তাই নিশ্চিন্তে হয়েছিলাম। সংসার সুখের হয়েছে। একজনের হাওয়ার শরীর, বাকি দুজনের রক্তমাংসের।
দিনকয়েকের জন্যে চুম্বক ক্ষেত্রে ভেসে গিয়েছিলাম। বিজ্ঞানীরা এখনও পুরো হদিশ পাননি এই চুম্বক ক্ষেত্র আর তার অকল্পনীয় শক্তির। এই পৃথিবীতেই বিরাজমান এই শক্তি-ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে সূক্ষ্ম শরীরেও আমাকে অবগাহন করে নিতে হয়। বিশেষ করে সৌরঝড়ের সময়ে। মহাজাগতিক রশ্মির প্রভঞ্জন বয়ে যায় পৃথিবীর ওপর দিয়ে। চুম্বক ক্ষেত্ৰ অকল্পনীয় শক্তির আধার হয়ে ওঠে। এইচ, রাইডার হ্যাঁগার্ডের শী উপন্যাসটা যাঁরা পড়েছেন, তারা অবাক হয়েছেন মৃত্যুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকার রহস্যকেন্দ্র এক মৃত আগ্নেয়গিরির মধ্যে রয়েছে জেনে। আসলে, পৃথিবীর বেশ কয়েকটা জায়গায় পুঞ্জীভূত রয়েছে এই শক্তি। প্রাচীন মঠ-মন্দিরগুলো নির্মিত হয়েছে এই সব জায়গাতেই। দৈবী-শক্তি প্রকৃতপক্ষে এই মহাশক্তি। কুম্ভমেলায় বারো বছর অন্তর যাঁরা গেছেন, তাঁরা দেখেছেন, মধ্যরাত্রে স্নান করার ঠিক সময়টিতে আচম্বিতে কোথা থেকে প্রবল হাওয়া বইতে শুরু করে। প্রচণ্ড শীতে কাঁপতে কাঁপতে একটা ডুব দিলেই কিন্তু কাঁপুনি চলে যায়–আর শীত করে না। এ হাওয়া কোথা থেকে আসে, আসলে তা হাওয়া কি অন্য কিছু, বারো বছর অন্তর কুম্ভ মেলায় কেন সারা পৃথিবীর যোগীরা আসেন–তা অনেকেই জানেন না। পৃথিবীর অনেক অজানা রহস্যের অন্যতম এই রহস্য কিন্তু আমার কাছে মোটেই রহস্য নয়। যখন বেঁচে ছিলাম, সাধনা করেছি হিমালয়ের বিশেষ এক গিরিগুহায়–শক্তির কেন্দ্র আছে সেখানে। মৃত্যুর পরেও অমর সাটাকে মাঝে মাঝে নিয়ে যাই শক্তি-স্নানে অক্ষয় অব্যয় থাকবার মানসে।
কিন্তু নিজের প্রসঙ্গ বড় বেশি বলে ফেলেছি। শক্তি কেন্দ্রে সেবার দেখলাম আরও অনেক বিদেহী গুরু এসেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছে মাদাম ব্লাভাস্কি, কর্নেল অলকট এবং একজন স্বামীজি যিনি থিয়সফিস্টদের সম্বন্ধে কত কটুক্তিই করেছেন একসময়ে। কিন্তু এই শক্তি ক্ষেত্রে দেখলাম তোফা আছেন তিনজনে।
কথায় বলে, সৎসঙ্গে স্বর্গবাস। তা আমার স্বর্গ তো এই পৃথিবী। তাই মিশে গেলাম সৎসঙ্গে বেশ কিছুদিনের জন্যে। এমন সময়ে একদিন গুরুজি দর্শন দিলেন অকস্মাৎ। এই গুরুজির নাম পৃথিবীর সবাই জানেন। কিন্তু আমি তা বলতে চাই না। কথা দিয়েছি।
গুরুজি সৌম্য হেসে বললেন–তুই এখানে সৎসঙ্গ করছিস, ওদিকে তোর রাজুর অবস্থা
যে কাহিল হয়ে এল। যা পালা।
তৎক্ষণাৎ চলে এলাম রাজুর ঘরে। দেখলাম রাজু মেঝেতে বসে কটমট করে তাকাচ্ছে আর চোখ ঘোরাচ্ছে। একটু তফাতে বসে ওর বাবা। ম্লান উদ্বিগ্ন মুখে বিপদের কালো ছায়া।
রাজুর সামনে ময়লা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা কালোমতো বেঁটেপানা চশমাধারী এক প্রৌঢ় একটা ঝাঁটার কাঠি নিয়ে মন্ত্র পড়ছে।
রাজুর সমস্ত সত্তায় জড়িয়ে রয়েছে বীভৎস কালো একটা ছায়া।
দেখেই আঁতকে উঠেছিলাম। এ যে সেই বিভীষিকা–অন্ধকারের পুঞ্জ হতে যার জন্ম অন্ধকারেই যার নিবাস। কিন্তু সরল রাজুকে আশ্রয় করেছে কেন?
ফ্ল্যাটটা একতলায়। পাশেই জলা জায়গা। নোংরা বস্তি। বুঝলাম সবই। রাজু দাঁত মাজা ছেড়েছে। ঘরদোর বমি করে ভাসাচ্ছে। যেখানে সেখানে মলত্যাগ করছে। শুভ শক্তি ঘর থেকে বিদায় নিয়েছে। আবির্ভূত হয়েছে অশুভ শক্তি।
এই ছায়াদানবকে আমি চিনি। মানুষের মনের যত পাপ, যত অন্যায়, যত কালিমা–সব পুঞ্জীভূত হয় ইথারে–ইথিরীয় উপাদানে গঠন করে নেয় কায়া–অপার্থিব সেই কায়া হন্যে হয়ে খোঁজে একটি আশ্রয়–এমন একটি আশ্রয় যাকে বেষ্টন করে পরজীবি লতার মতো নিজের পুষ্টিসাধন করে চলবে, ভোগবাসনা মিটিয়ে চলবে।
এ ছায়াদানবের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাপাচার, অতৃপ্ত কামনার ক্ষুধিত লিপ্সা; এর বিবেক নেই, বোধ নেই, মায়া নেই, মমতা নেই। অতীতেও দেখেছি জগতের অনেক শুভশক্তি এর কুটিল শক্তির কাছে হার মেনেছে। পারব কি আমি?
গুণীন ভদ্রলোক আঁচ করেছে খানিকটা। অশরীরীর অস্তিত্ব অনুমান করে নিয়ে ঝাড়ফুঁক করে চলেছে সেইভাবে কিন্তু কল্পনাও করতে পারেনি–অশরীরী বা দুষ্ট প্রেতাত্মার চাইতেও সহস্র গুণে ভয়াবহ এই ছায়াদানব। মানুষের চোখে সে অদৃশ্য। দৃশ্যমান হলে দাঁতকপাটি লাগতই।
রাজু, মাগো তো কাঠিটা আঙুল দিয়ে, বলে মন্ত্রপড়া ঝাটার কাঠিটা এগিয়ে দিল গুণীনবাবু। চশমাটা ঠিক করে নিয়ে চেয়ে রইল হাসি হাসি মুখে। ভাবখানা, যাবে কোথায় বাছাধন!
রাজুর চোখ জ্বলছে। অমানুষিক চাহনি। বনের শ্বাপদও এ চাহনি দেখলে শিউরে উঠত। কাছে ঘেঁসত না। কিন্তু গুনীনবাবু আঙুলের স্টিলের আংটিটা একবার নিজের কপালে চুঁইয়ে শুধু বললেন–মাপ রে, মাপ। এক ঘণ্টার মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।
রাজুর শরীর এই কদিনেই যেন দুগুণ ফুলে উঠেছে। গোল কাঁধে চিতাবাঘের মতো ঝুঁকে লাফিয়ে পড়ার প্রবণতা। স্ফুলিঙ্গ চোখে সেই রক্তহিম করা জিঘাংসা।
ঠোঁট আর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল রাজুর। কিন্তু সামলে নিলে নিজেকে শেষ মুহূর্তেও। কাঠিটাকে মেঝেতে ফেলে আঙুল ফেলে ফেলে মাপল–বাইশ।
অর্থাৎ বাইশ আঙুল লম্বা কাঠি।
কাঠি টেনে নিল গুণীনবাবু। আবার কিছুক্ষণ মন্ত্র পড়ল আর ফুঁ দিল–মন্ত্র পড়ল আর ফুঁ দিল-মন্ত্র পড়ল আর ফুঁ দিল বার বার তিনবার। তারপর কাঠিটা বোলাতে লাগল রাজুর গায়ে।
