বললাম–বেঁচে গেল তোমার ছেলে। কিন্তু এভাবে কতদিন ওকে বাঁচাবে?
আপনি ব্যবস্থা করুন ঠাকুর।
ঠাকুর। বেঁচে থাকতে কেউ ঠাকুর বলে ডাকেনি। পাগল বলত সবাই।
বললাম–ঠিক আছে, মা। দেখছি কী করা যায়।
দুর্গার কষ্ট হচ্ছিল। সূক্ষ্মদেহী। অনেক উধ্বস্তর থেকে নেমে এসেছে ছেলের টানে। এখন কষ্ট হচ্ছে। জলের মধ্যে মানুষ ডুবে থাকলে যেরকম কষ্ট হয়, তার চাইতেও বেশি।
বললাম–মা, তুমি যাও। আমি আছি।
আপনার কষ্ট হচ্ছে না?
হলেও যেতে পারছি না, মা। যাও।
দুর্গা চলে গেল। নিশ্চিন্ত মনে আমার পাহারায় ছেলেটাকে সঁপে দিয়ে সে ফিরে গেল ঊর্ধ্বলোকের বিদেহীদের মাঝে।
আমি চেয়ে রইলাম রাজুর মুখের দিকে। অসহায়। বড় অসহায়। বিকারগ্রস্থ হওয়ার ফলে এত বুদ্ধিদীপ্ত হয়েও নির্বোধের মতো আচরণ করে চলেছে। একে টেনে তুলতেই হবে। ঘোর কাটাতেই হবে। অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসতে হবে।
দরজার ল্যাচ-কী ঘুরে গেল। রাজুর বাবা ঢুকলেন ঘরে। শ্রান্ত, ক্লান্ত চেহারা। বয়সে প্রৌঢ়। চোখের তারায় কিন্তু অবসাদ কুঁড়ে বুদ্ধির ঔজ্জ্বল্য ঠিকরে বেরোচ্ছে। যৌবনে ব্যায়ামচর্চার চিহ্ন এখনো রয়ে গেছে বাহু আর বুকের পেশিতে। লম্বা চুল উস্কখুস্ক। জুলপি পেকে সাদা। সরু গোঁফও বিলকুল রূপোলি।
ঘরে ঢুকেই ভদ্রলোক এদিক-ওদিক তাকালেন। ছেলেকে দেখতে পেলেন না। নিমেষে আতঙ্ক ঘনিয়ে এল দুই চোখে। ছুটে গেলেন রান্নাঘরে, তারপর কলতলায়। ছেলে কোথাও নেই। উদ্ভ্রান্তের মতে ফের দৌড়ে ঘরে ঢুকলেন বড় ঘরে। ছেলে অনেক সময় খাটের তলায় লুকিয়ে ভয় দেখায় বাবাকে। তাই খাটের তলায় হেঁট হয়ে উঁকি দিলেন। ট্রাঙ্ক আর কার্ডবোর্ড বাক্স বোঝাই থাকায় খাটের ওদিক পর্যন্ত দেখতে পেলেন না। উঠে দাঁড়িয়ে খাট ঘুরে এদিকে আসতে যাবেন, এমন সময় চোখে পড়ল সিলিং থেকে লাকলাইন দড়ি ঝুলছে। দড়ি নেমে গেছে খাটের ওপাশে মেঝে পর্যন্ত।
মেঝেতে শুয়ে রাজু। অজ্ঞান। বুকের ওপর দুহাতে জড়িয়ে মায়ের বাঁধানো ফটোগ্রাফ–যে মাকে ওর মনেই নেই।
গলায় দড়ির ফাঁসের দিকে চেয়ে রইলেন ওর বাবা। সেকেন্ড খানেক। বিপদ অনেক মানুষের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব জাগিয়ে তোলে। এই ভদ্রলোকের ক্ষেত্রে তাই ঘটল। নিমেষে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে রাজুর শিথিল একটা হাত তুলে নিয়ে মণিবদ্ধে আঙুল টিপে দেখলেন–নাড়ি আছে। ফটোটা বুক থেকে নিয়ে রাখলেন ড্রেসিং টেবিলে। গলা থেকে ফাঁস ফুলে বগলের তলায় হাত দিয়ে মেঝের ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে এলেন খাটের এদিকে। দুহাতে ছেলেকে তুলে শুইয়ে দিলেন খাটে। দৌড়োলেন রাস্তার ওপার থেকে ডাক্তারকে ডেকে আনতে।
ডাক্তার এলেন সঙ্গে সঙ্গে। সব শুনে বললেন–এ কেস অফ সিজোফ্রেনিয়া। মেন্টাল হোমে ট্রান্সফার করুন ইমিডিয়েটলি।
সিজোফ্রেনিয়া? সন্দেহ হল আমার। রাজুর মগজের ভেতর এইমাত্র টহল দিয়ে এলাম আমি। এলোমেলো চিন্তার দুঃসহ টানাপোড়েন ছাড়া তো কিছুই চোখে পড়েনি। সিজোফ্রেনিয়া নামক উন্মত্ততার বিকৃতি তো কোনও কোষে দেখিনি–অবশ্য কোটি কোটি নিউরণের সবগুলো আর দেখা হয়নি। তবুও
ডাক্তার বিদায় নিতেই টেলিফোন তুললেন পলাশবাবু। ব্যবস্থা হয়ে গেল বালিগঞ্জের একটি মেন্টাল হোমে। রাজু তখন কলতলায়–শুনতে পেল না–জানতেও পেল না অন্যায়ভাবে তাকে পাঠানো হচ্ছে পাগলা গারদে!
ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে দুহাতে মাথা টিপে ধরেছেন পলাশবাবু। পাঁচদিন বয়স থেকে যাকে একটা দিনের জন্যেও কাছ ছাড়া করেননি–আজ তাকে পাঠাচ্ছেন পাগলা গারদে–
রাজু পাগল। এইজন্যেই কি তিনি বিয়ে করলেন না দ্বিতীয়বার? ছেলের জীবনে কোনও অন্তরায় আসুক, তা তিনি চাননি। কিন্তু পরিণাম?
ঠিক এই সময়ে, পলাশবাবুর এই বিহ্বলতার সুযোগে ঢুকে গেলাম তার মগজের কন্দরে–
বললাম–বিয়ে করিনি, ভালোই করেছি। ছেলেটা সৎ-মার হাতে পড়ত। নির্ঝঞ্ঝাট থাকতে গিয়ে আরও ঝাট বাড়ত।
বললাম–ডাক্তার বলুক গে, পাগলাগারদে ছেলেকে দেওয়া ঠিক হবে না। সেখানে পাঁচ রকম পাগলের মতো একেও পাগলের ট্রিটমেন্ট দেওয়া হবে। ইলেকট্রিক শক দেবেই ঝামেলা কমানোর জন্যে। ব্রেনসেল নষ্ট করে দেবে। খামোকা ছেলেটাকে মগজের শক্তি কমিয়ে দেওয়াটা ঠিক নয়।
পুনরুক্তি করে গেলেন পলাশবাবু। ভাবনাগুলো যেন তাঁরই।
এইভাবেই চলল মগজ ধোলাই। পলাশবাবুর মগজটিও বেশ। আধ্যাত্মিক চিন্তায় ভরপুর। বিশুদ্ধ। পবিত্র পরিবেশ। সৎ চিন্তা, সৎ সঙ্গ আর সৎ কথা তার মগজের এহেন উচ্চাবস্থা এনেছে। যেটুকু দ্বিধা, সংশয়, দিশেহারা অবস্থা এসেছিল, আমি তা কাটিয়ে দিলাম মগজে অধিষ্ঠান করে।
ফলটা কিন্তু নাটকীয় করতে চাইনি ইচ্ছে করেই। রাজুকে বাঁচাবো কথা দিয়েছি দুর্গাকে। তাই সইয়ে সইয়ে পলাশবাবুকে তৈরি করতে হয়েছে। কখনো রাজুর মগজেও প্রবেশ করেছি–তার দানবিক সত্তাকে রুখে দিতে। তার মাথায় যখন খুন চেপেছে, হিংস্র চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে সাইকেলের পাম্পার হাতে নিয়েছে পেটাবে বলে, আমি তখন পলাশবাবুকে ছেড়ে তার মধ্যে ঢুকে মহাবিপর্যয় রুখে দিয়েছি।
কিন্তু হঠাৎ একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটল যার পর আমাকে ভাবতে হল অন্য পন্থা।
বেশ ছিল বাপবেটায়। নতুন স্কুলেও ভর্তি হয়ে গেছে। স্কুল খুললেই নতুন বন্ধুদের সঙ্গে হই-চই করার স্বপ্নে বিভোর রাজু। নতুন জামা-প্যান্ট-জুতো-বই এসে গেছে। দুর্গার মুখে হাসি ফুটেছে। ও তো দেখছি রোজই রাত্রে আসে। ছেলের মাথার কাছে চুপটি করে বসে থাকে। রাজু ঘুমিয়ে পড়লেই ওর সূক্ষ্ম দেহের সঙ্গে কত কথাই না বলে।
