খড় আর কাগজের দলা দিয়ে প্যাক করা ছিল মূর্তিটা। দলগুলো একে একে বার করে আনতে লাগল জন মার্টিন। স্পষ্ট দেখা গেল, আঙুলের ডগাগুলো কাঁপছে থর থর করে। সবশেষে মূর্তিটা সন্তর্পণে বাইরে এনে তুলে দিল জয়ন্তর হাতে।
শূন্য বাক্সটার মধ্যে সন্ধানী চোখ বুলিয়ে মূর্তিটা হাতে নিল জয়ন্ত। বলল–ভিজে ভিজে মনে হচ্ছে।
ইন্দ্রনাথ পাশে দাঁড়িয়েছিল। তন্নিষ্ঠ হয়ে তাকিয়েছিল সাদা গোমতেশ্বরের দিকে। এখন আস্তে আস্তে মূর্তিটা তুলে নিলে নিজের হাতে, তারপর হাতের তালুতে আলতো করে বসিয়ে অনুভব করতে লাগল মনে মনে। এই সময়ে আমার চোখ পড়ল জন মার্টিনের ওপর। অবাক হয়ে গেলাম তার মুখচ্ছবি দেখে। নিঃসীম আতঙ্কে বিস্ফারিত তার দুই চক্ষু। স্নায়বিক উত্তেজনায় কাঁপছে ঠোঁটের পাশের মাংসপেশী। শ্বেতকায় ভদ্রলোক কিন্তু একেবারেই নির্বিকার।
নির্বিকার ভাবটা ঘুচে গেল আচমকা। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে চেঁচিয়ে উঠল বিকট গলায়–করছেন কি, করছেন কি! পড়ে যাবে যে!
বলতে বলতেই ইন্দ্রনাথের তালু থেকে খসে পড়ল গোমতেশ্বর এবং ধেয়ে গেল পাথরে বাঁধানো মেদিনী লক্ষ্য করে। দুর্ঘটনা যে ইচ্ছাকৃত, তা ওর হাতের চেটো উপুড় করা ভঙ্গিমা দেখেই বুঝলাম।
মেঝের ওপর দমাস করে পড়েই টুকরো টুকরো হয়ে গেল গোমতেশ্বর প্রতিমূর্তি। তুষারশুভ্র অংশগুলো ছিটকে গেল দৃষ্টির আড়ালে।
আর, ধ্বংসাবশেষের মধ্যে থেকে ছোট্ট একটা হলদে রঙের ধাতুর সিলিন্ডার ধীরে ধীরে গড়িয়ে গেল মেঝের ওপর।
তৎক্ষণাৎ বাঘের মতোই সেদিকে ঝাঁপ দিল আগন্তুক এবং ততোধিক ক্ষিপ্রতায় তারও আগে হেঁট হয়ে চট করে মেঝে থেকে সিলিন্ডারটা কুড়িয়ে নিল জয়ন্ত।
বলল–ওহে ইন্দ্রনাথ, জিনিসটা কি বললো তো?
নেবুচাডনেজারের শীলমোহর।
কার সম্পত্তি?
প্রহ্লাদ চক্রবর্তীর।
কিন্তু তিনি তো!
পরশু রাতে খুন হয়েছেন!
কথাটা শেষ হতে না হতেই অস্ফুট চিৎকার করে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল জন মার্টিন–বুঝলাম জ্ঞান হারিয়েছে এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজা লক্ষ্য করে অবিশ্বাস্য বেগে ধেয়ে গেল শ্বেতকায় পুরুষ। কিন্তু চৌকাঠেই মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়ে গেল গাঁট্টাগোট্টা গোয়েন্দা দুজনের সঙ্গে এবং পরমুহূর্তেই ক্লিক শব্দে মণিবদ্ধে এঁটে দিল লৌহবলয়।
.
বাড়ি ফিরলাম হাঁটাপথে। হাঁটতে হাঁটতে ইন্দ্রনাথকে বললাম,–পায়ের ছাপ আর ছড়ির ডগার ছাঁচগুলো তাহলে কোনও কাজেই এল না। মিছে পণ্ডশ্রম করলে।
উঁহু। এর পরেই তো প্রয়োজন ওদের। জন মার্টিনকে ফাঁসি দেওয়ার পক্ষে শীলমোহরটা যদি যথেষ্ট প্রমাণ না হয়, তখন এই ছাঁচগুলোই হবে অকাট্য প্রমাণ।
সত্যি তাই হয়েছিল। মামলা চলার সময়ে কেটে বেরিয়ে গেল জন মার্টিন শীলমোহরটা নাকি একজন এসে দোকানে বিক্রি করে গেছিল। লোকটাকে সে চেনে না। ঠিক সেই মুহূর্তে জন মার্টিনের পা আর ছড়ির ছাঁচ হাজির করা হল আদালতে এবং অবিসম্বাদিতভাবে প্রমাণ হয়ে গেল যে হত্যার রাত্রে প্রহ্লাদ চক্রবর্তীর বাড়ির কাছেই হাজির হয়েছিল জন মার্টিন। এরপর স্বীকারোক্তি আদায় করতে বেশি বেগ পেতে হয়নি।
যাই হোক, আমি জিগ্যেস করলাম–কিন্তু মার্টিনকে তুমি সন্দেহ করলে কী করে বলো তো? জঙ্গলের মধ্যে ছড়ির গর্ত দেখে কি? আমি তো সন্দেহ করার মতো অদ্ভুত কিছুই দেখতে পেলাম না।
অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য একটাই ছিল। গর্তগুলো যে ছড়ির সে ছড়ির প্রকৃত মালিক ছড়িধারী নয়।
ইন্দ্রনাথ, তুমি নিশ্চয় জ্যোতিষী নও? সামান্য কতকগুলো ছড়ির ছাপ দেখে ছড়ির আসল মালিক কে, তা কি বলা সম্ভব?
সম্ভব। আর সেইটাই হল অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। সমস্ত ব্যাপারটাই নির্ভর করছে কীভাবে ছড়ির ফেরুল ক্ষয়েছে তার ওপর। যে ছড়ির হাতলটা সাদাসিধে গোল মত, তার ফেরুল সমান ভাবে চারদিকে ক্ষয়ে যায়। কিন্তু যে ছড়ির হাতলটা বেঁকা, তার ফেরুল ক্ষয়ে যায় হাতলটা যে দিকে বেঁকা ঠিক তার উল্টো দিকে, অর্থাৎ ছড়ির সামনের দিকে। তার কারণ, হাতল বেঁকা ছড়িকে একটা বিশেষ কায়দায় একই দিকে বাগিয়ে ধরতে হয়–ফলে একই অবস্থায় ক্রমাগত ছড়ি ধরার ফলে ফেরুলের বিশেষ একটা দিকই সমানে ক্ষইতে থাকে। কিন্তু সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটা কি জানো? ক্ষওয়াটা কিন্তু ঠিক হাতলের উল্টো দিকে হয় না, সামান্য একদিকে ঘেঁষে। কারণ? ছড়ি নিয়ে হাঁটার সময়ে হাতলটা আমরা পেছনে দুলিয়ে হাঁটি। যখন এগিয়ে যাই, ছড়িটাকে দুলিয়ে পেছন থেকে সামনে নিয়ে আসি–আপনা হতেই ছড়িটা তখন পায়ের কাছ থেকে বাইরের দিকে সরে গিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। আসবার সময়ে আবার পা ঘেঁষেই আসে। ফলে ছড়ির ফেরুল সব সময়েই ভেতর দিকে একটু বেশি ক্ষয়। সেই কারণেই, ডান হতে ছড়ি নিয়ে যে হাঁটে, তার ফেরুল ক্ষয় সামান্য বাঁদিকে। আর বাঁহাতে ছড়ি নিয়ে যে হাঁটে, তার ফেরুল ক্ষয় সামান্য ডান দিকে। কিন্তু ডান হাতে ছড়ি নিয়ে হাঁটা যার অভ্যাস, সে ল্যাটা মানুষের ছড়ি নিয়ে হাঁটলে জমির ওপর যে ছাপ পড়বে, তাতে দেখা যাবে ফেরুটা খয়েছে ডান দিকেই বেশি–ডান দিক দিয়ে দুলিয়ে ছড়ি পেছন থেকে সামনে আনার ফলে ক্ষয়টা আরো বেশি মনে হবে। তখনই বুঝতে হবে, ছড়ির মালিকেরা ছড়ি বদলাবদলি করেছে। আমি যে ছাপ দুটো কাল তুললাম, তাতেও দেখা গেল এই বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ ফেরুটা ক্ষয়েছে ডান দিকেই। অতএব ছড়িটা যার সে ল্যাটা মানুষ। তা সত্ত্বেও ছড়ি নিয়ে ডান হাতে হাঁটা হয়েছে। অতএব, ছড়ির মালিক অন্য কেউ।
