে কিনা বুকপকেট থেকে পাঁচ টাকার নোট বেরিয়ে গেলে মুখ বেঁকিয়ে ফের ঢুকিয়ে রাখে। বলে, আমার পাঁচখানা পাঁজর।
হতভম্ব মাধুরীর সামনে দিয়ে হু-উ-স করে ট্যাক্সি বেরিয়ে যেতেই সম্বিৎ ফিরে পেয়েছিল সে। কপাল ভালো ফুটপাতের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল আর একটা ট্যাক্সি, উঠে বসেছিল পেছনে।
মিটার ডাউন করে ট্যাক্সি ড্রাইভার জিগ্যেস করেছিল, কোথায় যাবেন?
উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে দূরের ট্যাক্সি দেখিয়ে মাধুরী বলেছিল, ওই ট্যাক্সি যেখানে যায়।
আড়চোখে মাধুরীর দিকে একবার শুধু তাকিয়েছিল ড্রাইভার। তারপর আর কথা বলেনি। আজকাল মেয়েরাও গোয়েন্দা হচ্ছেড্রাইভার তা জানে।
চৌরঙ্গীর ওপর ট্যাক্সি ছেড়ে দিল রঞ্জন। ছেড়ে দিল মাধুরীও।
পাঁচতলা হোটেলের গাড়িবারান্দার তলায় দাঁড়িয়েছিল সুবেশা একটি মেয়ে। সুবেশা ছাড়া তাকে সুন্দরী আখ্যা দেওয়া যায় না। মেজেঘষে শরীরটাকে চলনসই করে রেখেছে, মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে তো বটেই। চেহারায় তার ছাপ রয়েছে।
রঞ্জন তাকে নিয়ে ঢুকে গেল পাঁচতারা হোটেলে।
ঘণ্টাখানেক এদিক-ওদিক করেছিল মাধুরী। কিন্তু জায়গাটা খারাপ। সুন্দরী মেয়ে একলা ঘুরঘুর করছে দেখে চারপাশ থেকে ঘিরে-ধরা, উঁকিঝুঁকি মারা, এমনকি চলুন না ঘুরে আসি আপ্যায়নও শোনা হয়ে গেল।
মাধুরী আর দাঁড়ায়নি। দাঁড়াতে পারেনি। মাথা ঘুরছিল। চোখের জল চাপতে গিয়ে চোখে ঝাপসা দেখছিল। কোনওমতে ধর্মতলার মুখে এসে ট্রামে চেপে চলে এসেছিল শিয়ালদা।
পরের শনিবার যায়নি ব্যাঙ্কে। রবিবার কিন্তু রঞ্জন যথারীতি ব্যারাকপুরে এসে ওকে নিয়ে গেছিল গান্ধীঘাটে। শুধু জিগ্যেস করেছিল, শনিবার এলে না কেন? তার বেশি কিছু না। মাধুরী যে অপকর্ম দেখেছে–তা নিশ্চয় জানতে পারেনি রঞ্জন। কিছু জিগ্যেস করেনি।
তবে…আগের চাইতেও বেশি অন্যমনস্ক মনে হয়েছে তাকে।
মাধুরীর কথা যখন শেষ হল, তখন জলের ধারা নেমেছে ওর দুগাল বেয়ে।
কবিতা শুধু চাইল ইন্দ্রনাথের দিকে।
ইন্দ্রনাথ বললে, ঠিক আছে, আমি দেখছি।
.
মাঝের নাটক
পরের রবিবার নাটক দেখিয়ে দিল ইন্দ্রনাথ রুদ্র।
সকালে আমি আর কবিতা যখন পৌঁছলাম, মাধুরী তার আগেই এসে গেছে। ইন্দ্রনাথ পাশের ঘরে যোগব্যায়াম করছিল। কবিতা ওকে হিড়হিড় করে টানতে লাগল।
অসভ্যতার একটা সীমা আছে ঠাকুরপো। মেয়েটা এসে একলা বসে রয়েছে, আর তুমি শূন্যে ঠ্যাং তুলে ঘোড়ার ডিমের আসন করছ?
এটা ঘোড়ার ডিমের আসন হল? গায়ে গেঞ্জি চড়াতে-চড়াতে প্রতিবাদ করেছিল ইন্দ্রনাথ, জানো এই আসন জহরলাল নেহরু করতেন। তাই অত শার্প ছিল ব্রেন।
মেয়েটাকে একা বসিয়ে রেখে?
একলাই তো থাকবে এখন। তোমার মতো বেরসিক আমি নই।
তার মানে?
রা আসছে, ঘড়ি দেখল ইন্দ্রনাথ, সময় হয়েছে নিকট, এখন বাঁধন পরাতে হবে।
*
ছিলেছেঁড়া ধনুকের মতো ঝট করে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল মাধুরী। মুখ থেকে নেমে গেছে সমস্ত রক্ত। একে তো হাতির দাঁতের মতো ফরসা গায়ের রং–আচমকা নিরক্ত হয়ে যাওয়ায় এখন তা কাগজের মতো সাদা।
