সিগারেটে আবার একটা জম্পেশ টান দিলাম। বললাম–তোমার শেষ অবস্থা দেখে শেয়াল কুকুরেও কাঁদবে হে। তোমার ধারণা নিশ্চয় অন্যরকম। ভেবেছ অনেক টাকা পাবে। পায়ের ওপর পা তুলে কাটাবে শেষ জীবন। সবাই তাই ভাবে। মরীচিৎকার পেছনে সবাই দৌড়োয়। তোমার কপালে যে কি দুর্গতি–
গলায় এতটুকু আঁঝ দেখালো না গালপাট্টা। সহজভাবে বলল–সিন্দুক খুলুন। নইলে মরবেন।
আমি আওয়াজ করেই হেসে উঠলাম–মরবার সময়ে আর ঠাট্টা করো না, মস্তান। সিন্দুক খুললেও মরতে হবে, না খুললেও মরতে হবে। তাই না?
আধ মিনিটটাক চেয়ে রইল গালপাট্টা। তারপর বলল–কী করতে চান গেলাস নিয়ে?
আমি জানি, এখন তুমি আমাকে মারতে পারবে না। ছেড়ে দেবে। আমি সঙ্গে সঙ্গে গেলাস সমেত হাজির হব প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিতে৷ গেলাস থেকে ফটো তুলে নেব তোমার আঙুলের ছাপের। সেই ফটোর সঙ্গে একটা কাগজে লিখে রাখব আজকের ঘটনার বিবরণ। চেহারার বর্ণনা। আরও অনেক কিছু। আঙুলের ছাপ আর তোমার কীর্তি কাহিনি লেখা কাগজটা একটা খামে ভরে গালা দিয়ে মুখ এঁটে দেব। আমার অ্যাটর্নিকে বলে রাখব, যদি কখনও আমার শোচনীয় মৃত্যু ঘটে এবং মৃত্যুর কারণ অ্যাকসিডেন্ট বলেও মনে হয়, যেন খামটা পুলিশ দপ্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়।
একই ভাবে চেয়ে রইল গালপাট্টা। তারপর বুকভর্তি শ্বাস নিয়ে বললে–দরকার কি অত হাঙ্গামার? আমি চলে যাচ্ছি। জীবনে আমার ছায়াও আর দেখবেন না।
মাথা নেড়ে বললাম–তা হয় না। আমার ভবিষ্যৎ আমাকেই দেখতে হবে তো। গায়ে যাতে আঁচড়টি না লাগে, তার জন্যেই এই প্ল্যান।
কি যেন ভাবল গালপাট্টা। বলল–সোজা পুলিশের কাছে যাচ্ছেন না কেন?
কারণ আছে বইকি।
দুশ্চিন্তায় কালো হয়ে এল গালপাট্টার মুখ। চোখ নামাল হাতের রিভলভারের ওপর। আপন মনেই ঘাড় নাড়ল একবার। তারপর রিভলভার রেখে দিল প্যান্টের পকেটে। বলল–আমি না হয় যাচ্ছি। কিন্তু আপনার বেবুশ্যে বউটা তো ছাড়বে না। আবার কাউকে টাকা খাইয়ে পাঠাবে আপনাকে খতম করার জন্যে।
তা তো পাঠাবেই।
মারবে অন্য লোক, আর ফাঁসিতে ঝুলবো আমি?
তাই তো হবে।
গালপাট্টার মুখে আর কথা নেই।
অবশ্য নাও হতে পারে, বললাম আমি। ধরো যদি অলকানন্দা আর নতুন খুনে জোটাতে পারে।
ভাড়াটে খুনের কি অভাব আছে কলকাতায়? ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না। আর আপনার গোলগাপ্পা বউটা তো মুড়িমুড়কির মতো টাকা ছড়ায়।
যদি আর ছড়াতে না পারে?
টাকা তো আপনার…ওঃ! বলেই একদম চুপ মেরে গেল গালপাট্টা।
মিষ্টি মিষ্টি হাসলাম আমি–মাথায় ঢুকেছে?
গালপাট্টা জবাব দিল না। তবে ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো দেখলেও যেন আকুল হয়–এর চোখেও দেখলাম সেই আলো–আশার আলো।
বললাম–অলকানন্দা এখন কোথায়, তুমি জানো?
জানি। রেডনাইট ক্লাবে। রাত এগারোটা পর্যন্ত ওখানেই থাকবে।
রাত এগারোটা? ফাইন। ভালো সময়। তার ওপর অমাবস্যার রাত। অন্ধকারে কাছের মানুষও দেখা যাবে না। রেডনাইট ক্লাবের ঠিকানা জানো?
না। গালপাট্টার চোখ ঠেলে বেরিয়ে এল।
সদর স্ট্রিটে, বাড়ির নম্বরটা বললাম। চার তলার ফ্ল্যাটে কুখ্যাত নাইট ক্লাব। তোমার চেনা উচিত ছিল।
আধ মিনিট দুজনে তাকিয়ে রইলাম দুজনের পানে।
বললাম খুব মিষ্টি করে–তোমার জান বাঁচানোর জন্যে আর একটা জান নিতে হবে। অলকানন্দা বেঁচে থাকলে তুমি মরবে।
এগারোটার সময়ে আপনাকে কোথায় পাবো, স্যার? উঠে দাঁড়িয়ে বলল গালপাট্টা।
আমার ক্লাবে। চার পাঁচ জন বন্ধুকে নিয়ে তাস পিটব। খবর যখন পৌঁছোবে, সবাই মিলেই শুনব। একটু থেমে ফের বললাম–কী খবর মস্তান?
আপনার বউ গুলি খেয়ে মরেছে। নেকড়ের মতো হেসে ফেলল গালপাট্টা। একটা কথা জিগ্যেস করব, স্যার?
করো।
বউকে ভালোবাসেন?
ককটেল টেবিলে জেড পাথরের ভারী সুন্দর একটা নারী মূর্তি সাজানো ছিল। মূর্তিটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে-দেখতে বললাম–অনেক দাম দিয়ে অনেক শখ করে কিনেছিলাম এটা। এখন শখ মিটে গেছে। আর ভালো লাগে না। ভাবছি ফেলে দেব। নতুন মূর্তি কিনব।
বিদায় হল গালপাট্টা। হাতে অনেক সময়। ক্লাবে যাওয়ার আগে মদের গেলাসটা ডিটেকটিভ এজেন্সিতে জমা দিয়ে এলাম।
সিন্দুকে যে গেলাস রেখেছিলাম–সেটা নয়। সে গেলাসে আমার আঙুলের ছাপ ছাড়া আর কোনও ছাপ ছিল না।
যে গেলাসটা গালপাট্টা ককটেল টেবিলে রেখে বিদায় নিল–নিলাম সেই গেলাস।
গেলাসের কাছে শুধু চোখেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল মস্তানের আঙুলের ছাপ।
* রহস্য পত্রিকায় প্রকাশিত।
নিরুদ্দেশ নীলকান্তমণি
ইন্দ্রনাথের একটা বদখেয়াল আছে। হাতে যখন কোনও কাজ না থাকে, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। তাতে ওর মন প্রসন্ন থাকে।
এইভাবেই একদিন বেরিয়েছিল বাড়ি থেকে। তখন সকাল সাতটা। চলে এল বেলেঘাটা মেন রোডে। চলল শিয়ালদার দিকে।
মিনিট কয়েকের মধ্যেই খেয়াল হল, ওর হাত দশেক দূরে সামনে হাঁটছে লুঙ্গিপরা আধবুড়ো একটা লোক। গায়ে হলুদ হাতকাটা গেঞ্জি। তার হাতে একটা সাদা কাপড়ের থলি। মাঝে-মাঝে সে থমকে দাঁড়াচ্ছে, হেঁট হচ্ছে, থলি থেকে রাধাচূড়া ফুল বের করে ফুটপাতে ফেলছে, ফের সিধে হয়ে হাঁটছে।
পাগল নাকি? কিন্তু আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার যে দেখা যাচ্ছে উলটোদিকের ফুটপাতে। সেখানে হনহন করে হাঁটছে হাফপ্যান্ট পরা একটি ছেলে। বছর বারো বয়স। গা খালি। আশপাশের বস্তির ছেলে নিশ্চয়। এ-ফুটপাতের আধবুড়ো যেই হেঁট হয়ে ফুল ফেলছে, ও ফুটপাতের ছেলেটা তক্ষুনি খড়ি দিয়ে পাশের বাড়ির দেওয়ালে গোল কেটে মাঝখানে ক্রুশ চিহ্ন দিচ্ছে।
