ডাক্তার বক্সী তাই সেইরকম লোক পাঠিয়েছেন। পলাশবাবু জানেন, এক্ষুনি কুরুক্ষেত্র কাণ্ড ঘটে যাবে। তবুও সাহস সঞ্চয় করে ঠেলা দিলেন রাজুকে–ওঠ রে।
চোখ মেলল রাজু। খাটের তিন পাশে তিনজন অচেনা পুরুষ দেখে চোখ বন্ধ করে ফেলল তৎক্ষণাৎ। নগ্ন গা, পাজামার দড়ি শিথিল–এসময়ে…
মৃদু স্বরে পলাশবাবু বললেন–যেতে হবে–ওঠ!
সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলেই চিৎকার করে উঠল রাজু–না!
বুঝেছে সে কোথায় যেতে হবে। কিন্তু হাত-পা চালানোর সময় দিল না তিন মজবুত পুরুষ। দুজনে চেপে ধরল দু-কব্জি আর দু-পায়ের গোছা। আর একজন মাথা–যাতে ঘাড় বেঁকিয়ে কামড়ে দিতে না পারে।
প্রলয় ঘটতই। কিন্তু তা হল না। চ্যাংদোলা করে বিছানা থেকে টেনে নামিয়ে সটান গাড়িতে তুলে ফেলা হল রাজুকে। কালো ছায়াদানবকে ফুঁসতে দেখলাম ওর অবয়ব দিয়ে।
ট্যাক্সি বেরিয়ে যেতেই আমি ওদের পৌঁছনোর আগেই চলে গেলাম মেন্টাল হোমে–ঢুকে গেলাম ডাক্তার বক্সীর মগজে।
.
দীর্ঘদেহী, উন্নতনাসা, গৌরবর্ণ ডক্টর বক্সী যখন অনর্গল পাইপ টানছেন, রাজুকে চ্যাংদোলা করে এনে ফেলা হল তার সামনে।
পাজামা অর্ধেক খুলে গেছে। বিশাল শরীর বিশালতর হয়েছে। রাজু যেন সত্যিই এখন দানব। নোংরা দাঁতে মুখে অকপট হত্যালালসা, রক্তবর্ণ ঘূর্ণিত চোখে ঘৃণার বিষ। কণ্ঠে হুংকার–এখানে কেন?
মুখ থেকে পাইপ নামিয়ে তিনবার টেবিলে ঠুকলেন ডাক্তার বক্সী। যে কাজটা অনেক পরে করার কথা, সেটা যাতে এখুনি করা হয়–এই প্ল্যান আমি তখন তাঁর মাথায় বসে জুগিয়ে চলেছি। আমার কথাই তিনি বললেন মুখ দিয়ে–সেলে ঢুকিয়ে দাও। গিভ হিম শক!
ডাক্তার বক্সী শকথেরাপিতে বিশ্বাস করেন না। খামোকা ব্রেন সেল নষ্ট করে দেওয়ার পক্ষপাতী তিনি নন। টকথেরাপীতে মির্যাকল দেখান, কিন্তু সেটা সময়সাপেক্ষ। মাসের পর মাস মেন্টাল হোমে থাকতে হয়। খরচসাপেক্ষও বটে। মাসে চার-পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে যেতে হয়। তাই তিনি কুসংস্কারমুক্ত হলেও ভোলা মনে কিছুদিন স্ট্যাটিক ইলেকট্রিসিটির শক-থেরাপি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। সমসাময়িক মনোরোগ-বিশেষজ্ঞদের বলেননি–ভূতে পাওয়া রোগীদের ভালো করার জন্যেই তাঁর এই গবেষণা। টিটকিরি দেওয়ার লোকের তো অভাব নেই। প্রেতদেহ যে স্ট্যাটিক ইলেকট্রিসিটিতে সইতে পারে না–এ তত্ত্ব তিনি জেনেছিলেন সাইকিক রিসার্চ সোসাইটি থেকে। সুফলও পেয়েছিলেন কয়েকটা কেসে কিন্তু টিটকিরির ভয়ে গবেষণাপত্রে তা হাজির করেননি পাঁচ কান করেননি। লোকে জেনেছে, তিনি শক দিয়ে রোগ সারিয়েছেন।
আমাকে পাঁচ জায়গায় যেতে হয় বলেই জানতাম তার চিকিৎসার গুপ্তরহস্য। রাজুকে এতদিন এখানে আনিনি– কারণ ভূতে পাওয়ার কে তার নয়। কিন্তু আজ ভূতেদের গুরু ঢুকেছে তার শরীরে।
সুতরাং…
.
তিন মাস পরে দেখা গেল সল্টলেকের স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে নতুন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে রাজুকে স্কুটার চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন পলাশবাবু। মুখে প্রশান্ত হাসি। রাজু ঝকঝক করছে। ব্যক্তিত্ব আর আচরণ পাল্টে দিয়েছেন ডাক্তার বক্সী।
ছায়া-দানব শক খেয়েই পালিয়েছিল। তারপর ওকে টক থেরাপি দিয়ে খাপখোলা বাঁকা তলোয়ার বানিয়ে ছেড়েছেন ডাক্তার বক্সী। টিকালো নাক, বুদ্ধি উজ্জ্বল চোখে কোথায় সেই অতীতের বিভীষিকা?
পেছন পেছন দুর্গা যাচ্ছিল। সঙ্গে আমি।
ও বললে–বড় কষ্ট হচ্ছে। এখন চলি?
যাও, বললাম আমিরাজুর ভার আমার।
দুর্গা আর আসেনি। ভেবেছিলাম পুনর্জন্ম নিয়েছে।
.
রাজুর বিয়ে হল কালকে। মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করতে দেখলাম দুর্গাকে। সূক্ষ্ম দেহে।
পাগলি!
* রহস্য পত্রিকায় প্রকাশিত।
স্যার আর্থার কোনান ডয়ালের গল্প নিয়ে গোয়েন্দা ধাঁধা
পাঁকে পড়েছে পটের বিবি। শার্লক হোমস
মেয়েটার নাম ভায়োলেট হান্টার।
ভায়োলেট হান্টার বাড়ি গিয়ে ছেলেপুলে মানুষ করার চাকরি করত। কিন্তু কিছুদিন হাতে কাজ নেই।
এমন সময়ে একটা অদ্ভুত চাকরি এল হাতে। মাইনে তিনগুণ। কিন্তু কাজটা যেন কেমন কেমন। বাচ্ছা মানুষ করতে হবে ঠিকই। দু-বছরের বাঁদুরে বাচ্চা। চটি দিয়ে চটাস-চটাস করে আরশুলা মারতে ওস্তাদ। কিন্তু মাস্টারনিকে মাথার চুল কাটতে হবে কেন? কেন মনিবের মেয়ের জামা পরে এখানে-সেখানে বসে থাকতে হবে?
ঝাড় মারি অমন চাকরিতে বলে পালিয়ে এল ভায়োলেট। চাকরি আগে না চুল আগে? কিন্তু বাড়ি এসে ভড়ার খালি দেখে মন বলল চাকরি আগে। এল শার্লক হোমসের কাছে। চাকরি নেওয়াটা কি ঠিক হবে?
আইবুড়ো হোমস বললে–মোটেই না।
আমতা আমতা করে ভায়োলেট বললে কিন্তু আমার যে অভাবের সংসার। বরং বেগতিক দেখলে ডেকে পাঠাব। আসবেন তো?
রাজি হল হোমস।
.
পনেরো দিন পরে ডাক এল। অমুকদিন এগারোটায় ব্ল্যাক সোয়ান সরাইখানায় আসা চাই।
যথাসময়ে দুই বন্ধু এসে পৌঁছল সরাইখানায়। ভায়োলেট সত্যি-সত্যিই মাথার চুল কেটে ফেলেছে। দিন দুয়েক ভালোই কেটেছিল। মনিব ভদ্রলোক চোয়াড়ে হলেও খারাপ ব্যবহার করেননি। মনিবানি তার দ্বিতীয় পক্ষের তরুণী ভার্যা। প্রথম পক্ষের মেয়ে আমেরিকা চলে গিয়েছে নতুন মায়ের সঙ্গে বনিবনা হয়নি বলে। বিরাট বাড়ি। নাম কপারবিচেস। একটা রাক্ষুসে ডালকুত্তা বাড়ি পাহারা দেয় সারারাত। কুকুর দেখবার ভার যার ওপর নাম তার টলার। ভীষণ মদ খায়।
