মেরুদণ্ডের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ শিহরণ বয়ে গেল ছড়িটা দেখে। হাতির দাঁতের হাতল। চওড়া রূপোর পটি। শক্ত মালাক্কা বেত। ঠিক যেমনটি দেখে এসেছি কৃষ্ণদাস চক্রবর্তীর হাতে। হুবহু একই রকম।
আমরা কথা বলতে বলতে যে রকম হাঁটছিলাম হাঁটতে লাগলাম। ধীর চরণে আমাদের পেরিয়ে গেল জন মার্টিন (নিঃসন্দেহে লোকটা জন মার্টিন, তা না হলে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দোকান থেকে বেরোবে কেন?) আমরা পেছনে এসেই ঘুরে গিয়ে অনুসরণ করলাম। ঠিক তখনি লক্ষ্য করলাম দুজন পালোয়ান গোছের শক্তসমর্থ পুরুষ দূর থেকে পিছু নিয়েছে জন মার্টিনের। দমকল স্টেশনের সামনে এসেই একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেল মার্টিন। সঙ্গে সঙ্গে চাপাকণ্ঠে বলল ইন্দ্রনাথ জয়ন্ত, আর দেরি নয়। গাড়ি কই?
মুখের কথা খসতে না খসতেই সেই ঢাকা মস্ত কালো গাড়িটা নিঃশব্দে ব্রেক কষলো পাশে। টপাটপ ভেতরে লাফিয়ে উঠলাম আমরা তিনজনে। মুশকো চেহারার লোকদুটোও যেন তৈরি ছিল, দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে টুক করে উঠে বসল ভেতরে। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় নিঃশব্দে পিছনে সামনে এগিয়ে গেল গাড়ি।
সামনের ট্যাক্সিটা তখন লিন্ডসে স্ট্রিট দিয়ে চলেছে সিধে চৌরঙ্গী রোডের দিকে। রেড সিগন্যাল থাকায় সামান্যক্ষণ দাঁড়াতে হল। তারপরেই ডান দিকে মোড় নিয়ে চলল এসপ্ল্যানেডের দিকে। সুরেন ব্যানার্জি রোডের কাছাকাছি গিয়ে বাঁ-দিকে মোড় দিয়ে ঢুকে পড়ল রানী রাসমণি রোডের মধ্যে। তারপর সুভাষ বোসের স্ট্যাচু প্রদক্ষিণ করে তিরবেগে এসে দাঁড়াল গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের সামনে।
জন মার্টিন ভাড়া মিটিয়ে নামবার আগেই আমরা হোটেলের হলে ঢুকে বসে পড়লাম দেওয়াল ঘেঁষা সোফাসেটে। মিনিটখানেকের মধ্যেই লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে ঢুকল জন মার্টিন। ঢুকে থমকে দাঁড়াল। ইতস্তত দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগল যেন কারো আশায়।
হলের এককোণে একজন শ্বেতকায় ব্যক্তি বসে ম্যাগাজিন দেখছিল। লাল মুখ। কদমছাঁট সোনালি চুল। পরনে সিনথেটিক ফাইবারের ট্রাউজার্স আর বুশশার্ট। দশাসই চেহারা।
জন মার্টিনের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ম্যাগাজিন রেখে এগিয়ে এল শ্বেতকায় পুরুষ।
আর ঠিক তখনি, সোফা ছেড়ে উঠে জন মার্টিনের কাঁধে হাত রাখল জয়ন্ত।
বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ঘুরে দাঁড়াল জন মার্টিন। তার চোখের তারায় নিবিড় শঙ্কা।
কর্তব্যকঠিন স্বরে জয়ন্ত বললে–মিঃ মার্টিন। আমি একজন ডিটেকটিভ অফিসার।
বলতেই, ছাইয়ের মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেল জন মার্টিন। চোখে চোখ রেখে শক্ত গলায় বললে জয়ন্ত–আপনার হাতে যে ছড়িটা দেখছি, তা তো আপনার নয়।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল জন মার্টিন। বলল–ঠিক বলেছেন। কার ছড়ি, তা জানি না। আপনার জানা থাকলে ফিরিয়ে দিতে পারেন। আসলে ভুল করে ছড়ি বদলাবদলি করে ফেলেছি। দয়া করে আমারটা যদি আমাকে ফিরিয়ে দেন তো উপকৃত হব।
বলে, ছড়িটা এগিয়ে দিল জন মার্টিন। জয়ন্ত সেই ছড়িটা নিয়ে এগিয়ে দিলে ইন্দ্রনাথের হাতে। আমরা দুজনেই ততক্ষণে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম জয়ন্তর দুপাশে।
এইটাই তো? বললে জয়ন্ত।
নিরুত্তরে ছড়িটার আগাপাশতলা দ্রুত চোখ বুলিয়ে গেল ইন্দ্রনাথ। তীক্ষ্ণ সন্ধানী এক্সরে চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিলে প্রতিটি বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে পরীক্ষা করল ফেরুলটা। পকেট থেকে ক্যালিপার গজ বার করে দু-জায়গার ব্যাসের মাপও নিলে এবং নোটবই খুলে আগে থেকেই লেখা কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে নিলে ফলাফলটা।
অধীর হয়ে পড়েছিল জন মার্টিন। আঙুল মটকাতে মটকাতে এখন বললে–আরে মিস্টার, খামোকা দাঁড় করিয়ে রেখেছেন কেন আমাকে? এত মাপজোকের দরকার আছে কি? বললাম না আমার ছড়ি নয়।
সত্যি কথাই বলেছেন, বললে জয়ন্ত। সেই কারণেই আপনার সঙ্গে কিছু প্রাইভেট কথা আছে। কথা ছিল এই ছড়িটা সম্বন্ধেই।
এই সময়ে উদ্বিগ্নমুখে ছুটতে ছুটতে এল হোটেল ম্যানেজার। পেছন পেছন সাদা পোশাক পরা একজন গোয়েন্দা। জয়ন্ত ঘুরে দাঁড়াতেই ম্যানেজার জানালে, কথাবার্তাগুলো প্রাইভেট অফিস রুমে হলেই ভালো হয়। প্রকাশ্যে হওয়াটা হোটেলের মর্যাদার পক্ষে হানিকর।
জয়ন্ত বললে–তাই ভালো। চলুন।
আমরা পা বাড়িয়েছি, এমন সময়ে শ্বেতাকায় ভদ্রলোক নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল জন মার্টিনের সামনে। বাক্সটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললে–দিন আমাকে।
মাঝখানে এসে দাঁড়াল জয়ন্ত–এখন নয়। মিঃ মার্টিন আপনার সঙ্গে পরে কথা বলবেন।
বাক্সটা আমার। আপনি কে?
পুলিশ অফিসার। বাক্সটা যদি আপনারই হয়, তাহলে বরং আমাদের সঙ্গে এসেই নজর রাখুন।
শুনেই আমসির মতো শুকিয়ে গেল শ্বেতকায় পুরুষের মুখ। চোখে মুখে ফুটে উঠল রীতিমতো অস্বস্তি। জন মার্টিনের মুখের রক্তও আবার যেন ব্লটিং পেপার দিয়ে নিমেষে কে শুষে নিল।
ম্যানেজারের পেছন পেছন আমরা এলাম নিভৃত একটা সুসজ্জিত প্রকোষ্ঠে। দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বিদায় নিল ম্যানেজার।
জয়ন্ত বলল–মিঃ জন মার্টিন, বাক্সটার মধ্যে কি আছে আমি জানতে চাই।
জবাব এল শ্বেতকায় আগন্তুকের দিক থেকে–উত্তরটা আমি দিচ্ছি। ওর মধ্যে আছে ভারতীয় মুর্তিশিল্পের একটা নিদর্শন। জিনিসটা আমার।
খুলে দেখান।
টেবিলের ওপর বাক্সটা রেখে দড়ির বাঁধনটা আস্তে আস্তে খুলতে লাগল জন মার্টিন আর কপাল থেকে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরে পড়তে লাগল বাক্সের ওপর। আলতারাপ খুলে ডালা খুলতেই দেখা গেল একটা প্লাস্টারের ছাঁচ। দেখেই চিনতে পারলাম আমি। শ্রবণবেলাগোলার গোমতেশ্বরের নগ্নমূর্তি। ষাট ফুট লম্বা গোমতেশ্বরের প্রতিটি বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছইঞ্চি প্রতিমূর্তির মধ্যে।
