হাসলাম। জবাব দিলাম না।
মেয়েটির চোখমুখ তখন জ্বলজ্বল করছে। কতই বা আর বয়স হবে। বড় জোড় চব্বিশ। মৃত্যুকালে যে বয়স ছিল, এখনও তা রয়ে গেছে। পরমা সুন্দরী। যেমন রং, তেমনি মুখের গড়ন। দীর্ঘাঙ্গী। চোখদুটো সবচেয়ে সুন্দর বড় বড়। গভীরভাবে আচ্ছন্ন।
বলল আকুল কণ্ঠে–ঠাকুর, আমার ছেলেটাকে ভালো করে দেবেন?
ঠাকুর! হেসে ফেললাম আমিঠাকুর বললে কেন আমাকে?
ওইরকমই যে দেখতে আপনাকে। বলুন না, ভালো করে দেবেন ছেলেটাকে?
কী হয়েছে ওর?
ভেবে ভেবেই বোধহয় পাগল হয়ে যাচ্ছে। ওই দেখুন…ওই দেখুন।
দেখলাম ছেলেটা উঠে দাঁড়িয়েছে। স্কিপিং-এর দড়িটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। চোখদুটো বিষণ্ণ। মায়ের ছবির দিকে তাকাচ্ছে আর দড়িটাকে টেনে টেনে দেখছে কত শক্ত।
মতলবটা বুঝলাম। বললাম–ওর বাবা কোথায়?
কাজে বেরিয়েছে। রাত হবে ফিরতে। তার মধ্যেই দেখুন…ওই দেখুন ওই দেখুন..!
ছেলেটা মায়ের ফটো তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে কাঁদছে। দু-গাল বেয়ে জল গড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে পাশেই বাবার ছবির দিকে। কিন্তু কী আশ্চর্য। সে চোখে বিদ্বেষ! বিজাতীয় ঘৃণা।
বাপকে একদম সইতে পারে না দেখছি, বলেছিলাম আমি।
অথচ বাপকেই সবচাইতে ভালোবাসে। আমার চাইতেও। হঠাৎ ওর অখণ্ড বিশ্বাসে ঘা লেগেছে। খণ্ড খণ্ড হয়ে গেছে বাবার ওপর অগাধ বিশ্বাস। ও আজ তাই দিশেহারা।
বিশ্বাস ভাঙল কেন? দেখলাম ছেলেটা দড়ি নিয়ে আবার টেনে টেনে দেখছে। খালি গা। প্রদীপ্ত চোখে বিকার ভাব। অস্থির। মাথার মধ্যে যেন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।
ওর মামা কানে বিষ ঢেলেছে। নিজেদের দোষ ওর বাবার ঘাড়ে চাপিয়েছে। বলেছে, তোর বাবা তোর মাকে মেরে ফেলেছে।–একী–একী করছিস রাজু।–ঠাকুর-ঠাকুর! ওকে বাঁচান!
মায়ের চিৎকার ছেলে শুনতে পাবে কেন? একজন ইহলোকে, আর একজন পরলোকে। কিন্তু ছেলের কাণ্ড দেখে মায়ের সে খেয়াল নেই। আর্তকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠেছে–বাঁচান! বাঁচান! ঠাকুর, ওকে বাঁচান।
খাটে উঠে পড়েছে রাজু। স্কিপিং দড়ির একটা প্রান্ত বেঁধেছে সিলিংয়ে লাগানো হুকে। অন্য প্রান্তে একটা ফাস তৈরি করেছে।
গলায় দড়ি দেওয়ার মতলব। কাঁদছে ওর মা। হাওয়া-শরীর নিয়ে ছেলেকে আটকাতে পারছে না। ঘর ফাঁকা। দরজায় ল্যাচ দেওয়া। চাবি নিশ্চয় বাবার কাছে। তিনি না ফিরলে এ ছেলের আত্মহত্যা কেউ রোধ করতে পারবে না। কিন্তু আমি পারব।
চনমন করে উঠল আমার বিদেহী সত্তার শক্তিকেন্দ্রগুলো। দ্রুত হ্রস্ব স্বরে শুধোলাম ব্যাকুল-নয়না মেয়েটিকে–নাম কী তোমার, মা?
দুর্গা। রাজু। রাজু। লক্ষ্মী ছেলে আমার–ধীর হ। মাথা ঠান্ডা কর।
রাজু ততক্ষণে দড়ির ফাঁস গলায় দিয়েছে। আমি আর দেরি করলাম না। ঢুকে পড়লাম ওর শরীরের মধ্যে। চলে গেলাম একেবারে মস্তিষ্কে। যেখানে দশ হাজার কোটিরও বেশি নিউরণ পরিপাটিভাবে সাজানো রয়েছে। ন-হাজার কোটি এখনও নিষ্ক্রিয়। সারা জীবন জানতে চেয়েছি এই ন-হাজার কোটি নিউরনের কাজ কী। কেন তাদের সৃষ্টিকর্তা ভরে দিয়েছেন করোটির মধ্যে। নিশ্চয় উদ্দেশ্য আছে। নিষ্ক্রিয় নিউরণদের সক্রিয় করলে কী কী ঘটতে পারে, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আর ধ্যানের মাধ্যমে তা জানতে চেয়েছি–পেরেছিও।
প্রবেশ করলাম এই নিষ্ক্রিয় নিউরণের রাজ্যে। থাকে থাকে সাজানো কোটি কোটি পুঞ্জীভূত রহস্য। প্রতিটি নিউরণ এক একটি অন্তহীন প্রহেলিকা। শক্তি কেন্দ্র। অসীম শক্তির ভাণ্ডারকে করোটির মধ্যে নিয়ে মানুষ কত অসহায়…ভাবে বুঝি মাত্র পাঁচটা ইন্দ্রিয়ই তার একমাত্র সম্বল। এই পাঁচ ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য জগৎ ছাড়া অন্য আর কিছুই মানতে চায় না। মূর্খ! মূর্খ!
নিউরণ-লোকে বিচরণ এই আমার প্রথম নয়। ধ্যানের শক্তি নিয়ে আমি কোটি কোটি প্রহেলিকাদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাদের চরিত্র জেনেছি, তাদের কাজ জেনেছি, অলৌকিক কাণ্ডকারখানার আধারদের প্রয়োজনমতো সক্রিয় করে তুলে অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার মন্ত্রগুপ্তি আয়ত্ত করেছি।
রাজুর নির্মল মস্তিষ্কে প্রবেশ করেই টের পেলাম দোটানার প্রচণ্ড আলোড়ন চলছে। নিউরণদের মধ্যে দিয়ে যেন ঝড় বয়ে চলেছে। আবেগের এই প্রভঞ্জন ধেয়ে আসছে একদিক থেকেই–একগুচ্ছ নিউরণ-কেন্দ্র থেকে–ভুল ধারণা মৌরসীপাট্টা গেড়ে বসেছে যেখানে।
অনেক কিছুই করা যায় এখন। কিন্তু সে সময় তো নেই। প্রথমেই ওর অসুস্থ চিন্তাধারায়। যে প্ল্যানটা ছকে রেখেছে, সেটাকে ভণ্ডুল করে দিতে হবে। ওর চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি, মায়ের ছবিটা বুকে ধরে কাঁদতে কাঁদতে সিধে হয়ে দাঁড়াল। এরপর ওর ইচ্ছে চেয়ারটাকে টেনে তার ওপর দাঁড়িয়ে দড়িটাকে ছোট করে নেওয়া। যাতে চেয়ার থেকে লাফিয়ে পড়লে গলায় এঁটে যায়।
ঠিক এই জায়গাটাতেই কয়েকটা নিউরণকে অসাড় করে দিলাম। দড়ি ছোট করার কথা ভুলে গেল রাজু। খাটে উঠে দাঁড়িয়ে লাভ দিতেই দড়িটা আলগা হয়েই রইল। আরও কয়েকটা নিউরণকে নিষ্ক্রিয় করে দিলাম–যাতে উপস্থিত বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। রাজু মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে গলায় দড়িটা টেনে টেনে বসাতে লাগল। কাঁদছে। হিস্টিরিয়া এসে গেছে। অজ্ঞান হয়ে গেল। গাজলা বেরোচ্ছে ঠোঁটের কষ বেয়ে।
বেরিয়ে এলাম। দুর্গা আতঙ্কঘন চোখে তাকিয়ে ছেলের দিকে।
