এবার কিন্তু মার্টিন সাহেবের মনেও সন্দেহ দেখা দিল। কিছুতেই বলতে চাইল না কার কাছে শীলটা। উপরন্তু, কাদামাটির ছাঁচটা যে আসলে সোনার শীলমোহর থেকেই, এ সন্দেহ হওয়ায় একটা ছাঁচ নিয়ে দৌড়োল ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে। যেতেই ফাঁস হয়ে গেল সব কিছু। ব্যাপার আরও ঘোরালো হয়ে দাঁড়ালো আমেরিকান অ্যাসিরিওলজিস্ট প্রফেসর কিটম্যানের পেট আলগা হওয়ায়। হোটেলে ফিরে বন্ধুবান্ধবের কাছে নেবুচানেজারের সোনার শীলমোহরের গল্প করায় সাড়া পড়ে গেল কিউরিও-পাগলদের মধ্যে। দলে দলে আমেরিকান গোছা গোছা নোট নিয়ে রোজ হানা দিতে লাগল জন মার্টিনের দোকানে–দাম নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই–শীলমোহর চাই-ই চাই। কিন্তু জন মার্টিনের পেট থেকে যখন কিছুই বার করা গেল না, তখন ছুটল ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে। সেখানে যেতেই তারা বললে, হ্যাঁ শীলমোহরটা আছে আমার ভাই প্রহ্লাদ চক্রবর্তীর কাছে। ঠিকানাও দিলে। কিন্তু প্রহ্লাদের কলকাতার ঠিকানা বলতে টেম্পল চেম্বার্সে আমারই অফিসের ঠিকানা। ফলে, শুরু হল পত্রাঘাতের পর পত্রাঘাত। সমানে চিঠি মারফত অনুনয় বিনয় পৌঁছতে লাগল জন মার্টিন আর নীলমাধব রাউতের কাছেও।
পাগল হতে বসলেন নীলমাধব রাউত। তিনি হামলা করতে লাগলেন জন মার্টিনের ওপর। মার্টিন সাহেব নাকি তাকে ঠকিয়েছে। হয় সে শীলমোহরটা ফেরত দিক, আর নইলে উপযুক্ত দাম দিক। জন মার্টিনের অবস্থাও তাই। সে-ও সমানে তর্জন গর্জন শুরু করে দিলে আমার ভায়ার ওপর। আর কোটিপতি কিউরিও-পাগলরা লাখ লাখ টাকা নগদে দেওয়ার লোভ দেখাতে লাগল দিনের পর দিন। বেচারা প্রহ্লাদের মনের অবস্থা তখন কহতব্য নয়। একদিক দিয়ে ওর সহানুভূতি ছিল নীলমাধব রাউতের ওপর। আপনারা তো জানেন, ভদ্রলোক কি পরিশ্রম করে সারা পৃথিবী ঘুরেছেন। যেখানে গেছেন, বাংলার আর ভারতের নামগান করে পাথেয় সংগ্রহ করেছেন। জন মার্টিনের সম্বন্ধে ওর কোনও মাথা ব্যথাই ছিল না। মার্টিন যদি তার ব্যবসা না বোঝে তো কার কি। কোনও জিনিসের কত দাম, তা মার্টিনের জানা উচিত ছিল। সব চাইতে জ্বালাতন আরম্ভ করল আমেরিকানরা। অবর্ণনীয় সেই উৎপাত। উৎপাতটা বসতবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছোতো যদি না গোড়া থেকেই ঠিকানাটা গোপন করে যেত প্রহ্লাদ।
শেষ পর্যন্ত নেবুচানেজারের শীলমোহর নিয়ে যে কি করত প্রহ্লাদ, তা আমি জানতাম না। তবে একদিনের জন্যে আমার প্রাইভেট অফিসটা ধার নেয় ও। সারাদিন ধরে ইন্টারভিউ নেয় নীলমাধববাবু, জন মার্টিন, প্রফেসর কিটম্যান আর অন্যান্য কিউরিও প্রেমিকদের। ইন্টারভিউ হয়েছে তিন দিন আগে। সারাটা দিন মশাই জালিয়ে মেরেছে লোকগুলো। যত্তোসব বদ্ধ উন্মাদের দল। একজন
তো যাবার সময় নিজের ছড়ির বদলে আমার ছড়ি নিয়েও উধাও হল।
তাই নাকি? বেড়াবার ছড়ি?
হ্যাঁ। বড় শখের ছড়ি। বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া।
তার বদলে কি ছড়ি রেখে গেছে বলুন তো?
দেখলে কোনও তফাত বুঝবেন না। হুবহু একই রকম। ভুলটা হয়েছে যদিও সেই জন্যেই। হাতে নিয়েই আমার কীরকম সন্দেহ হল। তারপর হাঁটতে গিয়েই বুঝলাম এ ছড়ি সে ছড়ি নয়।
অস্বাভাবিক ছড়ি বলুন?
এক রকম তাই।
লম্বাই খাটো বুঝি?
না না, তা নয়। তফাতটা ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। আমি আবার ল্যাংড়া মানুষ তো। বাঁহাতে ছড়ি নিয়ে না হাঁটলে ঠিক মৌজ আসে না, হয়তো সেইজন্যেই…সে যাক মশাই, আমার পুরোনো ছড়ি ফিরে পেলেই খুশি হই আমি। আপনি একটু বসুন, ছড়িটা দেখাচ্ছি।
ভেতরবাড়ি গেলেন কৃষ্ণদাসবাবু। ফিরে এলেন অনতিকাল পরেই। হাতে একটা সেকেলে ফ্যাশনের মালাক্কা বেতের ছড়ি। হাতটা হাতির দাঁতে সুন্দরভাবে বাঁধাই। বহু ব্যবহারে বিরঙ হলেও তাক লেগে যায় কারুকাজের সূক্ষ্মতা দেখে। হাতির দাঁত আর মালাক্কা বেতের জোড়মুখ চওড়া রুপোর পটি দিয়ে বেড় দেওয়া।
দুই চোখে অপরিসীম আগ্রহ নিয়ে কৃষ্ণদাসবাবুর হাত থেকে ছড়িটা তুলে নিল ইন্দ্রনাথ এবং দু-হাতে ধরে চোখের একদম কাছাকাছি এনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এমনভাবে দেখতে লাগল যে অবাক হয়ে গেলাম আমি। একটা ছড়ি বই তো নয়, তা সে যত সুন্দরই হোক না কেন, কিন্তু খুনের সঙ্গে যার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই তা নিয়ে অযথা মাথাব্যথা কেন ভেবে আশ্চর্য হলাম। ইন্দ্রনাথ কিন্তু একাগ্রমনে তীক্ষ্ণ চোখে একে একে দেখতে লাগল হাতির দাঁতের হাতল, রূপোর পটি আর পেতলের ফেরুটা। বিশেষ করে ফেরুলটা নিয়েই ও এত বেশি তন্ময় হয়ে রইল যেন জিনিসটা অতি দুষ্প্রাপ্য অতি দুর্লভ কোনও চমকপ্রদ বস্তু।
বিচিত্র হেসে ত্রিপুরারিবাবু বললেন–ওহে কৃষ্ণদাস, ইন্দ্রনাথবাবুকে ভার দাও, তোমার ছড়ি নির্ঘাত ফেরত পাবে।
ছড়িটা ফিরিয়ে দিয়ে ইন্দ্রনাথ বললে–তা পাবেন। সেদিন ইন্টারভিউতে কারা এসেছিলেন, তার একটা লিস্ট দিলেই হবে।
লিস্ট আমার অফিসেই আছে, দেওয়া যাবে-খন। কিন্তু যা বলছিলাম। সেদিন শীলটা নিয়ে ওদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে, তা জানি না। আদৌ প্রহ্লাদ বিক্রি করবে কিনা, তাও আমাকে বলেনি। তবে কতকগুলো নাম ঠিকানা ইত্যাদি নাকি লিখে রেখেছিল। কাগজগুলো খুঁজে বার করা দরকার। কেননা, অভিশপ্ত শীলমোহরটা বিদেয় না করা পর্যন্ত শান্তি নেই আমার।
