ইতিমধ্যে আমার অনুচরেরা ওয়াটারভালে একটা শিয়ালের গর্তের হদিশ পেল। সম্প্রতি খোঁড়াখুঁড়ির চিহ্ন ছিল গর্তটার ওপর। তৎক্ষণাৎ মাটি সরিয়ে ফেলে ওরা এবং আবিষ্কার করে মোলারের কুণ্ডলী পাকানো লাশ। জমি থেকে প্রায় আড়াই ফুট নীচে মাটির মধ্যে মুখ গুজড়ে পড়েছিল দেহটা। জ্যাকেটের পেছনে ছিল একটা ছিদ্র। সে ছিদ্র শরীরের মধ্যেও প্রবেশ করেছে অনেকখানি। তীক্ষ্ণাগ্র কোনও হাতিয়ার দিয়ে চোট মারার ফলেই এই ছিদ্রের সৃষ্টি। ট্রাউজারের বোতাম দুটোও ছিঁড়ে গিয়েছিল কি এক অজানা কারণে।
পোস্টমর্টেমে হাজির থাকার জন্যে মোটর হাঁকিয়ে গেলাম ওয়াটারভালে। মোটামুটি একটা ছাউনির নীচে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল লাশটা। মোমের ল্যাম্প জ্বেলে শুরু হল পরীক্ষা পর্ব। চোকের সামনে বীভৎস দৃশ্য দেখেও নিজেদের সংযত করার বিদ্যে আয়ত্ত করতে হয় পুলিশ অফিসারদের। কিন্তু জন মোলারের সেই ভয়ঙ্কর পরিণতি কোনওদিনই ভোলবার নয়। ডিমের খোলা ফেটেফুটে গেলে যেরকম দেখতে হয়, ঠিক সেইভাবেই ঘেঁতো করা হয়েছিল বেচারার মাথার খুলিকে। আর শিরদাঁড়ার মূলে ওই আঘাতচিহ্নের সৃষ্টি যদি মোলারের জ্ঞান টনটনে থাকার সময়ে করে থাকে, তাহলে যে কি অসীম যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে জ্ঞান লোপ পেয়েছে ওর, তা আর না বললেও চলে!
শিয়ালের গর্তে কিন্তু ধস্তাধস্তির কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কাছাকাছি একটা ডোবার নীচে গাঁইতি আর কোদালটা পাওয়া গিয়েছিল। এস ভ্যান ডবলিউ চিহ্নিত একজোড়া কাদামাখা মোজাও খুঁজে পেয়েছিল গোয়েন্দারা। ব্লুমফনটিনে ফিরে এসে দেখলাম কয়েক ঘণ্টা আগেই খবরের কাগজের আবেদন পড়ে পুলিশ স্টেশনে হাজির হয়েছে ভ্যানউইক।
নির্বিকার মুখে ফাঁড়ির ভেতর লম্বা লম্বা পা ফেলে ঢুকে ডিউটি অফিসারকে বলেছিল ভ্যানউইক–কাগজে পড়লাম আমার সঙ্গে দেখা করতে চান আপনারা। তাই প্রথম ট্রেনেই ফিরে এলাম যদি আপনাদের কোনও কাজে লাগি এই আশায়।
ভ্যানউইককে এরপর জানানো হল যে আর তার সাহায্যের দরকার নেই। কেননা তার ভাগ্নের লাশ খুঁজে পাওয়া গেছে এবং খুনের অপরাধেই এখন তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ডিউটি অফিসারের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ছিল যথেষ্ট। তাই ভ্যানউইকের কাছ থেকে তখুনি কোনও বিবৃতি নিতে সরাসরি অস্বীকার করলেন তিনি। তার কারণ সেই মুহূর্তেই যদি বিবৃতি নেওয়া হয় ওর কাছ থেকে তাহলে পরে হয়তো বলপূর্বক বিবৃতি আদায়ের অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারেন তিনি এবং এই এক চালেই ফেঁসে যেতে পারে কেসটা।
অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই শোকাবহ শেষ দৃশ্যটার পূর্ণ অভিনয় করার জন্যে ভ্যানউইককে ওয়াটারভালে নিয়ে যাওয়ার আর্জি পেশ করলেন প্রতিবাদী পক্ষের আইনবিদ। বিচারবিভাগও মঞ্জুর করল সে আর্জি। সাক্ষ্য দেওয়ার জন্যে একজন ফটোগ্রাফার আর একজন ডাক্তারও গেলেন সেই দলে। শিয়ালের গর্তের কাছে এসে ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন তা বলতে শুরু করল ভ্যানউইক।
আগের বছর প্রতারণার দায়ে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় হুঁশিয়ার ভ্যানউইক একটা বাক্সের মধ্যে তিন হাজার পাউন্ডের নোট ঠেসে বাক্সটাকে লুকিয়ে রেখেছিল বিশেষ একটা গোপন স্থানে। ওয়াটারভালের সেই বিশেষ স্থানটিতে। ওরা যখন পৌঁছোল তখন অমানিশার অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে এক দিগন্ত থেকে আর এক দিগন্তে।
জমির উপরিভাগ থেকে আঠারো ইঞ্চির মধ্যে দুটো গর্ত দেখতে পেলাম আমরা। দুটো গর্তই বুজিয়ে ফেলা হয়েছে মাটি দিয়ে। ঠিক কোন গর্তটিতে যে বাক্সটি লুকিয়েছে তা যখন স্থির করতে পারলাম না, তখন স্থির করলাম দুটোই খুঁড়ে দেখা যাক। বেশ খানিকটা মাটি তুলে ফেলার পর কোদালটা সরিয়ে রেখে গাঁইতি তুললাম। বাক্সের ওপর যে পাথরটা চাপা দিয়ে গিয়েছিলাম, এই পাথরটা চড় দিয়ে উঠিয়ে ফেলার জন্যেই তুলেছিলাম গাঁইতিটা।
এই সময়ে মোলার বললে তার বড় তেষ্টা পেয়েছে। জিগ্যেস করলে কোথায় জল পাওয়া যাবে। বললাম, খানিক দূরেই একটা জলের কল আছে। কলটা দেখার জন্যেই ও যখন ধপ করে বসে পড়ল গর্তের কিনারায় তখনই আচমকা আমার মনে হল গাঁইতি তোলার সময়ে হয়তো অজান্তে ওকে জখম করে ফেলেছি আমি। পেছন ফিরে দেখি টলমল করছে ও কিনারার ওপর। গাঁইতি ফেলে ওকে ধরতে গেলাম আমি কিন্তু তার আগেই মাথা নীচের দিকে করে পড়ে গেল ও গর্তের মধ্যে। এবং পড়ল আমারই ওপরে। সামলাতে না পেরে আমিও ছিটকে পড়লাম একদিকে। কানে ভেসে এল শুধু একটা ধপাস শব্দ।
কান খাড়া করেও যখন আর তার কোনও শব্দ শুনতে পেলাম না তখন গর্তের মধ্যে হাতড়াতে হাতড়াতে খুঁজে পেলাম ওর নেতিয়ে পড়া দেহ। মাথার নীচেই পড়েছিল গাঁইতিটা। দেখলাম। বড় মারাত্মক জখম হয়েছে বেচারি। আর, তার পরেই অন্ধকার হয়ে গেল সব কিছু। এর পরে যে কি হয়েছে তা এখনও মনে করতে পারছি না আমি। এই শোচনীয় পরিণতির আকস্মিকতার আঘাত বোধহয় সামলাতে পারিনি তাই লোপ পেয়েছিল চেতনা।
এরপর কী কী ঘটনা মনে পড়ে তোমার? প্রশ্ন করেন মিঃ এফ. পি. ডি. ওয়েট–কয়েদির কৌন্সলি।
গাড়ির কাছে আবার ফিরে আসার পরেই চেতনা ফিরে আসে আমার। মাথা ঘুরছিল। ইচ্ছে হয়েছিল গলা ছেড়ে আর্ত চিৎকার করি, ঈশ্বরের কাছে আবেদন জানাই যেন আমাকেও শেষ করে ফেলেন তিনি এইভাবে। গাড়ির মধ্যে উঠে বসেছিলাম তারপর। গাড়িতে স্টার্ট দেওয়ার পর ভাবলাম, অনেক…অনেক দূর চলে যেতে হবে আমায়, তা না হলে শান্তি পাব না আমি।
