লোকটাকে যখন চিনিই না, তখন ছাপটার বৈশিষ্ট্যটুকু নিয়ে শুধু মাথা ঘামালাম, তার বেশি না। কিন্তু প্রহ্লাদ চক্রবর্তীর পা দেখার সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম, জঙ্গলের মধ্যে যে জুতোর ছাপ দেখেছি, সে জুতো আর ও জুতো একই। অর্থাৎ প্রহ্লাদবাবু জঙ্গলের রাস্তায় হেঁটেছিলেন। সুতরাং সঙ্গের ছড়িধারী কলোকটিকে নিয়ে তৎক্ষণাৎ মাথা ঘামানোর দরকার হয়ে পড়ল। তারপরেই কৃষ্ণদাসবাবু তাঁর ছড়ি হারানোর কাহিনি বললেন। ছড়িটাও দেখালেন। কি দেখলাম জানো? দেখলাম, ছড়িটা যার সে ডান হাতেই ছড়ি ব্যবহারে অভ্যস্ত–প্রমাণ–ফেরুলের বাঁদিক ওয়া। কৃষ্ণদাসবাবু যে ছড়ি পেয়েছেন, তার মালিক ডানহাতে ছড়ি ধরায় অভ্যস্ত। আর জঙ্গলের রাস্তায় যে হেঁটেছে, তার ছড়ির মালিক বাঁ-হাতে ছড়ি ধরায় অভ্যস্ত, একেই বলে কাকতালীয়। এ থেকে কি সিদ্ধান্তে এলাম? প্রহ্লাদবাবুর অজ্ঞাত সঙ্গীটি কৃষ্ণদাসবাবুর টেম্পল চেম্বার্সের অফিসে ইন্টারভিউ দিতে এসেছিলেন অর্থাৎ শীলমোহর দখল করতে যারা উন্মাদ, লোকটি তাদের অন্যতম। কথাটা ভাবার সঙ্গে সঙ্গে আর একটা প্রশ্ন মাথার মধ্যে দেখা দিল–লোকটা কি শীলমোহর নিয়ে যেতে পেরেছে? আয়রনসেফ খুলে দেখলাম পেরেছে।
আয়রনসেফের শীলমোহরটা তাহলে–
নকল।
সর্বনাশ!
খুব যত্ন করে করলেও খুবই খারাপ নকল। ইলেকট্রোটাইপ। চোঙাটার সবদিকে সমতাও রাখতে পারেনি জালিয়াত হত্যাকারী। ব্যাবিলোনিয়ান এক্সপার্ট যে মাপজোক লিখে রেখেছিলেন, তার সঙ্গেও মিললো না, আর মাঝের ফুটোর দু-প্রান্তে মাটি মাখিয়ে ময়লা করলেও মাঝখানটা সদ্য ড্রিলিংয়ের জন্য চক্ চক্ করছিল।
কিন্তু জন মার্টিনই যে জালিয়াত, তা জানলে কী করে?
তখনও আমি সঠিক জানতাম না। তবে অনুমান করেছিলাম। কেননা, জন মার্টিনের কাছে আছে শীলটার গড়ানো ছাপ যা থেকে ইলেকট্রো তৈরি করা সম্ভব। আর চ্যাপ্টা ইলেকট্রো গোল করে চোঙা বানিয়ে নেওয়ার মতো কারিগরি জ্ঞান তার আছে। কিউরিও নকল করায় জুড়ি নেই তার। সব চাইতে বড় কথা, চোরাই শীলমোহর পাচার করার ক্ষমতা তার আছে–কেননা কিউরিও কেনাবেচাই তার ব্যবসা। অবশ্য সবটাই অনুমিতি আর যুক্তিসিদ্ধ সম্ভাবনা। তাই অপেক্ষা করতে লাগলাম সিদ্ধান্তটা বাজিয়ে নেওয়ার জন্যে। জন মার্টিনকে দোকান ঘর থেকে ডান হাতে ছড়ি ধরে বেরিয়ে আসতে দেখেই বুঝলাম। কিস্তিমাত।
শীলমোহরটা যে গোমতেশ্বরের মূর্তির মধ্যে লুকানো ছিল, সেটাও কি অনুমান?
ইন্ডিয়া থেকে আমেরিকায় শীলমোহরের মতো ছোট্ট একটা জিনিস স্মাগল করে নিয়ে যাওয়ায় সব চাইতে নিরাপদ পন্থা হল জিনিসটাকে প্লাস্টার ছাঁচের মধ্যে গেঁথে নেওয়া। আমি এই রকমই একটা কিছু আন্দাজ করছিলাম। মূর্তি দেখে আর সন্দেহ রইল না। হাতে নিয়ে বুঝলাম তখনও ভিজে ভিজে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তৈরি ছাঁচ–প্লাস্টার এখনও শুকিয়ে খটখটে হয়নি। তাই ভেঙে ফেললাম। আমার ভুল হলেও ক্ষতি ছিল না। পাঁচ দশ টাকা দিলে ওরকম ছাঁচ অনেক পাওয়া যায়।
প্রহ্লাদবাবুকে জন মার্টিন কী করে বিষ খাওয়ালো বলো তো?
সেটা এখনো সঠিক জানি না, অনুমান করতে পারি। খুব সম্ভব, সঙ্গে করেই খানিকটা সায়ানাইড সলিউশন নিয়ে গেছিল মার্টিন। সুযোগ বুঝে মিশিয়ে দেবে হুইস্কির গেলাসে। এক চুমুক খেয়েই মিনিটখানেকের মধ্যে শেষ হয়ে গেছেন প্রহ্লাদবাবু। তবে গেলাসটা ধুয়ে তাকে রেখে যাওয়াটা ভুল হয়েছে জন মার্টিনের।
একটা হেঁয়ালির কিন্তু এখনো সমাধান হয়নি। দরজায় ছিটকিনি ভেতর থেকে দেওয়া ছিল। লোকটা বেরোল কী করে?
খুব সহজে। খিলটা ভোলা ছিল। লাগানো ছিল শুধু ছিটকিনি। লক্ষ্য করেছ নিশ্চয় ছিটকিনির ফুটোটা মেঝের ওপর। অর্থাৎ ছিটকিনিটা ঘাঁটি থেকে নামিয়ে মেঝের ওপর রেখেছে জন মার্টিন। তারপর বাইরে গিয়ে দরজা টেনে বন্ধ করে দিতেই ছিটকিনি পড়ে গেছে মেঝের ফুটোয়।
নেবুচানেজারের সোনার শীলমোহরের চাঞ্চল্যকর মামলা অনেক দিন ধরে চলেছিল। শেষ পর্যন্ত ছাড়া পেয়ে যায় আমেরিকান ভদ্রলোক। কিন্তু ফাঁসি হয়ে যায় জন মার্টিনের।
* প্রসাদ (অগাস্ট, ১৯৬৮) পত্রিকায় প্রকাশিত।
নেশা লাগে খুনের স্বাদে
কেঁদে ফেললেন প্রৌঢ়া। বললেন–আমার দৃঢ়বিশ্বাস সাংঘাতিক কিছু একটা হয়েছে আমার ছেলের।
এ ঘটনা যখন ঘটে, তখন আমি ছিলাম ব্লুমফনটিনের অপরাধী তদন্ত বিভাগের চিফ। আমারই অফিসঘরে বসে ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন প্রৌঢ়া-দিন তিনেক আগে আমার ভাইয়ের সঙ্গে গাড়িতে করে কোথায় যায় সে। কোথায় জানি গুপ্তধন খুঁড়ে বার করার মতলব ছিল ওদের। তারপর থেকেই আর কোনও পাত্তা নেই ওদের। বুঝতেই পারছেন আমার মনের অবস্থাটা।
ভদ্রমহিলা যে কার্ড পাঠিয়েছিলেন, তাতে তার নাম লেখা ছিল মিসেস লুইসা মোলার। বিধবা। ছেলের নাম জন ফ্রেডারিক মোলার। বয়স আটাশ বছর। প্রৌঢ়ার দৃঢ়বিশ্বাস কোনও সাংঘাতিক কারণেই ফ্রেডারিক নাকি নিপাত্তা হয়ে গিয়েছে।
জিজ্ঞাসা করলাম–কিন্তু আপনি এত উদ্বিগ্ন হচ্ছেন কেন, তা তো বুঝলাম না। আপনার ভাইয়ের সঙ্গেই তো রয়েছে আপনার ছেলে, অজানা-অচেনা লোকের সঙ্গে তো নেই। তাছাড়া, কোনও অ্যাকসিডেন্ট হয়নি গাড়িটার। হলে এতক্ষণে তা জানতে পারতাম। খুব সম্ভব যে গুপ্তধনের সন্ধানে ওঁদের এই অভিযান, তা নিশ্চয় সহজে খুঁজে পাচ্ছে না ওরা। তাই এত দেরি।
