কিন্তু এ যুক্তিতে সান্ত্বনা পাবার পাত্রী নন মিসেস মোলার। বললেন–আমার ভাইকে নিশ্চয় আপনি চেনেন না। অপরাধের ইতিহাস আছে তার জীবনে। শেষবার পুলিশের হামলায় জড়িয়ে পড়ার সময় কাকে জানি ও বলছিল আমার ছেলেই নাকি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তার সঙ্গে। যদিও সম্পূর্ণ অসত্য এই অভিযোগ, তবুও ও শাসিয়ে ছিল জেল থেকে একবার খালাস পেলেই জনকে শায়েস্তা করে ছাড়বে সে। মাত্র এক হপ্তা হল জেলের বাইরে পা দিয়েছে ও।
মিসেস মোলার বিদায় নেওয়ার পর তাঁর গুণধর ভাইয়ের পুরোনো রেকর্ড ঘাঁটতে বসলাম। ভায়ার নাম স্টিফেনাস লুই ভ্যানউইক। ডোসিয়ারটা বার করতেই তার মধ্যে পেলাম সব তথ্য। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স লোকটার। অরেঞ্জ ফ্রি স্টেটের একটা খামারবাড়িতে অতিবাহিত হয়েছে তার যৌবন। এরপর এক শহর থেকে আর এক শহরে টো-টো করে ঘুরেছে স্টিফেনাস। শয়ন করেছে হট্টমন্দিরে এবং ভোজন জুটিয়েছে উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে। সম্প্রতি শ্রীঘর গিয়েছিল কয়েক শো পাউন্ড আত্মসাৎ করার অপরাধে। দীর্ঘ আঠারো মাস ঘানি টানতে হয়েছে বাছাধনকে এ যাত্রা। ধড়িবাজ-শিরোমণি প্রবঞ্চকদের মতোই তার যেমন আত্মপ্রত্যয়ের অভাব ছিল না, তেমনই অভাব ছিল না এন্তার অবিশ্বাস্য গল্পের। এই কারণেই নজরবন্দী রাখা হয়েছিল বটে, সেই সঙ্গে আরও একটি মন্তব্য জুড়ে দেওয়া হয়েছিল রিপোর্টের অন্তে। তার প্রতিভার প্রকৃতি দেখে বিশেষজ্ঞের ধারণা মাঝে মাঝে নাকি মানসিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে তার প্রকৃতিতে।
যে পুলিশ অফিসারের দায়িত্বে তৈরি হয়েছিল এই ডোসিয়ার, তিনি বিশ্বাস করতেন একদিন না একদিন খুনজখম জাতীয় কোনও গুরু অপরাধ করে বসবে ভ্যানউইক। এ জাতীয় সিদ্ধান্তে তিনি এসেছিলেন ভ্যানউইকের ছেলেবেলার ইতিহাস জানার পর। হামেশাই দুটো বেড়ালের লেজে গাঁট বেঁধে ছেড়ে দিত বালক ভ্যানউইক। তারপর শুরু হত চামড়ার চাবুক দিয়ে বেধড়ক পিটানো। তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে শেষনিঃশ্বাস ফেলত অসহায় জীবগুলো। আর তাই দেখে, তাদের চরম বেদনা সমস্ত অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করে আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠত খুদে ভ্যানউইক।
আরও অনেক তথ্য পাওয়া গেল ডোসিয়ারে। অনর্গল কঁচা মিথ্যে কথা বলায় তার নাকি জুড়ি নেই। বলার ধরনটিও বড় মার্জিত এবং ভদ্র। এই মহাগুণটি তার ছিল বলেই নাছোড়বান্দার মতো লেগে থেকে শিকারের পকেট হালকা করতে তাকে বেশি বেগ পেতে হত না।
মিসেস মোলারের কান্নাকাটির পরেই ব্লুমফনটিনের সুপ্রীমকোর্টে মাস্টারস অফিসে খোঁজখবর নিলাম আমি। এই অফিসেই ক্লার্কের কাজ করত তার ছেলে। দক্ষিণ আফ্রিকায় যে চারটি প্রদেশ আছে, অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট তাদেরই অন্যতম এবং এই প্রদেশেরই রাজধানী হল এই ব্লুমফেনটিন শহরটি। হিরের খনির সুবিখ্যাত কেন্দ্র কিমবার্লি থেকে প্রায় শখানেক মাইল দুরে ছোট এই শহরটায় সে সময় ১৯৩০ সালে, শুধু শ্বেতাঙ্গই ছিল প্রায় ৩০,০০০। ব্রিটেনের সঙ্গে লড়াইয়ে ট্রান্সলের সঙ্গে বুয়োরস-এর রিপাবলিকান গভর্নমেন্ট যোগদান করার পর থেকে উত্তেজনার লেশমাত্রও ছিল না সে শহরে। আইন অনুরাগী নাগরিকদের কেন্দ্র হওয়ার সুখ্যাতি অর্জন করেছিল ব্লুমফনটিন। খুনজখম জাতীয় অপরাধের নামও একরকম ভুলেই গিয়েছিল সবাই।
সুপ্রীমকোর্টের অফিসাররা আমাকে জানালেন যে, দিনকয়েক আগে ভাগ্নের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল ভ্যানউইক। আন্তরিকভাবেই বিস্তর আলোচনা হয় দুজনের মধ্যে। বাইরে থেকে কোনওরকম বিদ্বেষ বা অস্বাভাবিক কিছু দেখা যায়নি ওদের কথায়-বার্তায় আচরণে। ভ্যানউইক বিদায় নেওয়ার পর দারুণ উত্তেজিত হয়ে এক সহকর্মীর কাছে ফলাও করে গল্প করতে থাকে মোলার, যে সে নাকি তার মামার সঙ্গে গুপ্তধন খুঁড়তে বেরোবে শিগগিরই। ব্লুমফনটিন থেকে দেড়শো মাইল দূরে ওয়াটারভালে নাকি মাটির নীচে পোঁতা আছে এই সম্পদ।
জুলাই মাসের বারো তারিখে মামাকে নিয়ে গাড়ি হাঁকিয়ে শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে মোলার। গাড়ির পেছনে ছিল একটা গাঁইতি আর একটা কোদাল। ওয়াটারভালের খামারবাড়িতেই মানুষ হয়েছিল ভ্যানউইক। কাজে কাজেই দুজন গোয়েন্দাকে পাঠিয়ে দিলাম তখুনি যদি কোনও হদিশ পাওয়া যায় এই আশায়। ঘণ্টা কয়েক পরেই এদেরই একজনের কাছ থেকে টেলিফোন এল। সেইদিনই সন্ধ্যার সময়ে খাবার বাড়ি ছেড়ে রওনা হয়েছে ভ্যানউইক আর তার ভাগ্নে। মিসেস সি জে হফম্যান ওই অঞ্চলেই থাকেন। রাতের অন্ধকারে তাঁর বাড়িতে নাকি ভ্যানউইক এসেছিল। গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়েছিল তার। তাই মেরামত করার জন্যে একটা টর্চের দরকার হয়ে পড়েছিল। কিন্তু টর্চ দিয়ে ভ্যানউইককে সাহায্য করতে পারেননি মিসেস হফম্যান। বলেছিলেন, রাতটা যদি তার বাড়িতেই কাটানো মনস্থ করে ভ্যানউইক তাহলে না হয় একটা শয্যার বন্দোবস্ত করে দিতে পারেন তিনি। ভ্যানউইক কিন্তু রাজি হয়নি। আর দেরি না করে যেমন করেই হোক তখুনি নাকি তার যাত্রা আবার শুরু করা দরকার।
ওয়াটারভাল তল্লাসি করার নির্দেশ পাঠালাম ফোন মারফত। তারপর খবরের কাগজের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলাম মোলারের অন্তর্ধান কাহিনি এবং ভ্যানউইককে অনুরোধ জানলাম সে যেন তদন্তে সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে আসে আমাদের পাশে। বহু প্রচলিত এই টোপ যে তাঁকে আকৃষ্ট করবে, এরকম কোনও দৃঢ় বিশ্বাস আমার ছিল না। কিন্তু আশ্চর্য! জোহানেসবার্গ স্টারে খবরটা পড়ামাত্র প্রথম ট্রেন ধরেই সে রওনা হয়েছিল ব্লুমফনটিন অভিমুখে। নিশ্চয় আমাদের বুদ্ধিশুদ্ধি গুলিয়ে গেছে এবং ওকে ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করিনি আমরা–এই ধারণার বশবর্তী হয়েই যে আমাদের ফাঁদে পা দিয়েছিল ও, সে বিষয়ে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই আমার।
