রঞ্জন কিন্তু সটান পথের পথিক। ওই তোমার লক্ষ্য–মারো গুলি উড়িয়ে দাও চঁদমারি।
কড়া বিবেকের শাসন তাই রঞ্জনকে বিপথে যেতে দেয়নি। কোনও লোভের ফাঁদে পা দিতে দেয়নি। বিবেক ছাড়া কাউকে গুরু বলে মানেনি মানবেও না।
শান্তিনিকেতনের ছেলে, বীরভূমের ছেলে রঞ্জন যখন বড় হল, পর-পর অনেক পরীক্ষার বেড়া টপাটপ টপকে এসে ব্যাঙ্কের ম্যানেজার হয়ে বসল–তখনও পালটাল না ওর স্বভাব আর চরিত্র, নীতিবোধ আর বিবেক।
মাধুরীও আর ছোট খুকিটি নেই। শুধু শরীরে নয়, রং ধরেছে তার গোটা মনেও। সিউড়ির বড় পরিবারের মেয়ে সে। বোলপুরের পথেঘাটে দেখা হতে-হতে কখন যে এই লিকলিকে শ্রীহীন কালো রঙের মানুষটাকে মন দিয়ে ফেলেছিল, তা সে নিজেই জানে না। শরীর যখন পল্লবিত হল, যখন জ্যোত্মারাতে মন হু-হুঁ করে উঠতে লাগল, যখন তালপাতার সেপাইকে দুদিন না দেখলেই মনের ভেতর অদ্ভুত এক মোচড়ানির আবির্ভাব ঘটতে লাগল, তখন…শুধু তখন সে বুঝল, এরই নাম প্রেম।
রঞ্জনও তা বুঝেছিল। কিন্তু এতই রসকষহীন যে দুটো প্রেমের কথাও গুছিয়ে বলতে পারত না। প্রেমের চিঠিও লিখতে পারত না। বিয়ের কথা উঠলেই খালি বলত, দাঁড়াও, একটু গুছিয়ে নিই।
আর কী গুছোবে? পাকা চাকরি, নামী ব্যাঙ্ক, মোটা মাইনে। এবার মালাটা বদল করে নাও গো। আর কত দিন মাস্টারি করব? আমারও কি ইচ্ছে যায় না সংসার করার?
এইরকম ভাবেই সোজা কথা সোজাভাবে বলে এসেছে মাধুরী। এত দুদিনের মন দেওয়া নেওয়া নয় যে হিসেব করে আলতো হাতে গিঁট দিতে হবে?
একবগ্না রঞ্জনকে কিন্তু কিছুতেই রাজি করাতে পারেননি। বিখ্যাত দাঁত বের করে হেসে হেসে বলত, কি বিয়ে পাগলি মেয়ে রে বাবা! দুটো দিনও তর সইছে না! দাঁড়াও, কিছু একটা করি।
রেগে যেত মাধুরী, তদ্দিনে আমার স্বর্গের সিঁড়ি তৈরি হয়ে যাবে।
ভালোই তো, দুজনে হাত ধরাধরি করে, সেই সিঁড়ি বেয়ে স্বর্গে গিয়ে সেখানেই মালাটা বদল করে নেব। বিয়ের মন্ত্র কে পড়বে জানো? নারদ!
এইভাবেই চলছিল দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। দুজনে থাকে কলকাতার দুদিকের মফস্বলে। রঞ্জনের ডেরা বর্ধমানে মাধুরীর ব্যারাকপুরে। রঞ্জনকে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করতে হয় বলে শনি আর রোববার ছাড়া মাধুরীর সঙ্গে দেখা করতে পারে না। শনিবার মাধুরী চলে আসে কলকাতায় অফিস থেকে রঞ্জন বেরিয়ে ওকে নিয়ে চলে যায় গঙ্গার ঘাটে। রবিবারে রঞ্জন চলে যায় ব্যারাকপুরে। মাধুরীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে চলে যায় গান্ধীঘাটে।
গঙ্গা ওদের দুজনেরই প্রিয়। গঙ্গার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে দুজনেরই খুব ভালো লাগে।
কিন্তু মাস কয়েক ধরে যেন একটু বেশি চুপ মেরে থাকে রঞ্জন।
বেশি খোঁচালে শুধু বলে, দাঁড়াও, দাঁড়াও, শিগগিরই একটা নতুন নাম নিতে যাচ্ছি।
কী নাম গো?
এক্স রে?
হ্যাঁ।
এ নাম কেন?
আমি হব অদৃশ্য রশ্মি। অদৃশ্য আলো হয়ে ঢুকে যাব একদম ভেতরে–যেখানে রয়েছে। কংকালের বীভৎস হাড়গোড়।
কী বলছ?
বাইরের চাকচিক্য দেখে এ মিঞা কোনওদিন ভোলেনি–ভুলবে না রক্তমাংসের রূপের আড়ালে রয়েছে হাড়ের কাঠামো–আসল স্ট্রাকচার। অদৃশ্য রশ্মি দেখতে চায় কোথায় চিড় ধরেছে। সেই কাঠামোটায়।
এসব হেঁয়ালির ব্যাখ্যা আর হাজির করেনি রঞ্জন। স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। মাধুরী আর পাঁচটা মেয়ের মতো নাছোড়বান্দার মতো লেগেও থাকেনি। রঞ্জন কিছু বলতে চাইছে না–বেশ তো সময় হলেই বলবে। না বলে যাবে কোথায়? মন খুলে কথা বলার মানুষ একজনই–মাধুরী?
কিন্তু এহেন অটল প্রত্যয়ে চিড় ধরল অকস্মাৎ। সেইদিন থেকে ভয়ে কাটা হয়ে রয়েছে মাধুরী। ঘটনাটা ঘটল এইভাবে।
স্কুলের একটা কাজে বি-বি-ডি বাগ গেছিল মাধুরী। আগে থেকে বলা থাকলে প্রাণের মানুষটাকে বলে রাখা যেত। কাজ শেষ করে একটা আড্ডা টাড্ডা দেওয়া যেত। কিপটের পকেট বেশি ফাসানো যেত না কিন্তু চা আর কচুরি তো খাওয়া যেত।
কাজ শেষ হতেই পাঁচটা বেজে গেল। ব্যাঙ্কে গিয়ে আর লাভ নেই। রঞ্জন এতক্ষণে হাওড়ায় গিয়ে ট্রেনে চেপেছে। শিয়ালদার ট্রামে মানুষ ঝুলে ঝুলে যাচ্ছে। বাকি মানুষ পিলপিল করে হাঁটছে বৌবাজারের স্ট্রিট ধরে। তাদের সঙ্গেই মিশে গেল মাধুরী। ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার সামনে দিয়ে যখন কোলের বাজারের দিকে যাচ্ছে, তখন দেখল রঞ্জন হনহন করে ঢুকে গেল একটা তিনতলা বাড়িতে।
সে বাড়ির দোতলায় ঝুলছে পেল্লাই একটা সাইনবোর্ড। তাতে লেখা : বিনয় লজ।
হাঁ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল মাধুরী। তারপর ভাবল, নিশ্চয় অফিসের কাজে ঢুকেছে ভেতরে। ব্যাঙ্কের ম্যানেজার তো। অনেকে ক্যাশ ক্রেডিট অ্যাকাউন্ট খোলে, হাইপোথিকেট করে। রঞ্জনকে এনকোয়ারি করতে যেতে হয় মাঝে-মাঝে। এসব গল্প গঙ্গার পাড়ে শুনেছে।
এখনও নিশ্চয় সেই কাজ নিয়ে এসেছে। ঢুকুক, মাধুরীরও ঢুকতে ক্ষতি নেই। ব্যারাকপুরের ট্রেন অনেক, পরের ট্রেনটা ধরলেই হবে। একটু দেখা করে গেলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।
বিনয় লজ-এর সিঁড়িতে পা দিয়েছিল মাধুরী। তিন ধাপ ওপরেই একটা ঘর। সেখানে পালিশওঠা কাঠের কাউন্টারে বসে একজন বুড়ো বিড়ি টানছিল। পাঞ্জাবির যা চেহারা, ম্যানেজার বলেও তো মনে হয় না।
বুড়ো তোক আর ছোঁড়া হোক–সুন্দরী দেখলেই একটু বেশি খাতির করে। মাধুরীকে দেখেই বিড়ি নামিয়ে বুড়ো চেয়ে রইল।
