তারপর দেখো, দুজোড়া পা সাধারণ পাশাপাশিই চলেছে, কেউ কারও পায়ের ছাপ মাড়িয়ে যায়নি। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটেছে পথ যেখানে সরু। তখন দুজনকে আগেপিছে চলতে হয়েছে। এই রকম দুটো ক্ষেত্রে একবার দেখলাম রাবার সোলের ছাপ মাড়িয়ে গেছে চামড়ার সোল। আরেকবার দেখলাম, চামড়ার সোলের ওপর পড়ছে রাবার সোল। এই থেকেই পাকাপাকি সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে। যে দুজনেই একসঙ্গে পথ চলেছে, মধ্যে মধ্যে আগেপিছে হলেও সঙ্গ ছাড়েনি।
খুবই সোজা, বললাম আমি। তুমি যা বললে, তা হল থিওরির ব্যাপার। পায়ের ছাপ আর তার মানে নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কতকগুলো থিওরি আওড়ালে। কিন্তু এর মধ্যে পর্যবেক্ষণ বা চোখকে ট্রেনিং নেওয়ার প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে?
তিক্তকণ্ঠে ইন্দ্রনাথ জবাব দিলে–বুঝিয়ে দিলে সবই সোজা। আর চোখের ট্রেনিং না থাকলে এটুকুও যে জানা যায় না, তার প্রমাণ তো তুমি নিজেই। বেশ তো, দু-দুটো ছড়ির ছাপ তোমার সামনেই রয়েছে। ভালো করে দ্যাখো, দেখে বলো দেখি আশ্চর্য কিছু দেখতে পাচ্ছে কিনা।
বললাম, সবগুলোই তো একই রকম মনে হচ্ছে। রাবার সোল লোকটার ছড়ি অবশ্য একটু বেশি লম্বা। আর চামড়ার-সোল লোকটার ছড়ির গর্ত একটু বেশি গভীর। কারণটা খুব সম্ভব ছড়িটা ছোট হওয়ার ফলেই চাপ বেশি পড়ছিল ছড়ির ওপর–তাই গর্তও হয়েছে গভীর।
বিদ্রুপের হাসি হেসে ইন্দ্রনাথ বললে–আসল পয়েন্টটাই মিস্ করে গেলে। চাক্ষুষ প্রমাণগুলো দেখবার ক্ষমতা তোমার নেই বলেই এই ব্যর্থতা। পরিষ্কার পয়েন্ট, বিশেষ কয়েকটা ক্ষেত্রে তা রীতিমতো দরকারিও বটে।
বটে? শুনতে পারি পয়েন্টটা কি?
অবশ্যই পারো। তোমাকে ট্রেনিং দেওয়ার জন্যেই আমার এত লেকচার দেওয়া। কিন্তু সিদ্ধান্তে তোমাকে নিজেকেই পৌঁছোতে হবে, আমি বলব না।
পয়েন্টাটা বলবে তো?
বলছি। প্রথমেই দ্যাখো, ছোট ছড়ির ছাপগুলো ছড়িধারীর ডানদিকে পড়েছে। দ্বিতীয়, প্রতিটি ছাপই সামনের দিকে আর ডাইনের দিকে সব চাইতে কম গভীর।
উবু হয়ে বসে আবার দেখলাম ছাপের সারি। ইন্দ্রনাথ ঠিকই বলেছে।
বললাম–কিন্তু তাতে কি প্রমাণিত হয়?
আমার সেইরকম গা-জ্বালানো হাসি হেসে ইন্দ্রনাথ বললে–চাক্ষুস প্রমাণ সামনেই আছে। সবজান্তা বন্ধু, চোখ দিয়ে তার চুলচেরা বিচার কর, তাহলেই পাবে উত্তর।
কিন্তু তোমার হেঁয়ালিটাই তো ধরতে পারলাম না, খেঁকিয়ে উঠে বলি আমি। ছাপগুলো একদিকে কম গভীর, তার কারণ ছড়ির ফেরুলটা সেইদিকেই বেশি ক্ষয়েছে। কিন্তু আবার বলছি, তাতে কি কিছু প্রমাণিত হয়? কেন ছড়ির মালিক ছড়ির ফেরুল একদিকে বেশি খইয়েছে, এটাই কি তোমার সিদ্ধান্ত?
শান্ত হও বন্ধু, শান্ত হও। এত অল্পে ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে গোয়েন্দা হওয়া যায় না। দার্শনিকের মতো নির্বিকার থেকে দাগটার কম গভীরতা নিয়ে মাথা ঘামাও। পয়েন্টটা রীতিমতো ইন্টারেস্টিং।
গোল্লায় যাক তোমার ছড়ির ছাপ। ছড়ি আমার নয়, ছড়ির মালিককেও আমি চিনি না। সুতরাং তা নিয়ে অত রিসার্চেরও দরকার নেই। আরে, ত্রিপুরারিবাবু যে!
জঙ্গল যেখানে শেষ হয়েছে, সেইখানেই ফ্রেমে আঁটা ছবির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন সলিসিটর ত্রিপুরারি আঢ্যি। আমাদের দেখেই হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলেন।
নমস্কার ইন্দ্রনাথবাবু! নমস্কার মৃগাঙ্কবাবু! আমি জানতাম সময় বাঁচাতে এ পথই ধরবেন আপনারা। তাই এগিয়ে নিতে এলাম।
ইন্দ্রনাথ নমস্কার ফিরিয়ে দিয়ে বললে–আপনার টেলিগ্রামে দেখলাম মৃত্যুটা সন্দেহজনক আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে। তদন্তের সুযোগ আছে তো?
আছে কিনা বলতে পারব না। সে আপনারা এক্সপার্টরা বুঝবেন। নিহত ব্যক্তির পঞ্চাশ হাজার টাকার লাইফ ইন্সিওর্যান্স ছিল। মৃত্যুটা যদি আত্মহত্যা বলেই প্রমাণিত হয়ে যায়, তাহলে এসটেটের পঞ্চাশ হাজার টাকা লোকসান হয়ে যাচ্ছে। সেইজন্যেই ভাবছিলাম উপযুক্ত ফি দিয়ে এক্সপার্টকে দিয়ে যদি কিছু প্রমাণ করা যায় মৃত্যুটা নেহাতটা দুর্ঘটনা, তাহলে পঞ্চাশ হাজার টাকা এসটেটে চলে আসে। বলে ধূর্ত চোখ নাচিয়ে অর্থব্যঞ্জক হাসি হাসলেন ত্রিপুরারি আঢ্যি।
প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতটা এড়িয়ে গেল ইন্দ্রনাথ। উৎকোচ-প্রস্তাবে কঠিন হয়ে উঠল চোয়ালের রেখা।
বললে নীরস স্বরে–কেসটার আদ্যোপান্ত বলুন।
যেতে যেতেই বলছি। মৃত ব্যক্তির নাম প্রহ্লাদ চক্রবর্তী। আমার বন্ধু সলিসিটর কৃষ্ণদাস চক্রবর্তীর ভাই। আজ সকালে অফিসে গিয়ে খবর পেয়েই আমার কাছে দৌড়ে আসে কৃষ্ণদাস। ওর সঙ্গেই এসেছি এখানে। কৃষ্ণদাস বাড়ির মধ্যে অপেক্ষা করছে আপনাদের জন্যে।
গত রাতে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে এক চক্কর বেড়াতে বেরিয়েছিল প্রহ্লাদ। গরমকালে খাওয়ার পর বেড়ানো ওর চিরকালের স্বভাব। চাকরবাকররা দেখেছে তাকে বেরিয়ে যেতে। তারপর আর কেউ তাকে জীবিত অবস্থায় দেখেনি। কখন যে সে ফিরে এসেছে, তা কেউ জানে না। সেটা অবশ্য স্বাভাবিক। কেননা, প্রহ্লাদের বৈঠকখানা, ছোট্ট কারখানা, পড়ার ঘর আর মিউজিয়াম বাড়ি থেকে আলাদা। লাগোয়া হওয়ার ফলে একটা দরজা খুললেই এ-বাড়ি ও-বাড়ি এক হয়ে যায়। বৈঠকখানায় ঢোকার আলাদা দরজা আছে। সাধারণত রাত্রে বেড়িয়ে ফিরে এই দরজা দিয়েই বাড়ির মধ্যে ঢুকে সিধে শুতে চলে যেত প্রহ্লাদ–চাকরবাকররা জানতেও পারত না।
