গত রাতেও তাই করেছে প্রহ্লাদ। কিন্তু আজ সকালে শোবার ঘরে গিয়ে ওর বিধবা পিসি দেখলে বিছানা নির্ভজ, কেউ শোয়নি। প্রহ্লাদেরও পাত্তা নেই। এ-বাড়ি থেকে বৈঠকখানায় যাওয়ার দরজা ঠেলে দেখা গেল ওদিক থেকে বন্ধ। অগত্যা চাকর নারাণকে ডাক দেয় পিসি। বাইরে গিয়ে দেখে সেদিককার দরজাও বন্ধ। হাঁকাহাঁকি করেও যখন সাড়া পাওয়া গেল না, তখন নারাণ দেখতে লাগল জানলা খোলা আছে কিনা। কিন্তু জানলাগুলোও বন্ধ। শেষকালে কারখানা ঘরে একটা বড় স্কাইলাইটের রড খুলে ফাঁক দিয়ে কোনওমতে ভেতরে ঢোকে নারাণ। তারপর বৈঠকখানায় ঢুকে দেখে টেবিলের পাশে চেয়ারে বসে প্রহ্লাদ। মারা গেছে আগেই। টেবিলের ওপর একটা হুইস্কির বোতল, সোডার বোতল, একবাক্স চুরুট, ছাইদানিতে একটা আধপোড়া চুরুট আর একবাক্স পটাসিয়াম সায়ানাইট বড়ি।
তৎক্ষণাৎ ডাক্তারকে খবর পাঠানো হয়। খবর যায় কৃষ্ণদাসের অফিসেও। নটা নাগাদ ডাক্তার এসে বললেন, সায়ানাইড পয়জনিং। তবে পোস্টমর্টেম না করলে খুঁটিনাটি বলা সম্ভব নয়। চাকরা বাকররা ধরাধরি করে চেয়ার থেকে প্রহ্লাদকে নিয়ে শুইয়ে দিয়েছে সোফার ওপর। না দিলেই ভালো করত। কেন না, প্রহ্লাদ মরে কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেছে।
পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে? জিগ্যেস করে ইন্দ্রনাথ।
না। প্রহ্লাদ আত্মহত্যাই করেছে–সন্দেহজনক মৃত্যু নয়। তা সত্ত্বেও সবাই ভাবলাম আপনার মতো একজন এক্সপার্টকে ডাকা ভালো বিশেষ করে মৃত্যুটা যদি আকস্মিক হয়–
শুনে তাই মনে হচ্ছে। পরিষ্কার আত্মহত্যা। কৃষ্ণদাসবাবুর কাছে নিশ্চয় প্রহ্লাদ চক্রবর্তীর মনের অবস্থার খবর পাওয়া যাবে?
তা পাবেন। যা শুনলাম, সম্প্রতি বড় উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল প্রহ্লাদ। এসে গেছি।
সামনেই পুরোনো আমলের সাদাসিদে একটা একতলা বাড়ি। বাগানের ফটক পেরিয়ে ভেতরে পা দিলাম আমরা। সদর দরজা খুলে গম্ভীরমুখে বেরিয়ে এলেন এক ভদ্রলোক। মাথায় কঁচাপাকা চুল। সাদা গোঁফ। সোনার চশমা। আলাপ হল। প্রহ্লাদ চক্রবর্তীর দাদা সলিসিটর কৃষ্ণদাস চক্রবর্তী।
বাড়ির মধ্যে ঢুকতে ঢুকতে কৃষ্ণদাসবাবু বললেন–প্রহ্লাদ যে আত্মহত্যা করবে ভাবাই যায়। না। সেরকম ছেলে তো ও নয়। আমাদের বংশেও আত্মহত্যা কেউ কখনো করেনি। কিন্তু কেন যে ও–
কথা বলতে-বলতে হলঘরে প্রবেশ করলাম এবং এক প্রান্তের দরজা পেরিয়ে প্রহ্লাদ চক্রবর্তীর বৈঠকখানায় এসে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল এক ভয়ানক দৃশ্য। সোফার ওপর কিম্ভুতকিমাকার ভঙ্গিমায় শায়িত এক মৃতদেহ। কিম্ভুতকিমাকার এই কারণে যে মৃতদেহ শুয়ে রয়েছে চেয়ারে বসার ভঙ্গিতে দু-পা হাঁটু মুড়ে সে এক আশ্চর্য পোজে। পরিধানের বুশশার্ট, ট্রাউজার্স, আর জুতো। দূর থেকেই জুতোর শুকতলা লক্ষ্য করে চমকে উঠলাম আমি।
সোলটা রাবার সোলের, ঢেউ তোলা! ঠিক যেমনটি একটু আগেই ভিজে মাটিতে দেখে এসেছি।
টেবিলের ওপর পোড়া চুরুট সমেত ছাইদানি, হুইস্কির বোতল, সোডার বোতল, চুরুটের বাক্স আর পটাশিয়াম সায়ানাইডের প্যাকেট।
স্থির চোখে মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে ছিল ইন্দ্রনাথ। জুতোর শুকতলা দেখে আমিও উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। কাছে গিয়ে দেখলাম। দামি জুতো, তলায় ফোম রাবারের স্তর লাগানো অ্যামবাসাডর মোকাসিন।
ত্রিপুরারিবাবু বললেন–আপনারা দেখুন। আমরা পাশের ঘরে আছি। দরকার পড়লে ডাক দেবেন।
বলে, দরজা ভেজিয়ে দিয়ে ভেতর বাড়িতে উধাও হলেন দুই প্রৌঢ় বন্ধু।
সঙ্গে-সঙ্গে আমি চাপা গলায় বললাম–ইন্দ্র, দেখেছ?
দেখেছি। সোফার সামনে দাঁড়িয়ে জবাব দিল ইন্দ্রনাথ।
অবিকল সেই জুতো। কে জানে হয়তো ইনিই কাল রাতে হেঁটেছিলেন জঙ্গলের রাস্তায়।
হ্যাঁ ইনিই। তাতে কোনও সন্দেহ নেই, বলে, বাঁ-পায়ের শুকতলার খাঁজে গাঁথা একটা কাঁটা পেরেক দেখিয়ে বলল, তখনি লক্ষ্য করেছিলাম পেরেকের ছাপ। কিন্তু বলিনি পাছে আবার তর্ক আরম্ভ করে দাও বলে।
কিন্তু পায়ের ছাপটা যদি এই ভদ্রলোকেরই হয়, তাহলে তো সঙ্গে সেই আশ্চর্য ছড়িওলা লোকটিকেও আমাদের দরকার। ভাবছি, কে হতে পারে লোকটা। পাড়ার কেউ নয় তো?
তা হতে পারে। ছাপগুলোও খুব টাটকা, খুব সম্ভব কাল রাতের। আর তা যদি হয় তাহলে ভদ্রলোককে আমাদের প্রয়োজন। কেননা, প্রহ্লাদ চক্রবর্তীকে সবশেষে জীবিত অবস্থায় তিনিই দেখেছেন। অবশ্য তা নির্ভর করছে, কোন সময়ে মাটির ওপর পায়ের ছাপ পড়েছে, তার ওপর।
বলে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লাশটা পরীক্ষা করতে আরম্ভ করল ইন্দ্রনাথ। মৃতদেহ পরীক্ষার বিশেষ কয়েকটা পদ্ধতি আছে আমার এক ডাক্তার বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম। ইন্দ্রনাথ দেখলাম বিদ্যেটায় বেশ ওস্তাদ। তীক্ষ্ণ চোখে দেখল মুখের ভেতর আর তালুর ওপর। তারপর ঘরটা মোটামুটি পরীক্ষা করে নিয়ে গেল পাশের ছোট্ট ওয়ার্কশপে। ল্যাবরেটরি বেসিনের কোণ-টোণগুলোয় অনেকক্ষণ ধরে উঁকিঝুঁকি দিল। তাক থেকে নামিয়ে আনল একটা খালি গেলাস। আলোর সামনে ধরে উল্টেপাল্টে দেখে আবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করল তাকের ওপর। ভিজে গেলাস উলটো করে শুকোতে দেওয়া হয়েছিল, তাই একটা আবছা জলের রেখা গোল হয়ে ফুটে রয়েছে তাকের ওপর। ফিরে এল বৈঠকখানায়। বাইরের দরজার ছিটকিনিটা দেখল নেড়ে।
তারপর বলল নিরাশ মুখে–নাঃ, কিচ্ছু নেই। পটাসিয়াম সায়ানাইডের বড়িগুলো দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, মৃত্যুটা হঠাৎ নয়, দুর্ঘটনা নয়–প্ল্যানমাফিক। চুরুটের বাক্সটা দেখছি আনকোরা, দুটো চুরুট নেই। একটা আধপোড়া অবস্থায় অ্যাসট্রেতে পড়ে–কিন্তু ছাই যা জমেছে তা একটা চুরুটের পক্ষে অনেক বেশি। চল, কৃষ্ণদাসবাবুকে দু-চারটে প্রশ্ন করা যাক।
