এরপর আবার অভিনয় করে দেখানো হল সেই শোচনীয় দুর্ঘটনা। গর্তের মধ্যে নেমে গাঁইতি তুললে ভ্যানউইক। আর, কিনারায় বসে রইল তার কৌন্সলি নিহত মোলার যে অবস্থায় বসেছিল হুবহু সেইভাবে। ফটোগ্রাফ নেওয়া হল এই দৃশ্যের এবং দেখা গেল শূন্যে আন্দোলিত গাঁইতির ফলাটা বাস্তবিকই আঘাত হানছে কিনারায় ঝুঁকে-বসা মানুষটার এমন একটা স্থানে যেখানে চোট পাওয়ার পরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে হতভাগ্য জন মোলার।
আগাগোড়া সমস্ত দৃশ্যটা দেখে ডাক্তারও বললেন যে বাস্তবিকই মোলারের পতন এবং মৃত্যুটি নিছক দুর্ঘটনা ছাড়া হয়তো আর কিছুই নয়। বললেন–আমার তো মনে হয় তা খুবই সম্ভব। জ্যাকেট ছেদা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঠিক ওই জায়গাতেই মারাত্মক চোট পেয়েছে মোলার। আর তার পরেই ভ্যানউইক যেভাবে দেখাল, ঠিক ওইভাবেই সে তাল সামলাতে না পেরে গড়িয়ে পড়েছে গর্তের মধ্যে।
মোজা ফেলে যাওয়া অথবা ডোবার মধ্যে গাঁইতি আর কোদাল রেখে যাওয়ার রহস্য কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারেনি ভ্যানউইক। জিনিসগুলো বলা ওর পক্ষে সম্ভব নয় এই কারণে যে তখনও নাকি ওর মনের আচ্ছন্নতা কাটেনি এবং সে সময়ে কি করেছে না করেছে তার বিন্দুমাত্র মনে নেই ওর। কিছুদিনের জন্যে মানসিক চিকিৎসালয়ে থাকতে হয়েছিল ভ্যানউইককে। কাজেই মোলারের মৃত্যুর রাতেও যে সে স্মৃতিহীনতায় আক্রান্ত হয়েছিল, তা বোঝা গেল ওর কাহিনি থেকে। মনোসমীক্ষকেরাও সমর্থন জানালেন এ কাহিনি শুনে। তাঁরা বললেন, ওই রকম অবস্থার মধ্যে পড়লে তার পক্ষে স্মৃতি হারিয়ে ফেলা খুবই সম্ভব।
এ কেস যে শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা যাবে না এবং সাফল্য যে এক রকম অসম্ভব তা প্রতিবাদী পক্ষের বিপুল তোড়জোড় দেখেই বুঝলাম। ১৯৩০ সনের ২১ অক্টোবর ফ্রি স্টেটের বিচারপতি-সভাপতি স্যার ইটিন ভিলিয়ার্স এবং ব্লুমফনটিন ক্রিমিন্যাল সেশনের জুরির সামনে হাজির করা হল ভ্যানউইককে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অম্লানবদনে সে বললে অ্যাডভেঞ্চার করতে বেরিয়ে দুর্ঘটনায় মারা গেছে মোলার। বিশেষজ্ঞ সাক্ষীদেরও ডাকা হল তার এই কাহিনিকে সমর্থন জানানোর জন্যে।
অভিযোগ সমর্থন করার জন্যে উঠে দাঁড়িয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মিঃ ডব্লিউ. জি. হোল. কে. সি. বললেন, ভ্যানউইকের বর্ণনা মতো কিনারায় বসে ঝুঁকে পড়ে জলের কল দেখা মোলারের পক্ষে একেবারেই সম্ভব নয়। তাছাড়া, কাহিনির সত্যতা প্রমাণের জন্যে যে ফটোগ্রাফ তোলা হয়েছে। সেগুলিও সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়। কেননা, ফটোগ্রাফার নিজেও স্বীকার করেছে ক্যামেরা একপাশে সরিয়ে বিশেষ এক কোণ থেকে তোলা হয়েছিল ছবিগুলো। কাজে কাজেই কাহিনির সত্যতা প্রমাণিত হওয়া দুরে থাকুক, সম্পূর্ণ মিথ্যা একটা ধারণাই প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস রয়েছে এসব ছবির মধ্যে। যেভাবে মোলার ঝুঁকে বসেছিল কিনারার ওপর এবং যেভাবে শূন্যে আন্দোলিত গাঁইতিটা এসে পড়েছিল তার পিঠের ওপর–তা কৌশলে তোলা ছবি দিয়ে সৃষ্ট চোখের ধাঁধার জন্যেই সম্ভবপর বলে মনে হতে পারে–প্রকৃতপক্ষে তা একেবারেই অসম্ভব। এ শুধু ক্যামেরার বাহাদুরি ছাড়া আর কিছুই নয়।
ঘণ্টা তিনেক পরে জুরিরা ফিরে এসে রায় দিলেন আসামী নির্দোষ। বুক ফুলিয়ে কাঠগড়া থেকে নেমে এল ভ্যানউইক। আইনের প্রহসনে এতটুকু আঁচড়ও লাগল না তার দেহে।
পরের দিন রাস্তায় দেখা হয়ে গেল একজন জুরির সঙ্গে। আমাকে দেখেই পথের ওপরেই তিনি দাঁড় করালেন আমাকে। তারপর, যেন দারুণ অন্যায় করেছেন, এমনিভাবে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিমায় বললেন–এ ছাড়া আর কী করার ছিল বলুন? ভেবে দেখলাম, বিচারপতি নিজেই ওকে খালাস দেওয়ার পক্ষপাতী। তাই তাঁর বিরুদ্ধে যাওয়া সঙ্গত মনে করলাম না আমরা।
উত্তরে আমি বললাম–লিখে রাখতে পারেন, আজ থেকে ছ-মাসের মধ্যে আরও একটা খুনের অপরাধে ভ্যানউইককে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। দ্বিতীয়বার আর পিছলে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না ওর পক্ষে। তবে তার আগে আরও একটা প্রাণ নষ্ট হবে, এই যা দুঃখ।
তিনমাস পরে আর একটা নৃশংস হত্যার খবর এল। নিহত ব্যক্তি জাতিতে ব্রিটিশ। নাম সিরিল প্রিগ টাকার। ট্রান্সলে প্রিটোরিয়ার কাছে অ্যাপলেডুর্নয়ে একটা খামারবাড়ির মালিক সে। তারই বাড়ির কাছে মাটির মধ্যে থেকে উদ্ধার করা হল তার দেহ। একটা বাক্সের মধ্যে লাশটা ঠেসে পুঁতে রাখা হয়েছিল একটা বড় ফাটলের মধ্যে। যে হাতুড়ি দিয়ে তাকে পিটিয়ে মারা হয়েছিল, রক্তমাখা সেই হাতিয়ারটাও ওয়াগন-হাউসের মধ্যে কাঠের গাদার নীচে পাওয়া গেল।
সন্দেহভাজন হত্যাকারীর চেহারার বিবরণ ছড়িয়ে দেওয়া হল দেশময় পুলিশের দপ্তরে দপ্তরে। ছোটখাটো মানুষটি, টাক মাথা, ঝুলে পড়া গোঁফ। সম্ভবত ফ্রি স্টেটেরই বাসিন্দা সে। টাকারের সঙ্গে খামারবাড়ি কেনা সম্পর্কে কথাবার্তা চলছিল তার।
আমার ভবিষ্যত্বাণী অর্ধ সময়ের মধ্যেই অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। এবার কিন্তু মস্তিষ্ক বিকৃতির দোহাই শুনলেন না জুরিরা। পূর্ব-পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত হত্যার রায় দিলেন তাঁরা। মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত হল ভ্যানউইক। শেষ কটা দিন বাইবেল পড়ে এবং ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেই কেটে গেল তার। ১৯৩১ সালের ১২ জুন ফাঁসির দড়িতে দু-দুটো নরহত্যার প্রায়শ্চিত্ত করে গেল সে।
