ইন্দ্র বললে, আশু দাস, আপনার জ্ঞান এখন টনটনে। পম্পাকে যে আপনিই খুন করেছেন, সে প্রমাণ আমাদের হাতে। কিন্তু, দড়ির ফাস না লাগিয়ে স্কার্ফ দিয়ে দমবন্ধ করলেন কেন?
হিমচোখে ইন্দ্রনাথকে নিরীক্ষণ করে নিয়ে আশু দাস বললে, পম্পার লাভার নাকি?
আজ্ঞে না। তবে, আপনার মতোই ব্যাচেলর–কিন্তু চরিত্র খোয়াইনি। পম্পা সান্যাল তো বেলি ড্যান্সার। হোটেলে-হোটেলে নাচ দেখাত। লাকি নীলকান্তমণির খোঁজে পেছনে লেগেছিলেন? রিয়্যাল লাভ নয়? ছি!
পাওয়া গেছে নীলকান্ত?
গেছে, ছোট্ট হাসল ইন্দ্রনাথ, এখুনি দেখবেন।
ঘরেই ছিল?
ছিল। আপনার চোখের সামনেই–আপনার হাতের মুঠোয়।
আমার হাতের মুঠোয়?
আমার প্রথম প্রশ্নের জবাব কিন্তু এখনও পাইনি। সঙ্গে নাইলন দড়ি নিয়ে গেছিলেন গলায় ফঁস লাগাবেন বলে। কিন্তু দড়ি রইল পড়ে–পাঁচ দিলেন স্কার্ফ দিয়ে। কেন?
আশু দাস নিরুত্তর।
জবাবটা দিল ইন্দ্রনাথই, স্কার্ফের ঝুমকোর গিট খুললেই নীলকান্তমণি পাবেন বলে। তাই না?
আমাকে তো তাই বলল।
হাতও চালালেন সঙ্গে-সঙ্গে। স্কার্ফ দিয়েই খতম। গিঁট খুললেন–দেখলেন মাউন্ট মেরির লকেট। ঘর তছনছ করলেন। কিছু না পেয়ে খুনের সব প্রমাণ গুছিয়ে নিলেন প্যাকেটে। এই সেই প্যাকেট। এর মধ্যে রাখলেন মোমবাতি স্ট্যান্ড। এই সেই স্ট্যান্ড। জমাট মোম খোদল থেকে কেন বের করলেন না আশু দাস?
বলে, খোঁদলের মোম খুঁচিয়ে বের করল ইন্দ্রনাথ।
দেখা গেল, নীল সূর্যের মতোন জুলন্ত সেই পাথর…নীলকান্ত মণি।
.
নবকল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত। (শারদীয় সংখ্যা, ১৪০২)
নেবুচানেজারের শীলমোহর
ইন্দ্রনাথ, শার্লক হোমস তো চুরুটের ছাই নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছে, তুমি বরং লেখো পায়ের ছাপ নিয়ে। আখেরে কাজ দেবে। বললাম আমি।
ইন্দ্রনাথ গম্ভীর হয়ে বললে–লিখব না এমন কোনও কথা নেই। লিখলেই বুঝবে সময় আর এনার্জি ব্যয় করে গোয়েন্দা গল্প লেখার নামে ছাইভস্ম না লিখে এদিকে মন দিলে কাজের কাজ করতে।
উত্তপ্ত স্বরে বললাম–লিখলেই পারো। গোয়েন্দা গল্প যদি এতই অপাঠ্য হত, তাহলে–
গোয়েন্দা গল্প যে অপাঠ্য, তা আমি বলিনি। আমি শুধু বলছি, দুর্বল কলমে ভালো ভালো সেগুলো সস্তার রোমাঞ্চ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ডিটেকশন একাধারে আর্ট এবং সায়ান্স। সে জন্যে দরকার শাণিত পর্যবেক্ষণ শক্তি। তা না হলে নামকরা আর্টিস্ট আর সায়ান্টিস্টরা নামকরা ডিটেকটিভ হতে পারত। কিন্তু তোমাদের লেখায় অতি উন্নত ডিটেকশনের বাষ্পটুকুও থাকে না, থাকে খানিকটা সস্তার চমক আর সাসপেন্স। পায়ের ছাপ নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে বলে আমাকে ঠাট্টা করছ, কারণ হাঁটতে হাঁটতে পায়ের ছাপের দিকে নজর রেখেছি। কিন্তু বন্ধু, ছাপগুলো তো তোমার সামনেও আছে। চোখ তোমারও আছে। পায়ের মালিকদের সম্বন্ধে কিছু বলো দেখি শুনি।
জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে শর্টকাট করতে গিয়ে ভিজে মাটির ওপর অগণিত পদচিহ্ন ঘাড় হেঁট করে দেখতে দেখতে যাচ্ছিল ইন্দ্রনাথ। তাই টিপ্পনী কাটতে গিয়ে সত্যি সত্যিই চটিয়ে দিলাম বন্ধুবরকে। জঙ্গলের পথে না এলেও চলত। কিন্তু স্টেশনের এক কুলিই পথটা বাতলে দিলে। আর শুরু হল ওর পদচিহ্ন পর্যবেক্ষণ। মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল ছোটখাট গর্তের সামনে। পথসঙ্গী যদি এভাবে পথ চলে, তাহলে বিরক্ত হওয়া স্বাভাবিক। ইন্দ্রনাথের কিন্তু হৃক্ষেপ ছিল না তাতে। তন্ময় হয়ে পদচিহ্ন দেখতে দেখতে যেন মনে মনে আঁকছিল পায়ের মালিকদের চেহারা আর চরিত্রের ছবি।
বিব্রত হয়ে বললাম–খালি পা হলে বলা যেত। কিন্তু জুতো পরলে অসুবিধে আছে। যেমন এই ছাপটা। ঢেউতোলা রাবারের সোল। এর বেশি আর কিছু বলা সম্ভব নয়।
ভুল। জুতো পরলে বরং আরও তথ্য জানা যায়। এ জন্যে শুধু ভাবলে চলে না, চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখার ক্ষমতাকে ট্রেনিং দিয়ে ধারালো করতে হয়। এখানকার মাটি সামান্য ভিজে, ছাপগুলো মোমের ছাঁচের মতোই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। ঢেউতোলা রাবার শোলের জুতো দামি জুতো। আঙুলের ডগা থেকে গোড়ালি পর্যন্ত সমস্ত ছাপটা সমানভাবে পড়েছে অর্থাৎ জুতোটার তলায় স্পঞ্জ লাগানো অ্যামবাসাডর সু। এ জুতো সাধারণ লোকে পরে না। সঙ্গীর সম্বন্ধে কিছু বলতে পারো?
সঙ্গী! পাশাপাশি দুজোড়া ছাপ রয়েছে বলেই কি একজন অপরজনের সঙ্গী?
পায়ের ছাপ তাই বলছে! প্রথম থেকেই যদি ছাপগুলো লক্ষ্য করতে, তাহলে বুঝতে কেন এ কথা বললাম। প্রথমেই ধরা যাক পদক্ষেপ। দুজনেই খুব লম্বা–সেটা অবশ্য বোঝা যাচ্ছে জুতোর মাপ থেকে, কিন্তু লম্বা হওয়া সত্ত্বেও দুজনেই ছোট ছোট পা ফেলে হেঁটেছে। কেন?
কেন? প্রতিধ্বনি করলাম আমি।
যার পায়ে চামড়ার জুতো, তার ছোট ছোট পা ফেলার একটা কারণ আছে। কারণটা বোঝা যাচ্ছে ছড়ি ফেলার ধরন দেখে। ছড়িটা ধরা হয়েছে আড়ষ্টভাবে প্রতিবারই ছড়ির ওপর একটু ভরও দেওয়া হয়েছে–যেন পথ চলতে ছড়িটা বিলক্ষণভাবে সাহায্য করেছে। ছড়ির দাগ রয়েছে প্রতি দু-পা অন্তর। যখনই বাঁ-পা মাটিতে পড়েছে, তখনই ছড়িও পড়েছে বাঁ-পায়ের উল্টোদিকে। যার সোজা মানে এই যে, পায়ের মালিক বয়েসে প্রবীণ, কাহিল অথবা অক্ষম। কিন্তু রাবার-সোল জুতো যার পায়ে, সে সাধারণ ভাবেই হেঁটেছে–প্রতি চার পা অন্তর একবার মাটি ছুঁয়েছে ছড়ি। অস্বাভাবিক ছোট পদক্ষেপে হাঁটার কারণটা শারীরিক নয়, সঙ্গীর পায়ে পা মিলিয়ে চলতে হচ্ছে। বলেই।
