এ তো ভারি মজার খেলা। নাকি বদমায়েশির যোগসাজস?
এইভাবে মোট উনিশবার ফুল ফেলা হল, উনিশবার দেওয়াল লিখন হল–তারপরেই আধবুড়ো লোকটা রাস্তা পেরিয়ে চলে গেল ছেলেটার কাছে। প্যান্টের পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে ছেলেটা দিল আধবুড়োর হাতে। দুজনে মিলে দরজা খুলে ঢুকে গেল একটা বাড়ির মধ্যে।
বাড়িটা তিনতলা। নিচে দোকানপাট। ওপরের জানলাগুলো বন্ধ।
সদর দরজা খোলাই রয়েছে। ইন্দ্রনাথও ঢুকে গেল ভেতরে। সিমেন্ট বাঁধাই পুরোনো সিঁড়ি ওপরে উঠেছে দরজার ডানপাশ থেকে। দোতলায় চাতালে দাঁড়িয়ে দেখল, লম্বা গলিপথ অন্ধকার। সব ঘর বন্ধ। এমন সময় কানে এল দুমদাম শব্দ তিনতলা থেকে। জিনিসপত্র ভাঙচুর চলছে।
এক-এক লাফে চারটে করে ধাপ টপকে তিনতলার চাতালে পৌঁছে গেল ইন্দ্র। লম্বা গলিপথে আলো এসে পড়েছে একটা খোলা দরজা দিয়ে। ঝড়ের বেগে পৌঁছল দরজার সামনে, দেখল সেই আধবুড়ো আর ছেলেটা দুখানা চেয়ার মাথার ওপর তুলে মেঝেতে আছড়ে-আছড়ে ভাঙছে।
হুঙ্কার ছেড়ে চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিল ইন্দ্রনাথ। সঙ্গে-সঙ্গে পেছনে শোনা গেল কৌতুক-তরল কণ্ঠস্বর–সুপ্রভাত, ইন্দ্রনাথ রুদ্র।
সবেগে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ইন্দ্র। দেখেছিল, কালো চশমাপরা, কালো দাড়িওলা, ঘি রঙের সাফারি সুট গায়ে এক সুদর্শন পুরুষ দাঁত বের করে হাসছে।
কড়া গলায় বলল ইন্দ্র, কে আপনি? এ সব কী হচ্ছে?
পকেট থেকে একখানা একশো টাকার নোট বের করে আধবুড়ো আর ছেলেটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল সুদর্শন পুরুষ, তোমাদের কাজ শেষ। একশো টাকায় রফা হয়েছিল–দিয়ে দিলাম। যাও।
কান এঁটো-করা হাসি হেসে দুই মূর্তিমান বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। অক্ষত একটা চেয়ার টেনে নিয়ে টেবিলের পাশে বসল সুন্দরদেহী পুরুষ। বললে, বসুন ওই চেয়ারটায়। আস্ত আছে। চিনতে পারলেন না আমাকে?
চোয়াল শক্ত করে চেয়ে রইল ইন্দ্রনাথ। বুঝল, বিরাট একটা রঙ্গ হচ্ছে তাকে নিয়ে।
সুদর্শন পুরুষ কালো চশমাটা খুলে বললে, এবার?
পৈশাচিক ওই বেড়াল-চোখ কি ভোলা যায়? দাঁতে দাঁত পিষে ইন্দ্রনাথ বললে, চন্দ্রকান্ত মল্লিক?
আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনার ভাষায় আমি নাকি পাঁকাল মাছ। ধরেও ধরা যায় না। অবশ্য আমার মতোন সমাজবিরোধীর সঙ্গে টক্কর দিয়ে আপনি বেজায় খুশি হন–ঠিক কিনা?
ইন্দ্রনাথ বললে, ইয়ার্কি হচ্ছে?
চন্দ্রকান্ত বললে, জীবনটাই বিষ হয়ে গেল আমার। আপনার সঙ্গে ইয়ার্কি? ছিঃ! ছিঃ! আমি ডাকলে কি আপনি আসতেন? আসতেন না। তাই খেলিয়ে আনতে হল। রাস্তায় যদি না বেরোতেন– ওই দুজন অন্য খেলা দেখাত।
দরকারটা কী?
আপনাকে একটা মাথার খোরাক উপহার দিতে চাই–যা পেলে আপনি আনন্দ পান।
ইন্দ্রনাথের এক চোখে বিরক্তি, আর এক চোখে কৌতূহল দেখা গেল।
চন্দ্রকান্ত কালো চশমাটা পরে নিয়ে বললে, কাল রাত এগারোটা নাগাদ বিদ্যাসাগর সেতুর তলা দিয়ে একটা লঞ্চ যাচ্ছিল। সেতুর ওপর থেকে একটা কাগজের প্যাকেট ফেলা হয় গঙ্গার দিকে কিন্তু সেটা পড়ে লঞ্চের ওপর। এই সেই প্যাকেট।
নীল নাইলন দড়ি দিয়ে বাঁধা একটা কাগজের প্যাকেট টেবিলের ওপর রাখল চন্দ্রকান্ত মল্লিক। ইন্দ্রনাথ তাতে হাত দিল না। মুচকি হাসল চন্দ্রকান্ত। খুলল নাইলন দড়ির গিঁট। দুহাতে কাগজটাকে চেপে-চেপে মেলে ধরল টেবিলের ওপর। জিনিসগুলোকে সাজিয়ে রাখল কাগজের পাশে।
একটা ছোট ছোরা–ফলাতে লেগে শুকনো রক্ত। একটা পেতলের মোমবাতি স্ট্যান্ড বেশ ভারি। একটা লাল সিল্কের স্কার্ফের আধখানা–তাতেও জায়গায়-জায়গায় লেগে শুকনো রক্ত। আর, একটা কঁচি।
কেউ আর কথা বলছে না। ইন্দ্রনাথ চেয়ে আছে জিনিসগুলোর দিকে–চন্দ্রকান্ত চেয়ে আছে ইন্দ্রনাথের দিকে–তার মুখে দুজ্ঞেয় হাসি।
ইন্দ্রনাথের চোখ কিন্তু শক্ত হয়ে উঠেছে।
খুব আস্তে সে বললে, খুন হয়েছে একটি মেয়ে। পোশাকে শৌখিন। বলে, কাগজটা উলটেপালটে দেখল, খুনি রেস খেলে। রেসের মরশুমে সন্ধের দিকে এই কাগজ বেরোয়। কিছু বাড়িতে কুরিয়ার ডেলিভারি দেয়। ব্রাউন র্যাপারের একটা কোণ আঠা লেগে সেঁটে রয়েছে কাগজে এই ব্যাপারে লেখা ছিল ঠিকানা। কাগজ রেখে তুলে নিল আধখানা স্কার্ফ। চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে রৌদ্রালোকিত জানলার কাঁচে চেপে ধরতেই দেখা গেল হাতের ছাপটা। রক্তমাখা হাতে স্কার্ফ খামচে ধরার ফলে পাঞ্জার ছাপ উঠেছে অসমানভাবে–কিন্তু এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে, ছাপটা ডানহাতের।
ইন্দ্র বললে, খুনি ছোরা মারার পর ডানহাতে স্কার্ফ খামচে ধরে বাঁ-হাতে কঁচি দিয়ে কেটেছিল–এই সেই কাঁচি। খুনি ল্যাটা।
তন্ময় হয়ে শুনছে চন্দ্রকান্ত। মুখের হাসি অম্লান, তারপর?
ইন্দ্রনাথ তখন দেখছে, স্কার্ফের প্রান্তের লাল ঝুমকো। সন্তর্পণে প্রতিটি লাল সুতো ফাঁক করে দেখবার পর খসে পড়ল একটা ছোট্ট জিনিস–খুট করে পড়ল মেঝেতে।
সঙ্গে-সঙ্গে চিতাবাঘের মতোন চেয়ার থেকে ছিটকে এসে ছোঁ মারতে গেছিল চন্দ্রকান্ত– তার আগেই বস্তুটা বাঁ-হাতে তুলে নিয়ে ডানহাত সামনে বাড়িয়ে ধরে বললে ইন্দ্রনাথ, তিষ্ঠ। আর এগোলেই বিপদ।
বক্তা যে মিথ্যে বলছে না, তা বুঝল শ্রোতা। দাঁড়িয়ে গেল ওইখানেই। এখন কালো চশমার আড়ালে তার চোখ ধকধক করে জ্বলছে।
ইন্দ্র বললে, বুদ্ধি আছে তাহলে। বলেই, দু-হাতে বস্তুটা ধরল চোখের সামনে। লাল সুতো দিয়ে ঘন প্যাটার্ন বুনে মোড়া হয়েছে জিনিসটাকে। নখ দিয়ে খুঁচিয়ে সুতো সরিয়ে দেখে নিল ইন্দ্র। দেখাল চন্দ্রকান্তকে।
