আবার বললাম–তোমার নাম জানি না। ভাই মস্তান, বলেই ডাকা যাক। রাগ করলে নাকি? করলেই বা কি। করলেও গুলি করবে। না করলেও গুলি করবে। শোনো মস্তান, আমার শত্রুদের নাম আমি জানি। আমি পটল তুললে লাভ কার-কার, তাও জানা। তাই অনুমান করতে পারি, কার ভাড়া খাটছো তুমি। বলব?
গালপাট্টা নীরব।
আমার বউয়ের, বললাম আমি। হাসিমুখেই বললাম। অবাক কাণ্ড তাই না? আরে মশাই, গালপাট্টা নিজেও তাজ্জব বনে গেল আমার হাসি দেখে, আমার ঠান্ডা মাথায় কথা বলা দেখে। বেচারী জানবে কী করে যে বাঁদুরে বুদ্ধিতে জুড়ি নেই আমার?
তাই সেকেন্ড কয়েক হাঁ করে তাকিয়ে রইল গালপাট্টা। তারপর ফুলো গালে টোল ফেলে ফ্যা-ফ্যা করে হেসে ফেলল। ধরেছেন ঠিক। কেন জানেন?
কেন আবার। আমার টাকা।
গালপাট্টার বোকা বোকা চোখেও এবার যেন একটা বিরাট কৌতুক দেখা গেল–শুধু তাই?
আবার কি?
মশায়ের বয়সটা খেয়াল আছে?
তা আছে বইকি। এ বছরের বসন্তকালে বাহান্ন হবে।
বসন্ত! বলে, এমন একটা নোংড়াচুমকুড়ি ছাড়ল গালপাট্টা যে এই প্রথমে একটু রাগ হল আমার। ছেড়ে বলল–বউটার বয়স কত?
বাইশ।
আই-আই! আবার সেই হলদে হাসি ইডিয়ট! বাহান্নর সঙ্গে বাইশ। আর কি চান স্যার? শুধু–এই দোষেই তো নেড়িকুত্তা দিয়ে খাওয়ানো উচিত আপনাকে। বুড়ো বয়েসে মেয়ের বয়সি মেয়েকে নিয়ে শুতে লজ্জা করে না?
মহাবাচাল খুনে তো। রিভলভারটা হাতে না থাকলে ডালকুত্তা দিয়ে খাওয়াতাম শূয়ারকে। তাও তো আসল ব্যাপারটা জানে না হতভাগা। আমি তেঁড়া পুরুষ–একথা জানা থাকলে না জানি কি খিস্তিটাই শুনতে হত।
ককটেলটা মন্দ মেশেনি। আর এক চুমুক খেলাম। জিভ দিয়ে ঠোঁট মুছে নিয়ে বললাম–মস্তান, কথাটা খাঁটি বলেছো। বছর খানেক পরে ডাইভোর্স করার প্ল্যান নিয়ে বিয়েটা করেছিলাম। রফা একটা করতাম। মোটা টাকার রফা।
গালপাট্টা বলল–চেখে চেখে বেড়ানোর সখ আছে মনে হচ্ছে?
টাকা থাকলেই থাকে। আমার টাকা আছে, মেয়ে মানুষের সখ আছে। মদ খাওয়ার সখ আছে। কিন্তু মরবার সখ নেই।
সখ আপনার ডবকা বউটারও আছে। ফুর্তির সখ। দেখেননি কেন অ্যাদ্দিন?
আমি মিশমিশে রিভলভারের অন্ধকার ফুটোর দিকে চেয়ে বললাম–মস্তান, জীবনে কটা খুন করেছ?
ডজন ডজন।
ফাইন। খুন করাটা কারো পেশা, কারো নেশা। তোমার কোনটা?
নেশা। ভীষণ ভালো লাগে খুন করতে।
সুরার নেশায় চোখে রং ধরলেও মন আমার হুঁশিয়ার। ওই একটা কথার মধ্যেই গালপাট্টার চরিত্র জানা হয়ে গেল আমার। সেকেন্ড। কয়েক নির্নিমেষে চেয়ে রইলাম ওর নির্বোধ কিন্তু অটল চাহনির পানে।
তারপর হেসে বললাম–দু-মিনিট তো হয়ে গেল হে। গুলি করো।
করব, করব। তাড়াহুড়ো করলে ভাল্লাগে না।
তাই বলো। তিলে তিলে মারতে চাও। সেইটাই তোমার আসল আনন্দ, ঠিক কিনা?
ওরে আমার গণৎকার রে।
গণৎকার নয় হে। রতনে রতন চেনে। যাক, তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে কী? না, আমি যতক্ষণ না ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তোমার পায়ে ধরছি, ততক্ষণ আমাকে জইয়ে রাখবে।
তাতো বটেই, তবে তারও একটা সীমা আছে তো।
তা আর বলতে। লোহার নার্ভকে টলানো যায় না। বরং গুলি করা ভালো। যাক, এক গেলাস চলবে নাকি?
চলবে। তবে আমার সামনে ঢালুন গেলাস।
সাবাস মস্তান। হুঁশিয়ার খুনে তুমি ভাবছ বিষ মিশিয়ে দেব?
দিতেও তো পারেন।
কথা বাড়ালাম না। আর এক গেলাস ককটেল পাঞ্চ করলাম ওর সামনেই। গালপাট্টা কড়া নজর রাখল আমার নড়াচড়ার ওপর। বেচাল দেখলেই ট্রিগার টিপতে দ্বিধা করবে না।
বরফ ভাসিয়ে এগিয়ে দিলাম গেলাস। হাত বাড়িয়ে গেলাস ধরল না মস্তান। বলল টেবিলে রাখুন। ঠিক আছে। চেয়ারে বসুন।
আমি বসলাম। মস্তান এগিয়ে এল। গেলাস নিয়ে বসল ইজি চেয়ারে। এক চুমুকে না খাওয়া পর্যন্ত কোনও কথা বললাম না।
এক চুমুকেই মেজাজ শরিফ হবে জানতাম। এ জিনিস মস্তানের চোদ্দো পুরুষও খেয়েছে কিনা সন্দেহ।
তারপর বললাম–অলকানন্দা এখন কোথায়?
কে?
অলকানন্দা। আমার বউ।
পার্টিতে। ডজন খানেক ছেলেবন্ধু নিয়ে হয়তো ঢলাঢলি করছে এই মুহূর্তে। দেখলেও ভালো লাগে। তা না আপনি..বুড়োহাবরা…।
তার মানে, আমি যখন গুলি খাব, অলকানন্দা তখন পার্টি নিয়ে মশগুল।
কষ্ট হচ্ছে?
মোটেই না। ভাবছি প্ল্যানটা ফাইন। ডজনখানেক ইয়ার সাফাই দেবে ওর হয়ে। পুলিশ অলকানন্দার ডগাও ছুঁতে পারবে না।
ঠিক ধরেছেন। বুদ্ধিটা আমার।
গোবর গণেশের বুদ্ধি! মনে মনেই বললাম আমি। মুখে বললাম–ব্রিলিয়ান্ট প্ল্যান। পুলিশ আসবে। আমার ঝাঁঝরা লাশ দেখবে। দেখে কী বলবে? খুনে-ডাকাতের কাণ্ড? তাই তো?
তা তো বটেই, গেলাসটা সামনের ককটেল টেবিলে রাখল মস্তান।
আপনার হার্টটা ফুটো করবার পর গেলাসটা ধুয়ে রেখে দেব মদের আলমারিতে। আমার আঙুলের ছাপ যেখানে লেগেছে, যাবার আগে সব মুছে দিয়ে যাব রুমাল দিয়ে। লেগেছে তো শুধু দরজার হাতলগুলোয় আর এই গেলাসে।
দামি দামি দু-চারটে জিনিস সঙ্গে নেবে নিশ্চয়? নইলে পুলিশ বলবে কেন ডাকাত পড়েছিল?
ও সব ছ্যাচড়ামোর মধ্যে আমি নেই। কিছুই নেবো না আমি। পুলিশ ভাববে, ভয়ের চোটে পালিয়েছে ডাকাত। গুলি করেই এমন প্যানিক হয়ে ছিল যে জিনিস নেবার সময় পায়নি।
দেওয়ালের ছবিটা দেখে নিল মস্তান।
ন্যাংটা ছবি, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিয়েই বলল।
