সে নিশ্চয় আশা করেছিল, ঘরের মধ্যে শুধু ইন্দ্রনাথ থাকবে। তাই আরও দুটি প্রাণী তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রয়েছে দেখে একটু থতমত খেয়ে গেল।
আকৃতিতে কিছুটা পল্লীবালার মতো হলেও আচরণে সে তা নয়। মুহূর্তেই দ্বিধা খসিয়ে ফেলে দুহাত তুলে নমস্কার করল আমাদের তিনজনকেই।
বললে নরম গলায়, আসব?
ইন্দ্রনাথ বললে, আসবেন না তো কি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন? আপনার কথাই হচ্ছিল এতক্ষণ। বসুন ওইখানে। বউদি, এঁর কথাই তোমাকে বলছিলাম। মাধুরী ঘোষদস্তিদার। আর এই যে দুটি মূর্তিকে দেখছেন মিস ঘোষদস্তিদার, এঁদের একজন আমার সাহিত্যিক বন্ধু মৃগাঙ্ক রায়– আর একজন তার সারাজীবনের অপধর্মের সঙ্গিনী–ম্যাডাম কবিতা রায়।
কবিতা বললে, আহা কথার কী ছিরি। বসো ভাই, তোমার নামটা এক্ষুনি শুনলাম। বেশ নাম। এ নাম তোমাকে মানায়। তোমার প্রাইভেট লাইফের প্রবলেম একটু জেনে ফেলেছি বলে লজ্জায় পড়ে যেও না। আমাদের এই তিনজনের মধ্যে কোনও কথাই চাপা থাকে না। প্রত্যেকে প্রত্যেককে কনসাল্ট করি, অ্যাডভাইসও দিই। তোমার ভাবী বর নাকি আর একটা মেয়ের সঙ্গে লটঘট করে বেড়াচ্ছে?
একটু রাঙা হল মাধুরীর ফরসা গাল। দেখে বেশ লাগল। আজকালকার মেয়েরা লজ্জায় রাঙা হতে ভুলে গেছে। রাঙা হওয়াটা মেয়েদের একটা প্লাস পয়েন্ট। মাধুরী তা জানে।
চোখ নামিয়ে নিয়ে সেকেন্ড কয়েক পরে সে বললে, হ্যাঁ।
ঠাকুরপোর সামনে যা বলতে পারোনি, তা আমার সামনে বলো। দরকার হলে চলো পাশের ঘরে যাই–
তা দরকার হবে না, মাধুরী এবার চোখ তুলেছে।
এতটুকু নার্ভাস নয় সে। দু-হাত রেখেছে দু-হাঁটুর ওপর। আঙুলে আঁচল পাকাচ্ছে না। বরং মেরুদণ্ড সোজা। সরল চোখ সোজা তাকিয়ে রয়েছে কবিতার দিকে, কোনও অন্যায় তো করিনি যে আড়ালে কথা বলব।
এত সোজা কথা এত সরলভাবে যে বলতে পারে, তার মনে পাপ থাকতে পারে না।
কবিতা হেসে ফেলল, এত রূপ নিয়ে মনের মানুষকে একা দখলে রাখতে পারছ না? সে কি তোমার চেয়েও রূপসী?
একটু বুঝি অন্যমনস্ক হল মাধুরী–সে অনেক স্মার্ট। তা হোক। কাজের জায়গায় ছেলেদের মিশতেই হয় মেয়েদের সঙ্গে। তা নিয়ে আমি ভাবি না।
তবে ভাবছ কী নিয়ে?
অন্যমনস্ক ভাবটা সরে গেল চোখ থেকে। স্পষ্ট উচ্চারণে থেমে-থেমে মাধুরী বললে, রঞ্জন বেনামে হোটেলে ঘর নিয়েছে কেন? কেন অফিস থেকে বেরিয়ে সেই হোটেলে গিয়ে ওঠে? কেন সেখানে গেলে আর তাকে দেখা যায় না?
.
রঞ্জনের পুরো নাম কুমুদরঞ্জন ঘোষ। মাধুরী ওকে শুধু বলে, রঞ্জন। বলে, তুমি শুধু রং লাগিয়েই গেলে আমার মনে–তোমার মনেও কোনও রং নেই, শরীরে তো নেই-ই।
মানুষটাকে মাধুরী খুব ছোটবেলা থেকে দেখছে বলেই এত স্পষ্টাস্পষ্টি কথা বলতে পারে। প্রেমের প্রথম পর্যায়ে যে মেয়ে ভালোবাসার মানুষটাকে বলে বসে, ওগো তোমার শরীরে কোনও রং নেই–তার মতো মূর্খ মেয়ে ভূভারতেও আর নেই।
কিন্তু মাধুরী-রঞ্জনের প্রেম তো আজকের নয়। শরীরের রং যখন দুজনের কারোরই ছিল না–তখন থেকেই রং ধরেছে মনে। বড় পাকা রং, মলেও এ রং উঠবে না।
তাই রঞ্জনের শরীর নিয়ে অত ঠাট্টা করে মাধুরী।
ঠাট্টা করার মতো শরীরও বটে রঞ্জনের। শুধু তালপাতার সেপাই বললে কম বলা হয়। মুখের গড়ন লম্বাটে, চুলের কোনও বাহার নেই। নেই জামাকাপড়ের ছিরিছাঁদ। একটা ঢলঢলে সাদা বুশশার্ট, আর ততোধিক ঢলঢলে সাদা ফুলপ্যান্ট।
ওস্তাগর তার শ্রীহস্তের পরশ বোলালে তালপাতার সেপাইয়ের অঙ্গেও কিঞ্চিৎ সুষমা এনে দিতে পারত, কিন্তু রঞ্জন দরজির সঙ্গে আড়ি করেছে অনেকদিন। কোজামা আর প্যান্ট দেদার পাওয়া যায় এবং অনেক সস্তাতেও হয়–অতএব কেন বেশি খরচ করতে যাবে?
মাধুরী ওকে অনেক বলেছে, দ্যাখো, এটা দ্যাখন-এর যুগ। আগে বাইরেটা দেখাও, তবে তো লোক তোমার ভেতরটা দেখতে কাছে আসবে।
রঞ্জন ওর বিখ্যাত দাঁত বের করে হেসে-হেসে বলে, আরে রাখো তোমার মেয়েলি লজিক। আমি কি মেয়েছেলে যে নিজেকে সাইনবোর্ড করে রাখব? সোনার আংটি যদি বেঁকাও হয় কাঞ্চন শিল্পী তার কদর করে। যে করে না, সে সোনা চেনে না–তার কাছে আমি যেতেও চাই না।
চিরকালই এমনই ফটর-ফটর বুকনি ছেড়ে এসেছে রঞ্জন। মুখে কোনও কথা আটকায় না। লম্বাটে করোটি দেখে ছেলেবেলায় বাড়ির মেয়েরা হাসাহাসি করত কিন্তু চুপ মেরে যেত করোটির গ্রে সেল-দের কেরানি দেখলে। একরত্তি ছেলের জিভ তো নয় যেন শানানো ক্ষুর! ব্রেন তো নয়–যেন টগবগে লাভা। একটুও না রেগে এমন আঁতে ঘা মেরে কথা বলে যেত রঞ্জন–পাড়াপড়শি থ হয়ে যেত। গালে হাত দিয়ে বলত–এ ছেলে কিছু একটা হবে। বাব্বা, এত কথা শিখল কোত্থেকে?
কথায় রঞ্জনের সঙ্গে কেউ পেরে ওঠেনি–আজ পারে না। শুধু কথার ধোকড় নয়–বুদ্ধিতেও চৌকস। বীরভূমের ছেলেদের ধমনীতে বীর রস থাকবে–এটা স্বাভাবিক। শৌর্য বীর্য তাই কথাতেও ফুটে বেরোয় দুনিয়ার কারও সে ধার ধারে না–জিভ ছোটালেই সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়।
তার আগে নয়। তখন সে শান্তশিষ্ট, অমায়িক হাস্যবিশিষ্ট এক অতি সজ্জন পুরুষ।
কাঠি দিলেই কিন্তু সে অন্য পুরুষ। তখনও সে হাসে। হাসিতে তখন থাকে মিছরির ছুরি। বচনে থাকে লাভার ফুলকি।
শান্তিনিকেতনের হস্টেল লাইফে এই বচনের ক্ষুর চালিয়ে তছনছ করে ছেড়েছিল রঞ্জন। খোদ প্রধানমন্ত্রীও এক ঘরে এক মাদুরে সামনাসামনি থই পাননি। ভাঙা-ভাঙা বাংলায় ধমকেছেন। শেষে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছেন। প্রধানমন্ত্রীত্ব যাঁকে করতে হয়, তাকে সবসময়ে তো সোজা পথে চলানো যায় না
