হলঘরে প্রবেশ করতেই সাগ্রহে চোখ তুললেন দুই প্রৌঢ়।
ত্রিপুরারিবাবু জিজ্ঞেস করলেন–কিছু পাওয়া গেল?
আপাতত না। জবাব দিল ইন্দ্রনাথ। আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। আচ্ছা কৃষ্ণদাসবাবু, বাইরের দরজাটায় দেখলাম মাঝে খিল আর তলায় ছিটকিনি। প্রহ্লাদবাবু কোনটা বন্ধ করেছিলেন?
ছিটকিনিটা। খিল খোলা ছিল।
ও। ত্রিপুরারিবাবুর মুখে শুনলাম, সম্প্রতি একটু উদ্বিগ্ন ছিলেন আপনার ভাই। কারণটা জানেন?
তেমন কিছুই নয়। ওর চাইতেও অনেক বড় উদ্বেগের মধ্যে ওর দিন গেছে। প্রহ্লাদ শক্ত নার্ভের ছেলে, আত্মহত্যার মতো দুর্বলতা ওর ছিল না। যাই হোক, আমি যা শুনেছি, বলছি।
কিছুদিন আগে ভূপর্যটক নীলমাধব রাউত মেসোপটেমিয়া থেকে ফিরে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের কিউরিও দোকানি জন মার্টিনকে একটা ছোট্ট সোনার সিলিন্ডার শীলমোহর বিক্রি করেন। শীলমোহরটা নাকি নীলমাধববাবু বাগদাদের মাইলখানেকের মধ্যেই কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। কীভাবে পেয়েছিলেন তা জানি না। কিন্তু সিলিন্ডার সমেত উনি কলকাতায় ফিরে এসেই ছোটেন মার্টিনের কাছে কিছু টাকার আশায়। জন মার্টিন আটশো টাকা দিয়ে কিনে নেয় শীলমোহরটা।
নীলমাধববাবু জানতেন সিলিন্ডারটা সোনার, তার বেশি কিছু জানতেন না। জন মার্টিনও বিশেষ কিছু জানত না। যদিও পুরোনো জিনিস কেনাবেচাই তার ব্যবসা, কিন্তু এক্সপার্ট নয়। তবে জন মার্টিনের একটা মহৎ গুণ আছে–নকল করার গুণ। পুরোনো জিনিসকে ঘষে-মেজে এমন নিখুঁত করে তোলে যে মাথা ঘুরে যায় কিউরিওলোভীদের। কাজটা অবশ্য বেআইনি নয়। জন মার্টিন আগে জুয়েলারের দোকানে কাজ করত। ঘড়ির কাজও মোটামুটি জানে। হাতের কাজে জুড়ি নেই তার। তাই ধরেছে এই লাভজনক ব্যবসা। ভাঙাচোরা পুরোনো দুষ্প্রাপ্য বস্তু জোগাড় করে জোড়াতালি দিয়ে ঠিক আগের মতোই করে দেয়–তারপর হাঁকে কড়া দাম। এর মধ্যে জোচ্চুরি নেই। সুতরাং জন মার্টিনকে জালিয়াত বলাটা ঠিক হবে না। কিন্তু কিউরিও সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ নয় জন মার্টিন। তাই নীলমাধব রাউতের কাছে পাওয়া সোনার সিলিন্ডারের মাথামুন্ডু কিছু বোঝেনি। শুধু বুঝেছে জিনিসটা অত্যন্ত প্রাচীন আর নকল নয়। অতএব সোনার যা দাম, তার ডবল দাম দিয়ে কিনে নিয়েছে।
দিন পনেরো আগে প্রহাদ গেছিল জন মার্টিনের দোকানে কি একটা মেরামতের কাজ নিয়ে। মার্টিন জানত আমার ভায়াটির ব্যাবিলনের দুপ্রাপ্য জিনিসপত্র সংগ্রহের বাতিক আছে। এ ব্যাপারে প্রহাদ সত্যিই জিনিয়াস, ভাই বলে বলছি না। তাই শীলমোহরটা ওকে দেখায় মার্টিন। দেখেই প্রহ্লাদ বোঝে, জিনিসটা আদত-নকল নয়। শুধু তাই নয়, রীতিমতো প্রাচীন এবং ইন্টারেস্টিং কিউরিও। তাই আর না ভেবেই, এমনকী চোঙাটা আসলে কি, তা খুঁটিয়ে না দেখেই বারোশো টাকার চেক দিয়ে বাড়িতে নিয়ে যায়। প্রহ্লাদ জানত, কিউরিও হিসেবে সোনার সিলিন্ডারটা সত্যিই মূল্যবান এবং বারোশো টাকা অনায়াসেই দেওয়া যায়। বাড়ি এসে মোমের ওপর সিলিন্ডারটা গড়িয়ে ছাপ নিয়ে পরীক্ষা করতেই চক্ষুস্থির হয়ে গেল ভায়ার। চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার। মোমের ছাঁচে ফুটে উঠেছে খোঁচা খোঁচা উঁচু উঁচু কতকগুলো হরফ…তুরাণী হরফ–যেমনটি প্রাচীন ব্যাবিলনে আর পারস্যে দেখা যেত। নিদারুণ উত্তেজিত হয়ে তৎক্ষণাৎ লিপিটার পাঠোদ্ধার করে ফেলে প্রহ্লাদ। আর তখনই বোঝা গেল এ শীলমোহর যে-সে লোকের নয়–স্বয়ং নেবুচাডনেজারের।
চোখের সামনে সেই সুপ্রাচীন শীলমোহর দেখেও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনি প্রহ্লাদ। এ যে বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে পড়া! সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ালো ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে। ব্যাবিলোনিয়ান এক্সপার্ট চমকে উঠল শীলমোহর দেখে। কিনতে চাইল মিউজিয়ামের জন্যে। কিন্তু এমন দুষ্প্রাপ্য মহামূল্যবান বস্তু হাতছাড়া করার পাত্র নয় প্রহ্লাদ। তবে এক্সপার্টের অনুরোধে শীলমোহরটার ওজন, মাপ আর কাদামাটির ওপর একটা গড়ানে ছাপ রেখে দিলে মিউজিয়ামে দর্শনার্থীদের জন্যে।
এখন হয়েছে কি, শীলমোহরটা হাতছাড়া করার আগে নীলমাধব রাউত নিজেও কাদামাটির ওপর কয়েকটা গড়ানে ছাপ তুলে রেখেছিলেন। সেইগুলোই জন মার্টিনের কাছে আবার নিয়ে আসতেই মার্টিন সাহেব কয়েক টাকা দিয়ে সবগুলো কিনে কিউরিও হিসাবে সাজিয়ে রাখল শো-কেসে।
একজন আমেরিকান অ্যাসিরিওলজিস্ট শো-কেসের ছাঁচগুলো দেখেই ঢুকে পড়ে দোকানে। বিনাবাক্যব্যয়ে কিনে নেয় কয়েকটা ছাঁচ। তারপর জন মার্টিনকে জেরা করতে থাকে কোত্থেকে এসেছে কিউরিওগুলো। মার্টিন অতশত না ভেবে নাম ঠিকানা দেয় নীলমাধব রাউতের। শীলটা সম্বন্ধে অবশ্য তখনো কিছু বলেনি। কেননা শীলমোহরের সঙ্গে মাটির ছাঁচের যে সম্পর্ক আছে, তা-ই তো জানত না মার্টিন। নীলমাধববাবু ধাপ্পা দিয়েছিলেন, কাদামাটির ছাঁচগুলোও নাকি খাস মেসোপটেমিয়া থেকে আমদানি। আমেরিকান এক্সপার্টের পাক্কা চোখে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়েছিল, মাটির ছাঁচটা সদ্য তৈরি। আর আসল শীলমোহরটাও নিশ্চয় এখনও নাগালের বাইরে যায়নি।
তাই নীলমাধব রাউতের সঙ্গে দেখা করে আবার পেট থেকে কথা বার করবার চেষ্টা করতে থাকে অ্যাসিরিয়ান এক্সপার্ট। তখনই সন্দেহ হয় নীলমাধবের। শীলমোহরটা যে তার কাছেই ছিল, তা স্বীকার করেন নীলমাধব। কিন্তু এখন তা কোথায় আছে, তা কিছুতেই বলতে রাজি হলেন না এক্সপার্ট। অদ্ভুত চেহারার সোনার চোঙাটা নেবুচাডনেজারের শীলমোহর আর তার দাম দেড় লাখ থেকে দু-লাখের মধ্যে শুনে মাথা ঘুরে গেল রাউতমশায়ের। সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকান এক্সপার্টকে নিয়ে দৌড়লেন জন মার্টিনের দোকানে।
