বললে, লকেট। ওপরে লেখা রয়েছে মাউন্ট মেরি। বম্বের কাছে এই চার্চে এরকম লকেট পাওয়া যায়। গলায় পরে থাকলে কপাল খুলে যায়–চন্দ্রকান্ত মল্লিক, মুখ দেখেই বুঝেছি, আপনি লকেট নয়–অন্য কিছু আশা করেছিলেন। তাই এত কষ্ট করে জিনিসগুলো বয়ে এনেছেন। খুনিকে আপনি চেনেন?
চিনি। নাম বলব না।
তার কাছেই জেনেছেন, মেয়েটাকে খুন করলে পাওয়া যাবে অত্যন্ত দামি একটা জিনিস। সাইজে ছোট হলেও খুব দামি।–রত্ন?
নীলকান্তমণি। দারুণ লাকি স্টোন। কিন্তু মেয়েটার নাম-ঠিকানা বলেনি পাছে আমি নীলকান্ত হাতিয়ে নিই। খুনির ঠিকানা? মাপ করবেন, আমরা নিচের তলার মানুষ, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা কখনও করি না। গঙ্গার ধারে কাছেই থাকে। খুঁজে নিন। এখন বাজে আটটা। পুলিশ লাশ নিয়ে নিশ্চয় মাথা ঘামাচ্ছে। যান, দেখুন যদি পান নীলকান্তমণি।
খুনি পায়নি?
না। মেয়েটার ঘরেই আছে। ভালো কথা, প্যাকেটের মধ্যে পেতলের মোমবাতি স্ট্যান্ড কেন ছিল, সেটা কিন্তু বলেননি।
প্যাকেট ভারি করবার জন্যে–যাতে জলে পড়েই ডুবে যায়।
কিন্তু পড়ল লঞ্চের ওপর। কার লঞ্চ? সরি, সিক্রেট আউট করা যাবে না। প্যাকেটের নাইলন দড়ির ব্যাখ্যাটা আমার মুখেই শুনে নিন। খুনি ওই দড়ি গলায় পেঁচিয়ে ঘাড় পর্যন্ত ভেঙে দেয়–ওস্তাদ কারিগর। দড়িটা সঙ্গে এনেছিল সেই কারণেই। চললাম।
বলে, মিঠে হেসে, লম্বা-লম্বা পা ফেলে, ঘর থেকে বেরিয়ে গেল চন্দ্রকান্ত মল্লিক।
পুলিশের দপ্তর থেকে খবর নিয়ে নটা নাগাদ অকুস্থলে পৌঁছে গেল ইন্দ্রনাথ। রেসকোর্সের ধারে, ফ্ল্যাটবাড়ির তিনতলার লণ্ডভণ্ড ঘর, শুয়ে আছে মেয়েটা। বয়স তিরিশের মধ্যে। ফরসা, সুন্দরী, সুসজ্জিতা। প্রসাধনের পুরু প্রলেপ ভেদ করে ফুটে বেরুচ্ছে ভয়াবহ আতঙ্ক। পরপর দুবার ছোরা মারা হয়েছে বুকে। গোলাপী সালোয়ার কামিজ রক্তে ভিজে গায়ে লেপটে রয়েছে। ওড়নার বদলে লাল সিল্কের স্কার্ফ ব্যবহার করে মেয়েটি। কঁচি দিয়ে কাটা আধখানা স্কার্ফ চেপে রয়েছে শক্ত মুঠোর মধ্যে।
গলায় কিন্তু নাইলন দড়ির ফঁস লাগানো হয়নি। সাদা কোনও দাগ নেই, পুলিশ ডাক্তার বললেন, স্কার্ফ পেঁচিয়ে আগে দমবন্ধ করা হয়েছে–ছোরা মারা হয়েছে তার পরে।
তদন্তকারী অফিসার বীরেন শাসমলকে ইন্দ্রনাথ বললে, খুনিকে ধরে দেব আজ রাতেই। কিন্তু আমার একটা কথা রাখতে হবে।
বলুন?
কাগজের এই প্যাকেটটা ততক্ষণ কাছে রাখব। ফেরত দেব খুনির সামনে।
ধূর্ত চোখে সন্দেহ বিছিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রাজি হলেন আই. ও.।
তখন বাজে এগারোটা। বারোটা নাগাদ গঙ্গার ধারে এক নামী কুরিয়ার-এর অফিসে দেখা গেল ইন্দ্রনাথকে। ম্যানেজারের চেম্বারে বসে বললে, রেসের এই সান্ধ-দৈনিক কোন কোম্পানি পৌঁছে দেয় বাড়ি-বাড়ি?
ম্যানেজার খুব চৌকস ছোকরা। নামেই মাদ্রাজি–বাংলা বলে যে-কোনও বাঙালির চাইতে ভালো। প্যাকেটের কাগজ দেখেই বললে, আপনাকে বেশি ঘুরতে হবে না। একাগজ আমরাই ঘরে ঘরে পৌঁছে দিই–আমাদের এলাকায়।
গত সন্ধ্যায় যাদের ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তাদের নাম-ঠিকানা দেবেন?
নিশ্চয়।
আটজনের নাম-ঠিকানা নিয়ে বেরিয়ে গেল ইন্দ্রনাথ। সবই আলিপুর, খিদিরপুর, রেসকোর্স অঞ্চলে। ট্যাক্সি নিয়ে চতুর্থ ঠিকানায় পৌঁছে দেখল, সেটাও ফ্ল্যাটবাড়ি। খিদিরপুর অঞ্চলে। কেয়ারটেকার বললে, আশু দাস? কাল রাত আটটায় কাগজ ডেলিভারি হয়েছে নটায় আমার কাছ থেকে নিয়ে বেরিয়ে গেছিলেন, ফিরেছেন রাত বারোটা নাগাদ।
ফ্ল্যাটে আছেন এখন?
খেতে বেরিয়েছেন। একা মানুষ তো–ব্যাচেলর। ফিরবেন এখুনি।
তাহলে বসে যাই, বলে কেয়ারটেকারের টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে পড়ল ইন্দ্রনাথ।
আধঘণ্টাও গেল না। বটলগ্রীন কালারের একটা মারুতি ঢুকল উঠোনে। গাড়ি থেকে নামল ব্লু-জিনস্-এর প্যান্ট আর ইট রঙের ডবল-পকেট শার্ট পরা এক কৃশকায় পুরুষ। টকটকে ফরসা, হিলহিলে শরীর এবং বিলক্ষণ সুদর্শন। যদিও বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। সরু গোঁফের দু-চারটে সাদা চুলে তার আভাস রয়েছে।
একহাতে একটা ছড়ি নিয়ে সে দরজার সামনে এগিয়ে আসতেই কেয়ারটেকার বললে, আসছেন।
ভেতরে ঢুকতেই উঠে দাঁড়াল ইন্দ্রনাথ। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা হিরো-হিরো চেহারার এক মানুষ তারই দিকে চেয়ে আছে দেখে প্রথমে থমকে দাঁড়াল আশু দাস। চোখে হিম চাহনি।
পরের মুহূর্তেই ঝট করে সরে গিয়ে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল পাশের দরজায়। ডানহাতে ছড়িটা সামনে বাড়িয়ে ধরে বাঁ-হাত চালান করলে পেছনে–খুঁজছে দরজার হাতল।
ইন্দ্রনাথ প্রথমে তাই ভেবেছিল। দরজার হাতল ঘুরিয়ে ভেতরে সটকান দেওয়ার ধান্দায় আছে আশু দাস। তাই ছড়ির ভয় না করে দু-পা সামনে এগোতেই মনে পড়ে গেল নিজেরই কথা সকালেই বলেছিল চন্দ্রনাথকে।
খুনি ল্যাটা।
নিমেষে একপাশে ছিটকে গেছিল বলেই পর-পর দুটো বুলেটের কোনওটাই গায়ে লাগেনি। হিপ পকেট থেকে এত দ্রুত রিভলভার বের করার দৃশ্য কেবল সিনেমাতেই দেখা যায়।
তৃতীয়বার ট্রিগার টেপবার সময় দেয়নি ইন্দ্রনাথ।
আধঘণ্টার মধ্যে এসে গেলেন আই. ও. বীরেন শাসমল। ইন্দ্রনাথের রামরা খেয়ে বেহুঁশ আশু দাসকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেলেন তারই ফ্ল্যাটে। টুরুম ফ্ল্যাট। খাটের ওপরেই পাওয়া গেল নীল নাইলন দড়ির একটা গোলা। প্যাকেটের দড়ি যে এই গোলা থেকেই কেটে নেওয়া হয়েছে, তা কাটা প্রান্ত দুটো মেলাতেই পরিষ্কার হয়ে গেল।
