ফ্রান্সের নামকরা পেন্টারের আঁকা ছবি। দাম কত জানো?
গালপাট্টা নীরব।
চল্লিশ হাজার টাকা, বললাম আমি।
শুনেই, গালপাট্টার নির্বোধ চাহনি চকিতের জন্যে ফের নিবদ্ধ হল অয়েল পেন্টিংয়ের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে পিচ্ছিল চাহনি পিছলে ফিরে এল আমার ওপর।
বলল–লোভ দেখাচ্ছেন? চল্লিশ হাজার টাকা চাট্টিখানি কথা নয়। তবে কি জানেন, আগে আমার জান, পরে টাকা। ছবি নিয়ে ফ্যাসাদে পড়ি আর কি। ও ছবি যেখানে নিয়ে যাবো, আপনার চিহ্নও সঙ্গে সঙ্গে যাবে, তারপর? ফাঁসি কাঠ? না, স্যার না। একটু থামল গালপাট্টা। হাসল। টোল পড়ল ফুলো গালে-বুঝেছি।
কী বুঝেছি।
ছবি দিয়ে প্রাণটা ফেরত চাইছেন?
ক্ষতি কি?
গালপাট্টা সবেগে ঘাড় নাড়ল বাচ্চা ষণ্ডের মতো–দেখুন স্যার, খুন করাটা আমার ব্যবসা। ব্যবসায় বেইমানি করলে আর কেউ কাজ দেবে?
শূন্য গেলাসটা নামিয়ে রাখলাম ককটেল টেবিলে। ঠান্ডা গলায় বললাম, মস্তান, কি চাও তাহলে? ভয়ে কাঁপছি দেখলে খুশি হবে?
কাঁপতে আপনাকে হবেই। ঢের ঢের হেঁকর দেখেছি। শেষকালে তো কেঁদে কুল পায় না।
কাঁদলেই গুলি করবে বুঝি? ঈষৎ শক্ত হল গালপাট্টার বোকা চাহনি–কেন মিছে কেরদানি দেখাচ্ছেন? বুক তো ঢিপ ঢিপ করছে। এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন কলির ভীম আর কি।
বাঃ, বেশ গুছিয়ে বলো তো মস্তান। দেখে তো বোঝা যায় না এত কথা পেটে আছে। যাক, তুমি কি ভাবো তোমার হুমকি শুনেই ঊ্যা করে কঁদবো?
ভ্যাঁ না করলেও চ্যা তো করবেন। মরার আগেই আধখানা প্রাণ বেরিয়ে আসবে। কত তালেবরকে কাত করলাম এইভাবে।
সর্বস্ব দিয়েও কেউ যদি প্রাণ ভিক্ষা চায়?
বৃথা।
মানুষ হিসেবেও তো মানুষকে দয়া করা যায়?
আমি অমানুষ। আমার ছেলেবেলায় আমাকে কেউ দয়া করেছিল? মানুষের মতো কেউ বাঁচতে দিয়েছিল?
মস্তান, ছবিটা আর একবার দেখো। ছবির পেছনে কি আছে জানো?
বলুন না। ঘাড় না ফিরিয়েই বলল মস্তান।
দেওয়াল সিন্দুক।
গালপাট্টা ঘাড় ফিরালো না।
নগদ দেড়লাখ টাকার নোট পাবে সিন্দুকে।
দেড়লাখ!
হ্যাঁ, দেড়লাখ। সারা জীবনেও যা রোজগার করতে পারবে না।
বলে, গেলাস হাতে নিয়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম। গেলাম অয়েল পেন্টিংয়ের সামনে। গোপন বোতাম স্পর্শ করতেই কজার ওপর ঘুরে গেল অতবড় ছবিটা যেন দরজার পাল্লা।
দেওয়াল সিন্দুকের ঠিক মাঝখানে নম্বরী হাতল। পাক দিলাম গুনে গুনে। সিন্দুক খোলার কোড নম্বর আমি ছাড়া কেউ জানে না। অলকানন্দাও নয়।
খট করে আওয়াজ হল। সবুজ আলোটা জ্বলে উঠেছে। অর্থাৎ চিচিং ফাঁক। আলিবাবা আর চল্লিশ দস্যুর সেই রত্নগুহার দ্বার যেন উন্মোচিত।
হাতল ধরে টান দিলাম। নীচের খুপরি থেকে বার করলাম বড় খামটা। হাতের গেলাসটা রাখছিলাম সিন্দুকের ভিতরে। পাল্লা বন্ধ করে নম্বরী হাতল ঘুরিয়ে দিতেই পুট করে নিভে গেল সবুজ আলোটা। যার অর্থ, সিন্দুক বন্ধ হয়ে গেছে। কামান দাগলে যদি খোলে।
ফিরে দাঁড়ালাম। দেখি, পলকহীন চোখে আমার প্রতিটি মুভমেন্ট লক্ষ্য করছে গালপাট্টা। তর্জনী চেপে বসেছে মিশমিশে হাতিয়ারের ট্রিগারে।
বিচলিত হলাম না। এগিয়ে এসে খামটা ফেলে দিলাম ওর সামনে।
কিছুক্ষণ যেন বোবা হয়ে রইল গালপাট্টা। তারপর ফ্যাসফেসে গলায় বললে–কিনতে চান আমাকে?
সিগারেট কে তুলে নিয়ে একটা সিগারেট বাছলাম অনেকক্ষণ সময় নিয়ে। তারপর গম্ভীর গলায় বললাম–না।
তবে টাকা আনলেন কেন?
একেবারেই উচ্ছন্নে যে যায়, তাকে টাকা দিয়েও কেনা যায় না।
টাকার খাম আনলেন কেন তাহলে? কঠিন স্বর গালপাট্টার।
জবাব দিলাম না। লাইটার টিপে সিগারেট জ্বালালাম। একমুখ ধোঁয়া সিলিং লক্ষ্য করে ছাড়লাম। তারপর খামটা তুলে উপুড় করে ধরলাম ককটেল টেবিলের ওপর।
ভেতরে থেকে যা বেরুল, তা নোটের তাড়া নয়–কাগজের তাড়া।
বোগাস পেপার, ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট নাচিয়ে নাচিয়ে বললাম একই রকম গম্ভীর গলায়। সেই সঙ্গে লক্ষ্য করলাম যেন একটা ধাক্কা খেল গালপাট্টা। নির্বোধ চাহনিতে এই প্রথম দেখলাম ইস্পাতের ছুরি।
খানিকটা সময় নিলেন বুঝলাম, আরক্ত মুখ মস্তানের। কেন?
তোমার গেলাসটা রেখে এলাম সিন্দুকের ভেতর। টাকা আনার অছিলা না করলে পারতাম না।
ওটা আপনার গেলাস–আমার নয়।
আবার হাসলাম আমি–নাহে, ওটা তোমারই গেলা। পুলিশ এসে যখন দেখবে, ফাঁকা সিন্দুকে শুধু একটা খালি গেলাস, টনক নড়বেই। আঙুলের ছাপও নেবে। কারণ, খুনের তদন্তে মদের গেলাস থাকাটার মানে অনেক।
চোখ ছোট করে তাকিয়ে রইল গালপাট্টা–অসম্ভব। সমানে নজর রেখেছি আপনার ওপর। গেলাস সরাতেই পারবেন না।
আবার হাসলাম আমি–বার দুয়েক ছবিটার দিকে ঘাড় ফিরিয়েছিলে মনে আছে?
সে তো দু-এক সেকেন্ডের জন্যে।
দু-এক সেকেন্ডেই যথেষ্ট। গেলাস পাল্টাপাল্টি করতে কতক্ষণ লাগে?
অসম্ভব দেখলাম, কপালে ঘামের আভাস দেখা দিয়েছে গালপাট্টার।
বললাম–পুলিশ আসবে। গেলাসও পাবে। আঙুলের ছাপের ছবি উঠবে। তোমার ঠিকানাও মিলবে। তারপর? যথা সময়ে দুলবে ফাঁসির দড়িতে। পরকালে ফের দেখা হবে আমাদের। তখন না হয় শোনা যাবে ফাঁসিকাঠে দাঁড়ানোর যন্ত্রণা কাহিনি। এর চাইতে গুলি খেয়ে মরা ভালো, তাই? ভালো কথা, ফাঁসিতে ঝোলার গল্প-টল্প এর আগে শুনেছ?
মস্তানের তর্জনীর দিকে নজর গেল। আঙুল কাঁপছে। আঙুল চেপে বসেছে ট্রিগারের ওপর।
