শীলটা কোথায়? জানতে চাইল ইন্দ্রনাথ।
কেন, যেখানে থাকার কথা সেখানেই, মানে আয়রন সেফে। কিন্তু আর ওখানে রাখা চলবে না। ব্যাঙ্কে সরাতে হবে।
সেফে আছে তো?
না থাকার কোনও কারণ নেই বলেই সহসা উঠে দাঁড়ালেন কৃষ্ণদাসবাবু। এখনো পর্যন্ত অবশ্য আমি খুলে দেখিনি। দেখাই যাক না আছে কিনা।
বৈঠকখানা ঘরের দিকে পা বাড়ালেন কৃষ্ণদাসবাবু। আমরাও পিছু পিছু এলাম। চৌকাঠেই থমকে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক। আড়ষ্ট লাশটার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বললেন–চাবিটা রয়েছে কিন্তু ওর পকেটে। তারপর বেশ অনিচ্ছাসত্ত্বেও পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ালেন সোফার সামনে। পকেট-টকেট হাতড়ে অনেকক্ষণ পরে বার করলেন একগোছা চাবি।
পেয়েছি। কিন্তু সিন্দুকের চাবি..খুব সম্ভব এইটা, বলে একটা চাবি আলাদা করে গিয়ে দাঁড়ালেন লোহার সিন্দুকের সামনে। চাবি ঢুকিয়ে ঘোরাতেই কড়াত করে খুলে গেল ভারী ডালাটা।
বাঁচা গেল! আছে শীলটা। আপনার কথায় বুকটা ছাঁত করে উঠেছিল ইন্দ্রনাথবাবু। প্যাকেটটা খোলার দরকার আছে কি? স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন কৃষ্ণদাসবাবু। ইন্দ্রনাথের হাতে তুলে দিলেন ছোট্ট একটা পুলিন্দা। ওপরে ইংরাজিতে লেখা নেবুচানেজারের শীলমোহর।
মৃদু হেসে ইন্দ্রনাথ বললে–একেবারেই নিশ্চিন্ত হওয়াই ভালো।
তা মন্দ বলেন নি।বলে সুতো কেটে গালমোহর ভেঙে পুলিন্দা খুলে ফেললেন কৃষ্ণদাসবাবু।
ভেতর থেকে বেরুল একটা ছোট্ট কার্ডবোর্ডের বাক্স। ডালা খুলে হাতের তেলোয় বাড়িয়ে দিলেন এতটুকু একটা সিলিন্ডারফিনফিনে সেলোফেন পেপারে মোড়া।
মোড়ক খুলে বস্তুটা তুলে ধরলেন কৃষ্ণদাসবাবু। সওয়া ইঞ্চি লম্বা একটা সোনার সিলিন্ডার। ব্যাস আধ ইঞ্চির মতো। এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত একটা লম্বালম্বি ছিদ্র।
সিলিন্ডারের আগাগোড়া ছোট্ট অথচ অতি সূক্ষ্ম কারুকাজ। আপাতদৃষ্টিতে তা অর্থহীন। কিন্তু বিশেষজ্ঞের চোখে এরই মধ্যে ধরা পড়েছে সারি সারি হরফে সাজানো এক সাংকেতিক লিপি– যুগযুগান্ত পূর্বে যে লিপিকারের মৃত্যু হয়েছে, ধরণীর বুক থেকে মুছে গেছে যার রাজ্যপাট।
কার্ডবোর্ডের বাক্স থেকে বেরুল ভাঁজ করা আর একটা ছোট্ট কাগজ। ভাঁজ খুলে কৃষ্ণদাসবাবু বললেন–মাপজোক ওজনগুলো এতেই লিখে রেখেছে প্রহ্লাদ। থাক, কাজে লাগবে।
চঞ্চল তীক্ষ্ণ চোখে শীলমোহরটার দিকে তাকিয়ে ছিল ইন্দ্রনাথ। এখন সন্তর্পণে দুই আঙুল দিয়ে ধরে সিলিন্ডারটা আনল চোখের ইঞ্চি কয়েক দূরে। ধীরে ধীরে দুই চোখে ফুটে উঠল বিচিত্র বিস্ময়। আমিও যেন আবিষ্ট হয়ে পড়ছিলাম সোনার চোঙার সূক্ষ্ম লিপি দেখে। কত ছোট অথচ কত অর্থবহ। একবার দেখলেই মনের মধ্যে গভীর দাগ কেটে যায়। হাজার হাজার বছর আগে সুদূর সেই পৌরাণিক যুগে মহাপরাক্রমশালী এক নৃপতির হাতে শোভা পেয়েছে এই শীল, হয়তো তিনি সর্বক্ষণ অঙ্গে ধারণও করেছেন। কত সহস্র হতভাগ্যের জীবনদীপ নিভে গেছে এই শীলাঙ্কিত আদেশের বলে, কত সহস্রের ভাগ্যের চাকা সুদিনের মুখ দেখেছে এরই নির্দেশে।
আমি যখন আবেগবিহ্বল, ইন্দ্রনাথ তখন বৈজ্ঞানিক তন্ময়তায় বিভোর। চুলচেরা বিশ্লেষণী দৃষ্টি দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে শীলটির প্রতিটি বৈশিষ্ট্য। তাতেও সন্তুষ্ট হল না। নিত্যসঙ্গী রিসার্চ কে থেকে বেরুলো ম্যাগনিফাইং গ্লাস। প্রান্তদুটো অনেকক্ষণ দেখার পর কেন্দ্রের ছিদ্রের মধ্যে দিয়েও চোখ চালাল।
অবশেষে কৃষ্ণদাসবাবুর হাতে ধরা কাগজের টুকরোটায় চোখ বুলিয়ে বললে–দেখছি একটা ডায়ামিটারেরই মাপ রয়েছে, খুব সম্ভব এক্সপার্ট ভদ্রলোক ভেবেছিলেন শীলটা অরিজিনাল, তাই দুটো মাপ নেননি। কিন্তু আমি তো তা দেখছি না। এর ডায়ামিটার এক এক জায়গায় এক এক রকম। চোঙা যেরকম পরিষ্কার গোলাকার হওয়া উচিত, এটা সেরকম নয়। দু-পাশও সমান্তরাল নয়।
বলতে বলতে রিসার্চ কেসের আরেক পকেট থেকে ইন্দ্রনাথ বার করল ক্যালিপার মাপকাঠি। সিলিন্ডারের এক প্রান্তে দুপাশে ক্যালিপারের চোয়াল দুটো ঠেকিয়ে মনে মনে হিসেব করে নিলে ভার নিয়ার স্কেলের রিডিংটা। তারপর সিলিন্ডারের ওপর দিয়ে আস্তে আস্তে সরিয়ে অপর প্রান্তে ক্যালিপার নিয়ে যেতেই শুধু চোখেই দেখা গেল, চোয়াল দুটো আর সিলিন্ডারের গা স্পর্শ করছে না, খানিকটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে।
মাপকাঠির মুখ দুটো সিলিন্ডারের পাশে ঠেকিয়ে আবার রিডিং নিল ইন্দ্রনাথ। তারপর বললে–দু-মুখে তফাত প্রায় দু-মিলিমিটারের মতো।
ত্রিপুরারিবাবু বললেন–মিউজিয়ামের এক্সপার্ট ভদ্রলোকের আপনার মতো অত হিসেবী চোখ নেই। অঙ্ক-টঙ্কও নিশ্চয় কম জানেন। তাছাড়া এত নিখুঁত মাপজোকে কিছু আসে যায় না।
আমি বলব, আসে যায়, ঝটিতি জবাব দিল ইন্দ্রনাথ। ভুল মাপজোকেই বরং কোনও প্রয়োজন নেই।
সবার দেখা হয়ে যাবার পর শীলটা আবার কাগজে মুড়ে প্যাক করে ফেললেন কৃষ্ণদাসবাবু। তারপর আয়রন সেফের যথাস্থানে রেখে সদলবলে ফিরে এলাম হলঘরে।
ত্রিপুরারিবাবু জিগ্যেস করলেন–ইন্দ্রনাথবাবু, সব তো দেখলেন। এখন বলুন তো ইন্সিওয়েন্সের প্রশ্নটার কিছু সুরাহা হল কিনা।
না।
তবে?
যতক্ষণ পুলিশী তদন্ত শেষ না হচ্ছে, ততক্ষণ এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া সমীচীন হবে না। এখন আমরা চলি। সারাদিন অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে আপনাদের।
