ত ঠিক, নিরাশমুখে বললেন ত্রিপুরারিবাবু। আমি আর এগোলাম না।
ঠিক আছে, আমরা নিজেরাই যাচ্ছি। অত্যন্ত বিনীতভাবে এগিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত করে ফটকের বাইরে পা দিল ইন্দ্রনাথ।
দু-পা এগিয়ে আমি বললাম–বড় গোলমেলে কেস। কোনও সুরাহাই হল না। অবশ্য সব সময়েই যে লক্ষ্যভেদ করা যাবে, এমন কোনও কথা নেই।
ঠিক বলেছ। আমাদের প্রাথমিক কাজ হল চোখ কানের সদ্ব্যবহার করে ফ্যাক্টগুলো মনে মনে সাজিয়ে নেওয়া। অঙ্কক সিদ্ধান্ত আসবে পরে। সেই জন্যেই আবার জঙ্গলের শর্টকাট ধরতে হবে আমাদের।
কেন বলো তো! ট্রেনের এখনো অনেক দেরি।
সেইজন্যেই তো। পায়ের ছাপগুলোর ছাঁচ নিয়ে যেতে চাই। কাজে লাগতে পারে।
বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?
নিশ্চয় না।
বাধা দিলাম না। জানি তো, ইন্দ্রনাথ রুদ্রের গাণিতিক মন উদ্দেশ্য ছাড়া কখনো এনার্জি ব্যয় করে না। সুতরাং অচিরেই পৌঁছোলাম জঙ্গলের সেই কাদামাটি অঞ্চলে এবং সবচাইতে স্পষ্ট দুজোড়া পদচিহ্ন বেছে নিয়ে রিসার্চ কেস থেকে ইন্দ্রনাথ একে একে বার করল প্লাস্টার টিন, জলের বোতল, চামচে আর ছোট্ট একটা অ্যালকাথিন বাটি।
উদ্যোগপর্ব দেখে কৌতুক অনুভব করলাম। শেষ পর্যন্ত বারম্ভে লঘুক্রিয়া না হয়। অ্যামবাসাডর জুতোর চিহ্ন নিঃসন্দেহে মৃত ব্যক্তির। কিন্তু তাতে কি? আরেক জনের পায়ের ছাপের ছাঁচ তুলেও কোনও লাভ আছে কি? লোকটা এখনো অজ্ঞাত। এখানে তার হাজির থাকাটাও এমন কিছু সন্দেহজনক নয়–অন্তত এখনো পর্যন্ত।
দু-জোড়া পদচিহ্নের ওপর তরল প্লাস্টার ঢেলে দিল ইন্দ্রনাথ এবং তারপর যা করল তা রীতিমতো দুর্বোধ্য।
বাটির মধ্যে আরো খানিকটা প্লাস্টার গুলে অজ্ঞাত ব্যক্তির পায়ের ছাপের পাশেই ছড়ির দুটো গর্তে ঢেলে দিল। তারপর রিসার্চ কেস থেকে একরীল সুতো বার করে গজ দুয়েক ছিঁড়ে নিয়ে দু-হাতে টান করে এমনভাবে ধরল যাতে সুতোটা গর্তদুটোর ঠিক মাঝখান দিয়ে যায়। আস্তে আস্তে প্লাস্টার জমে যেতে সুতোও আটকে রইল তার মধ্যে।
কিন্তু এখনো গর্ত থেকে তোলার মতো শক্ত হয়নি প্লাস্টার ছাঁচ। তাই এবার পায়ের ছাপের ছাঁচগুলো তুলে নিয়ে রাখলে কেসের মধ্যে। তারপর আস্তে আস্তে তুলল ছড়ির গর্তের ছাঁচদুটো। একই ছড়ির দু-দুটো তুষারশুভ্র ফেরুল ছাঁচের দিকে অনিমেষ নয়নে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পেনসিল দিয়ে একটা ছাঁচের ওপর কি চিহ্ন দিতে লাগল ইন্দ্রনাথ।
আমি বললাম–দুটো ছাপের মধ্যে ফাঁকটুকু সুতোর মাপ থেকেই জানা যাবে, তাই না?
এত কাণ্ড অবশ্য সেজন্যে করিনি, বলল ইন্দ্রনাথ। এ থেকে বোঝা যাবে ঠিক কোনও দিকে হেঁটেছে লোকটা, ছড়ির সামনে পেছনটাও জানা যাবে।
খুবই উচ্চস্বরের মৌলিক পদ্ধতি, কোনও সন্দেহই নেই তাতে। কিন্তু লাভটা কি? এত কাণ্ড করে কিছু প্রমাণ করা গেলেও না হয় বুঝতাম।
কৌতূহল চাপতে না পেরে দু-চারটে প্রশ্ন করেছিলাম। কিন্তু চিরাচরিত পন্থা অবলম্বন করল ইন্দ্রনাথ, অর্থাৎ হঠাৎ মৌন হয়ে গেল। একবার শুধু বললে, ক্লাইম্যাক্সে না পৌঁছোনো পর্যন্ত টুকটাক সাক্ষ্য জোগাড় করতেই হবে। কিন্তু ক্লাইম্যাক্সটা কোথায়, তার জবাব পেলাম না।
হাওড়ায় পৌঁছে ইন্দ্রনাথ একটা ট্যাক্সি নিয়ে গেল লালবাজারে। বলে গেল–সন্ধেবেলা মেসে এসো। অনেক কথা আছে।
সন্ধেবেলা যেতেই দেখি চিৎপাত হয়ে শুয়ে ইন্দ্রনাথ কচি টানছে আর কড়িকাঠ নিরীক্ষণ করছে। আমাকে দেখেই বলে উঠল–এসো মৃগ, এসো। কিন্তু কোনও প্রশ্ন নয়। কেসটা এখনো ধোঁয়াটে। একদিকে ঢিল ছুঁড়েছি, দেখি লাগে কিনা। কাল সকালে হাতে কাজ আছে?
না। কিন্তু কখন?
কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে আটটায় এখানে চলে এসো। শীলমোহর রহস্য নাটিকার শেষ অঙ্কটা দেখবার সৌভাগ্য হলেও হতে পারে। নাও হতে পারে। সবটাই তোমার কপাল আর আমার হাতযশ!
.
পরের দিন সকাল। ফ্রি স্কুল স্ট্রিট।
কাটায় কাটায় সাড়ে আটটায় সময়ে ইন্দ্রনাথের মেসের সামনে হাজির হয়ে দেখেছিলাম একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে। সিঁড়িতে পা দিতে না দিতেই বন্ধুবর নিজেই তরতর করে নেমে এসেছিল নীচে।
ট্যাক্সি সঙ্গে সঙ্গে ছেড়েছে এবং যথা সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে।
ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে একটা মস্ত কালো ঢাকা গাড়ির পাশে আসতেই ওদিক থেকে উঁকি দিল সহাস্য মুখ। আমাদের প্রিয় বন্ধু ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর জয়ন্ত চৌধুরী। পরনে আদ্দির পাঞ্জাবি। মুখে বর্মা চুরুট।
ইন্দ্রনাথ বললে–রিপোর্ট কী?
কাল সন্ধে থেকেই তোমার কথামতো সাদা পোশাকে দুজন গোয়েন্দা পাহারা দিচ্ছে। এখনও কিছু ঘটেনি।
ঘটবেই যে এমন কোনও কথা নেই। যুক্তির সিধে সড়কে চলেছি, যা সম্ভাব্য তা যদি সত্য হয়, তাহলে কেল্লা ফতে। নইলে ফস্কাগেরো।
এরকম কথা এর আগেও তোমার কাছে হাজার খানেক বার শুনেছি। কিন্তু..ওই যে…ওই যে…এসে গেছে তোমার লোক।
একটা দোকানের পাল্লা খুলে ফুটপাত নামল এক প্রৌঢ়। নেমে দরজায় তালা দিয়ে এগোলো ফুটপাত ধরে। লোকটা মাথায় দিব্বি লম্বা। শীর্ণ। ট্রাউজার্স ঢাকা লম্বা লম্বা বকের মতো পা। চলার ধরনটা কেমন জানি অদ্ভুত। বোধহয় শিরদাঁড়ায় কোনও ব্যারাম আছে। তাই ডান হাতের ছড়িতে ভর দিয়ে হাঁটছে আড়ষ্টভাবে মন্থর চরণে। অপর হাতে ঝুলছে একটা কাঠের চৌকোণা বাক্স।
