কিছুদিন পরেই আবার আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন মিসেস মোলার। মৃত্যুর ঠিক আগে তাঁর কাছে একটা চিঠি লিখেছিল ভ্যানউইক। চিঠিখানা আমার হাতে দিলেন উনি।
বোন লুইসা,
ক্ষমা চাওয়ার জন্যে তোমার কাছে যেতে পারছি না আমি। যে শোক তোমায় দিয়েছি জানি না তার কোনও ক্ষমা আছে কিনা। বোন, আমিই খুন করেছি তোমার ছেলেকে। যিশুর দোহাই আমাকে ক্ষমা করো।
স্বীকার করছি, অকারণে তার জীবন-প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছি আমি। যেখানে তাকে খুন করেছিলাম, আমার কোনও টাকাকড়িই পোঁতা ছিল না সেখানে। এই প্রথম আদালতে কেস জিতলাম আমি। আগাগোড়া ডাহা মিথ্যে বলেছি আমি। অন্যান্য কেসে সত্য বলেছিলাম বলেই শাস্তি পেয়েছি বার বার।
নিছক টাকার লোভেই দ্বিতীয় খুনটা করে ভ্যানউইক! বিক্রয়দলিল জাল করে টাকারের খামারবাড়ির মালিক হয়ে বসার মতলবেই ভদ্রলোককে সরিয়ে দেয় পৃথিবী থেকে। লাশটাকে ফাটলের মধ্যে কবর দেওয়ার পর ধারণা ছিল শত চেষ্টা করলেও তা উদ্ধার করা কারোর পক্ষেই সম্ভব হবে না। একটা খুন করে অনায়াসেই যখন বুড়ো আঙুল দেখাতে পেরেছে সে আইনের রক্তচক্ষুকে, তখন আরও একটা করলেই বা ধরছে কে?
ভাগ্নে নিধনের মোটিভ পরিষ্কার হয়ে যায় যদি ধরে নেওয়া যায়–সত্যি সত্যিই সে বিশ্বাস করত যে মোলার তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে আগের চুরির ব্যাপারে। লুকোনো চোরাই টাকা উদ্ধারের অ্যাডভেঞ্চারে একসঙ্গে দুজনের যাওয়া থেকেই এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে আগের চুরির ব্যাপারে মোলারেরও হাত ছিল। শেষ মুহূর্তের অনুতাপের দহনে জ্বলতে জ্বলতে ভ্যানউইক ভাগ্নের নাম মুছে দিয়েছিল এ কলঙ্ক কাহিনি থেকে। বোনকে এই বলে সান্ত্বনা দিয়েছিল, তার ছেলে এমন কোনও জঘন্য কাজ করেনি যে তার জন্যে লজ্জিত হতে হবে পরিবারের আর সবাইকে।
অসুন্দর পথে নোংরা জীবন-পর্বে বোধ করি এইটাই তার একমাত্র সুন্দর কীর্তি।
* উইলিয়াম বিনী (দঃ আফ্রিকা) রচিত কাহিনি অবলম্বনে।
পরশ পাথর
ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম অনেক মাস, অনেক বছর। সঙ্গে আছে আরো অনেকেই। দিশেহারা। উদ্দেশ্যহীন।
কিন্তু আমার মতো ম্যজিক জানে না কেউ। জাদুমন্ত্র আমার সূক্ষ্ম সত্তায়। আমি চাইলে অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু ইচ্ছে নেই।
পৃথিবীর আকর্ষণ বড্ড বেশি। প্রবল। মাঝে-মাঝে দূরের ওই গ্রহনক্ষত্রের দিকে ছিটকে গেছিলাম বটে, কিন্তু প্রচণ্ড আকর্ষণ আমাকে টেনে নামিয়ে এনেছে। বনে জঙ্গলে, পাহাড়ে গুহায়, মন্দির কাঠ গির্জায় মসজিদে ঘুরে ঘুরে বেড়াই। এই সব জায়গাই আমার বেশি ভালো লাগে।
পগাড়ে নালায়, পোড়োবাড়ি আর বাঁশঝাড় নিমগাছে যারা ঘোরে, মায়া হয় ওদের দেখে। একেবারেই শক্তিহীন। যতদিন বেঁচেছিল, শুধু নাওয়া খাওয়া, টাকা রোজকার আর ভোগবাসনা নিয়েই মেতে থেকেছে। ব্রহ্মাণ্ডের অসীম শক্তিদের শরীরের আধারে সঞ্চয় করার কোনও চেষ্টা করেনি।
আমি করেছিলাম। বছরের পর বছর ল্যাবরেটরিতে সাধনা করেছি। হিমঠান্ডায় পাহাড়ের গুহায় অজানাকে জানতে চেয়েছি। শক্তি পেয়েছি। অকল্পনীয় শক্তি।
কিন্তু অত শক্তিকে ধরে রাখার মতো শরীর আমার ছিল না। রক্তমাংসের শরীর জীর্ণ করে দিয়ে আমার মূল সত্তাকে আঁকড়ে ধরে ধারণাতীত শক্তিরা বেরিয়ে এল বাইরে। মূল সত্তার বিনাশ নেই, জরা নেই, ক্ষয় নেই। জাদুবলে বলীয়ান এই সত্তা আবার নবদেহে প্রবিষ্ট হতে পারে। কিন্তু আমার ইচ্ছে নেই।
না, ইচ্ছে নেই। লাভ কী?
কিন্তু মায়া হল ছেলেটিকে দেখে। কতই বা আর বয়স। বড়জোর চোদ্দো। ভারি সুন্দর চেহারা। চোখদুটো বড় বড়। টকটকে ফর্সা রং। মাথায় বেশ লম্বা। একমাথা হালকা চুল।
সবচেয়ে ভালো লেগেছিল ছেলেটার চোখের চাহনি। দিঘির মতো টলটলে, কালো। সমুদ্রের মতো অতলান্ত। আকাশের মতো অসীম, প্রশান্ত।
অথচ এই চোখই কখনো কখনো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। হিংস্রতায় নিষ্করুণ হয়ে ওঠে। তখন তার দিকে চাওয়া যায় না।
ঠিক এই সময়েই কিন্তু গভীর চোখে তার দিকে চেয়েছিল তার মা। তন্ময় চাহনি। ব্যথা যেন ঝরে পড়ছে দুই চোখে।
মা বলে ঠিকই চিনেছিলাম আমি। ড্রেসিং টেবিলের ওপরেই রয়েছে যে তার ফটোগ্রাফ। ছেলেটি আত্মনিমগ্ন সেই ফটোর পানে চেয়ে। চোখ, চিবুক, মুখের গড়ন একই রকমের।
ছবির মা কিন্তু সামনেই দাঁড়িয়ে। ছলছল চোখে চেয়ে রয়েছে ছেলের দিকে।
আমি যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছি, সে তখনও তা দেখেনি। ছেলেটির দেখবার কথা নয়। কিন্তু মা তো দেখবে। কিন্তু যার সমস্ত মনপ্রাণ জুড়ে রয়েছে ওই ছেলে, সে পাশের দিকে তাকাবে কখন?
মৃদু স্বরে জিগ্যেস করেছিলাম–কী হয়েছে?
ভীষণ চমকে উঠল ছেলের মা। আমাকে দেখেই বিস্ময়ভরা চোখদুটোয় ফুলে উঠল নিবিড়। বিস্ময়-কে আপনি?
তোমারই মতো একজন। দেহত্যাগ করেও ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। পৃথিবীর মায়া আর কাটাতে পারছি না।
আপনারও ছেলে আছে নাকি?
না। কেউ নেই আমার।
তবে?
কীসের আকর্ষণে আটকে আছি পৃথিবীতে, এই তো? হয়তো মাটির আকর্ষণ…অথবা হয়তো আমাদের মতোই যারা দুঃখ শোকে অধীর, তাদের ছেড়ে যেতে পারছি না বলেই…।
আপনি কি সাধু ছিলেন?
লম্বা দাড়ি দেখে বলছ? হাসলাম আমি–চুলদাড়ি কাটবার সময় পেতাম না–তাই।
শুধু দাড়ি নয়, ছেলের মা আমার চোখের দিকে ঘাড় বেঁকিয়ে তাকিয়ে–আপনার মতো সৌম্য বিদেহী আজ পর্যন্ত দেখিনি। ঋষির মতোই চেহারা আপনার, বলতে বলতে হঠাৎ দু-চোখে আশার আলো জ্বলে ওঠে মেয়েটির–আপনিই কি সেই সব অদৃশ্য সহায়দের একজন যারা মরণের পরেও মানুষের উপকার করে যান নানাভাবে?
