চাপা গলায় গজরে উঠল রাজু। চোদ্দো বছরের এই ছেলের গলায় শুনেছি সুমিষ্ট স্বর–এত কর্কশ, গুরুগম্ভীর গজরানি এ কণ্ঠে কল্পনাই করতে পারা যায় না। শিউরে উঠলেন পলাশবাবু। ভয়ে কাঠ হয়ে চেয়ে আছেন ছেলের দিকে।
চমকে উঠেছিল গুণীনবাবুও। পরক্ষণেই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে দ্রুত হাতে বারকয়েক সারা গায়ে কাঠি বুলিয়ে নিয়ে টেনে ধরল মেঝের ওপর।
বলল–রাজু, নিজে মাপ।
প্রতিবার গায়ে কাঠি বোলাবার সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে কুঁচকে যাচ্ছিল রাজু। চোখে সেই অগ্নিগর্ভ দৃষ্টি, শক্ত ঠোঁট একটু ফাঁক হয়ে যাওয়ায় না মাজা হলুদ দাঁত বাঘের মতো যেন রক্ত-তৃষ্ণায় লোলুপ। দৃশ্যটা অতিশয় রোমাঞ্চকর। কিন্তু গুণীনবাবু তো এসব দেখেশুনে অভ্যস্ত। তাই পরোয়া করেনি। হুকুমের স্বরে বলল-রাজু, নিজে মাপ।
ভেবেছিলাম এবার রাজুর ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। কিন্তু আবার সামলে নিল সে নিজেকে। আমি যে শক্তি দিয়ে এসেছি ওর মগজে, এখনও তার রেশ রয়ে গেছে মনে হচ্ছে।
কাঠিটা মাপল রাজু। একই কাঠি একটু আগে মেপেছিল বাইশ আঙুল। কোনও হাতসাফাই যে হয়নি তা তো দেখাই যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও এবার তা মাপবার পর দাঁড়াল চৌত্রিশ আঙুল।
কাঠি বেড়ে গেছে। গুণীনবাবু বাহাদুর বলতে হবে। ছায়াদানবের কিছুটাকে মন্ত্রবলে টেনে এনেছে কাঠির মধ্যে।
তাকিয়ে দেখলাম, রাজুর অবয়ব ঘেরা ছায়াদানব কঁপছে থির থির করে…একবার গুটিয়ে গিয়ে আবার বড় হয়ে যাচ্ছে..আর ভলকে ভলকে কালচে বেগুনি কুৎসিত আভা ঠিকরে যাচ্ছে চারিদিকে।
বলা বাহুল্য এ সবই দেখলাম আমি। আর কেউ না।
খুশি গলায় বললে গুণীনবাবু–রাজু, আর ভয় নেই। ব্যাটাকে পাকড়েছি। কজায় এসে যাবে এখুনি। তারপর কাঠি ছোট হতে হতে দেখবি পনেরো আঙুলে এসে দাঁড়িয়েছে। আর কয়েকবার ঝাড়লেই
পরক্ষণেই বুঝি প্রলয় ঘটে গেল ঘরের মধ্যে। এত দ্রুত ঘটনাগুলো ঘটে গেল যে ভালো করে দেখা গেল না কি হয়ে গেল।
শুনলাম একটা শতবজ্রগর্জনের মতো হুঙ্কার রাজুর কণ্ঠে। সঙ্গে সঙ্গে সে ছিটকে দাঁড়িয়ে উঠেই বোধহয় পর পর প্রচণ্ড লাথি মেরে গেছিল বসে থাকা গুণীনবাবুর চোয়ালে, বুকে আর পেটে। বোধহয় বললাম এই কারণে যে তিড়িংমিড়িং করে লাফিয়ে উঠে রাজুকে কেবল এ-পা আর ও-পা ছুঁড়তে দেখেছিলাম। এরই নাম বোধহয় ক্যারাটে বা কুংফু।
ফলটা হল এইরকম : বেঁটেখাটো গুণীনবাবু বসে থাকা অবস্থাতেই শূন্য পথে উড়ে গেল এবং দশ ফুট পেছনকার খোলা দরজা দিয়ে আছড়ে পড়ল বাইরের চাতালে।
প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব আছে বটে ভদ্রলোকের। নিমেষমধ্যে গড়িয়ে গিয়ে সিধে হয়ে দাঁড়িয়েই কাঁচাকেঁচা সামলাতে সামলাতে ছুটল বাস স্ট্যান্ডের দিকে।
ফিরে তাকালাম রাজুর দিকে। তার চোখে খুনের সঙ্কল্প। আতঙ্কে পাংশুবর্ণ পলাশবাবু।
মনস্থির করে নিলাম তৎক্ষণাৎ। প্রবেশ করলাম পলাশবাবুর মগজে। সব যেন পাথর হয়ে গেছে সেখানে। শক্তি প্রভাবে খানিকটা ধাতস্থ করলাম তাঁকে। দুর্গার কথা আমি রাখব ঠিকই। বাঁচাবো রাজুকে। তার আগে বাঁচাতে চাই পলাশবাবুকে। খুন হয়ে যাবে যে ছেলের হাতে।
বললাম–রাজু, যা হাত মুখ ধুয়ে আয়।
রাজু তো চায় কলতলাতেই থাকতে চায় তার শরীরের দখলদার এই বিভীষিকা। রক্তবর্ণ চোখে সে কলতলায় ঢুকতেই পলাশবাবুর হাতটা বাড়িয়ে দিলাম টেলিফোনের দিকে। যে নম্বরটা অনেকদিন ধরে মনে করতে পারছিলেন না–সেটা ডায়াল করালাম ওঁর আঙুল দিয়ে। ওপাশ থেকে ভেসে এল তীব্র ব্যক্তিত্বময় কণ্ঠস্বর।
কথা হয়ে গেল সংক্ষেপে। রাজু বেরিয়ে আসার আগেই (পাক্কা দু-ঘণ্টা পরে) রিসিভার রেখে প্রতীক্ষায় রইলেন পলাশবাবু। মনকে আমি শক্ত করে ধরে রয়েছি। তাই আজ এত নিষ্ঠুর হতে পারবেন। ছেলের মঙ্গলের জন্যেই হতে হবে।
রাজু অশুচি কলতলা-পাইখানা থেকে অশুচি দেহ আর অশুচি মন নিয়ে বেরিয়ে এসে তিন লিটার দুধ আর আমসত্ত খেয়ে নিল একসঙ্গে, সেইসঙ্গে কলা বেশ কয়েকটী। পেট জয়ঢাক। অবয়ব ঘিরে ছায়াদানবকে বেশ পরিতৃপ্ত দেখলাম। বিজয় গৌরবে উল্লসিত। তাই বিকট আভার বিকিরণ আর দেখা যাচ্ছে না। একটু একটু করে কালো ছায়াটা প্রবিষ্ট হচ্ছে সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা গৌরবর্ণ দেহটার মধ্যে। মৌরসীপাট্টা গেড়ে বসেছে আর কী।
হাসলাম। জানি এর ওষুধ কী। ওঝা, গুণীনরা তা জানে না। বিজ্ঞানসাধক ছিলাম বলেই–ঘুমিয়ে পড়েছে রাজু। ওর নিঃশ্বাসেও এখন দুর্গন্ধ। মুখে তো বটেই। ফুলের মতো সেই ছেলেটা, যার নিষ্পাপ মুকুলে ছিল অরণ্যের আশ্বাস–আজ সে ক্ষুদে দানব!
চেয়ারে ঠায় বসে আছেন পলাশবাবু। দরজা জানলা সব বন্ধ। আলো জ্বলছে ঘরে–দিনের বেলাতেও।
মৃদু টোকা পড়ল দরজায়। উঠে গেলেন পলাশবাবু। সামনে দাঁড়িয়ে তিনজন জোয়ান চেহারার যুবক।
একজন বললে–ডক্টর বক্সীর কাছ থেকে আসছি।
দরজাটা দু-হাট করে খুলে দিলেন পলাশবাবু। বললেন–গাড়ি কোথায়?
ওই তো–।
দরজার সামনে এনে রাখুন।
গাড়ি এল দরজার সামনে–শুধু ফুটপাত পেরোতে হবে। ব্যাকডোর খোলাই রইল।
যুবক তিনজনকে নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকলেন পলাশবাবু। ঘুমন্ত রাজুকে তিনদিক থেকে ঘিরে ধরল তিনজনে–খাটের তিন পাশে। মাথার কাছে দেওয়াল। পালাবার পথ ওখানে নেই।
পলাশবাবু টেলিফোনে সব কথাই বলেছিলেন ডাক্তার বক্সীকে। তিনি বড় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হতে পারেন কিন্তু রাজু তার কাছে হবে একটা চ্যালেঞ্জ। এশিয়া-বিখ্যাত তিন মনোচিকিৎসককে সে ঘোল খাইয়েছে (সেটা যে আমার জন্যেই, পলাশবাবু তা জানবেন কী করে?) ক্যারাটে মার জানে, গায়ে এখন অসুরের মতো শক্তি। এর আগে একটা পাগলা-গারদে একাই এক মিনিটের মধ্যে মেল নার্স, ডাক্তার, দারোয়ানকে পিটিয়ে, চেম্বার তছনছ করে দিয়ে বেরিয়ে এসেছে পিথিডন ইঞ্জেকশন দেওয়া সত্ত্বেও।
