*সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত। ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৮২।
পাঁচ তারার প্যাঁচ
মাধুরী
কবিতা বললে, ঠাকুরপো কী ভাবছ?
দোরগোড়া থেকেই দেখছিলাম, শিবনেত্র হয়ে রয়েছে ইন্দ্রনাথ রুদ্র। কড়িকাঠের দিকে চেয়ে রয়েছে। চাহনি কড়িকাঠ ভেদ করে উধ্বলোকে প্রস্থান করেছে।
অর্থাৎ ও ভাবছে। বড় সোফায় আড় হয়ে শুয়ে, কনুইয়ের ওপর চিবুক ন্যস্ত করে, চিন্তালোকে অবস্থান করছে।
ভাবমগ্ন ইন্দ্রনাথকে আমি কখনও ঘাটাই না। কবিতা কিন্তু অন্য ধাতু দিয়ে গড়া। ঠিক এই মুহূর্তগুলোর মওকা পেলে ও কখনও ছাড়ে না। খোঁচা মারবেই। দেওর-বউদির এহেন সম্পর্ক ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে বঙ্গ যুবসমাজে। রাজনীতির উত্তাপে বোধহয় সব শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে।
ঊর্ধ্বলোক থেকে নেত্রযুগলের দৃষ্টিকে মর্তে টেনে নিয়ে এল ইন্দ্রনাথ। ধড়মড় করে উঠে বসল। আকৰ্ণ হেসে বললে, কি সৌভাগ্য! একেবারে হরগৌরী যে।
আমরা যেখানেই যাই, দুজনে মিলেই যাই। আমি বউকে ছেড়ে থাকতে পারি না, আবার বউও আমায় ছেড়ে থাকতে পারে না। এটা এখন বিশ্ববিদিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্ত্রৈণ বদনামও জুটেছে। জুটুক।
ইন্দ্রনাথের এই সুভাষ সরোবরের গাছপালায় ঘেবা নিবিড় নিকুঞ্জে ফি হপ্তায় দুজনে আসি। ব্যাচেলর বন্ধুকে সঙ্গে নিই, জানলা খুলে লেকের জল দেখি, মোলায়েম হাওয়া ভক্ষণ করি, কবিতা সেই ফাঁকে ব্যাচেলরের ঘরদোর গুছিয়ে দেয়, রান্নাঘরের অবস্থা দেখে নেয়, ভালোমন্দ বেঁধেও দেয়। কোথায় বালিগঞ্জ, আর কোথায় বেলেঘাটা ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস হয়ে যাওয়ার পর যাতায়াতের অসুবিধেটা ঘুচেছে।
প্রতি সপ্তাহে চৌকাঠ পেরোনোর পরেই ইন্দ্র ঘুরিয়ে ফিরিয়ে টিটকিরিটা ছুঁড়ে মারে আমাদের লক্ষ্য করে। কিন্তু তখন যে হাসিটা ওর চোখমুখকে ভাসিয়ে দেয়, তা আনন্দের হাসি, ওর হীরে চোখ ঝিকমিক করে ওঠে, গলার আওয়াজে খুশি উপচে পড়ে। ওর নিঃসঙ্গ উষর জীবনে আমরা দুজনে যে দু-ফেঁটা বৃষ্টির জল।
সেই রবিবারের সকালেও আমি ওর টিটকিরি শুনলাম–এ কান দিয়ে ঢোকালাম, ও কান দিয়ে বের করে দিলাম।
কবিতা কিন্তু পায়ে-পায়ে ওর সামনে এসে দাঁড়াল। চোখে চোখ রেখে বললে, বুঝেছি, পরীর ধ্যান করা হচ্ছে।
কপট দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ইন্দ্রনাথ বললে, নিখাদ উক্তি। হ্যাঁ, আমি একটা পরীর কথা ভাবছি।
মানুষ পরী? ওর পাশে বসে বললে কবিতা।
হ্যাঁ। দুটো ডানা কেবল নেই। কিন্তু কী রূপ, কী রূপ বউদি, দেখলে তোমার হিংসে হত।
রূপসী কবিতা তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না। বললে সে কোথায় থাকে?
ব্যারাকপুরে।
কী করে?
টিউশানি। কিত বয়স?
চব্বিশ।
সে কেন তোমার কাছে আছে?
তার একটা প্রবলেম নিয়ে।
কী প্রবলেম?
বিয়ের।
কাকে বিয়ে করতে চায়?
ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে।
ম্যানেজারের মতলবটা কী?
সেইটাই ধোঁয়াটে।
মেয়েটিকে সে ভালোবাসে?
প্রাণ দিয়ে।
তবে আর প্রবলেমটা কোথায়?
সে আরও একটা মেয়ের সঙ্গে ঘোরাফেরা করছে।
সেকী! ঝাঁটা মারো, ঝাঁটা মার অমন ম্যানেজারকে। এনে দাও আমার সামনে–খেংড়ে বিষ ঝেড়ে দিচ্ছি।
ঝাঁটা চালানোর অস্ত্রবিদ্যা লুপ্ত হতে চলেছে বঙ্গদেশ থেকে। তোমার যদি এখনও জানা থাকে, তাহলে মেয়ে পুলিশদের শিখিয়ে দিও বউদি। কিন্তু এটা ঝাটার কেস নয়।
তবে?
ঘড়ি দেখল ইন্দ্রনাথ। সমকোণে কাটা দুটো দাঁড়িয়ে আছে নয় আর বারোর ঘরে।
বললে, এ কাহিনি রূপসি নায়িকাকে আসতে বলেছিলাম ঠিক নটায়। টাটকা রিপোর্ট নেওয়ার জন্যে। তোমাদের দেখানোর জন্যে। ত্রিভুজ প্রেমের গোলমালে মাথা গলাতে আমার ইচ্ছে নেই। তুমি গোয়েন্দা লেখকের বউ। অতএব, নিজেও গোয়েন্দানি। তাই তোমরা যখন আসবে, তাকে আসতে বলেছি। ইচ্ছে হলে, কেসটা তুমি টেক-আপ করতে পারো। আমি টায়ার্ড। কোনও পুরুষ যদি দুটো গার্ল ফ্রেন্ডকে খেলিয়ে যায়, তাতে আমার কী? বাজার যাচাই করে নেওয়ার অধিকার সবার আছে।
ছিঃ। নারী জাগরণের যুগে তুমি মেয়েদের পণ্যদ্রব্য মনে করতে পারলে? মেয়েরা কি আলু পটল মাছ-মাংস? যাচাই যে করতে চায়, খেংড়ে তার–
বিউদি সে এসেছে।
লোহার গেট খোলার আওয়াজ শুনলাম। চটির চটাস চটাস শব্দ হল। একটা সময় ছিল যখন, দূরায়ত নূপুরনিক্কণ শুনে চিত্ত চঞ্চল হত। মেয়েরাও জানত, সলাজ চরণধ্বনি শুনিয়ে বুক দুলিয়ে দেওয়ার কৌশল। জানত, অপাঙ্গ চাহনির ম্যাজিক। আজকালকার মেয়েরা বড় পুরুষালি হয়ে গেছে। ফুল আছে, ফুলের সুবাস নেই। এটা ওয়েস্টার্ন কালচারের প্রভাব। হিন্দি ফিল্মের ধাক্কা।
উঠোন পেরিয়ে, সিঁড়ির ওপর দিয়ে, চটাস-চটাস শব্দ এসে পৌঁছল দরজার সামনে। বুঝি এক টুকরো জ্যোত্মার আবির্ভাব ঘটল সেই মিষ্টি সকালে।
বাংলার মেয়েদের সম্বন্ধে একটু আগে আমি যা ভাবছিলাম, তার সংশোধন দরকার হয়ে পড়ল মেয়েটিকে দেখে। টাকাপয়সার চিন্তা নিয়ে যেদিন থেকে মেয়েরা পথে বেরিয়েছে সেদিন থেকেই পুরুষের সঙ্গে তাদের টক্কর লেগেছে। ফলে, নমনীয়তা কমনীয়তা লাবণ্য লজ্জা ইত্যাদি ভালো ভালো বিশেষণগুলো যেন মেয়েদের চেহারা থেকে উবে যাচ্ছে। রুক্ষ বাস্তব উবিয়ে দিচ্ছে Essential Essence গুলো।
কিন্তু এই মেয়েটি তার ব্যতিক্রম।
এর সারা শরীরের স্নিগ্ধতা যেন আরকের মতোই তাজা রয়েছে। পূর্ণিমার রাতে চাঁদের দিকে তাকালে মন যেমন জুড়িয়ে যায়, এর নরম চোখ দুটোর দিকে তাকালেও সেই রকম একটা আবেশ শরীরে মনে জড়িয়ে যায়। রং ফরসা হলেই সব মেয়ে সুন্দরী হয় না, কিন্তু এ মেয়েটি ফরসা বটে, সুন্দরীও বটে। অথচ প্রসাধনের বাহুল্য নেই। এমনকি কানে দুল পর্যন্ত নেই। কব্জিতে শুধু একটা সরু ঘড়ি। পরনে হালকা গোলাপি রঙের তাঁতের শাড়ি। ব্লাউজও সেই রঙের। কিন্তু কাটছাঁটের মধ্যে দরজির আধুনিকতা দেখা দেয়নি। পায়ে রবারের হাওয়াই স্লিপার–তাই এত চটাস-চটাস আওয়াজ হচ্ছিল।
