বলে, আবার বোঝাতে শুরু করলাম কীভাবে বিদুর পাণ্ডু এবং আরও অনেকে পরভৃত সন্তান। এই ভারতবর্ষের পুণ্য মাটিতে যুগ-যুগ ধরে চলে এসেছে নিয়োগ-প্রথা। বহু পুণ্যবতী সন্তানবতী হয়েছে এই প্রথায়। মোটেই ক্ষুণ্ণ হয়নি সতীত্বের আদর্শ। কেন হবে? পতির নির্দেশেই তো পরপুরুষের সঙ্গসুখ গ্রহণ করেছে। পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা..
ছলনা জিনিসটা নাকি মেয়েদের একচেটিয়া। সুতরাং অলকানন্দাও যৎসামান্য ছলনা করল বইকি। সতীত্বপনা না দেখালে স্বামীর মন রাখা যায় না যে। তা ছাড়া, এ প্রস্তাব অলকানন্দার কাছে মেঘ না চাইতেই জল পাওয়ার সামিল। ঐশ্বর্য, স্বামী কোনওটাই হাত ছাড়া হচ্ছে না। কিন্তু হাতের মুঠোয় আপনা হতে এসে যাচ্ছে একটা বাড়তি সুখ।
দেহসুখ।
কাজেই রাজি হল অলকানন্দা। ঠিক হল দয়িত নির্বাচনের ভার অলকানন্দার। বল্লভবরণ করবে সে কেবল সন্তানবতী হওয়ার জন্যে–তারপর আর কোনও সম্পর্ক থাকবে না।
সাধারণ গৃহস্থের কাছে এ জাতীয় দাম্পত্যচুক্তি সত্যিই কল্পনাতীত। রক্ষণশীল পাঠক-পাঠিকা নিশ্চয় এই মুহূর্তে আমার মুখে নিষ্ঠাবান ত্যাগ করতে পারলে পরম উল্লসিত হতেন। কিন্তু আমি নিরুপায়।
তা ছাড়া অলকানন্দার কথাটা ভাবুন। আমার অতি কদর্য প্রস্তাব সে ফেলতে পারেনি। সাদরে গ্রহণ করেছে। যৌবন-নিপীড়িত দেহের প্রতিটি অণু-পরমাণু দিয়ে ভোগ করেছে।…তারপর!
তার পরের কথা পরে বলব।
আপাতত শুনুন অলকানন্দার কাহিনি। আমি তাকে গ্রীন সিগন্যাল দেবার পর অলকানন্দা প্রজাপতির মতোই উড়তে শিখল। তার ওড়ার বিবরণ মাঝে মাঝে কানেও এল। কিন্তু আমি কর্ণপাত করলাম না, বরং সেই গোপন শিহরণে রোমাঞ্চিত হলাম। রঙিন সে সব কাহিনি দিয়ে এ কাহিনি ভরাতে চাই না। অলকানন্দা রূপসী, অলকানন্দার স্বামী ধনবান, অলকানন্দা সমাজের শীর্ষস্থানীয়া– সুতরাং অভাব ঘটল না মধুমক্ষিকা বাহিনীর। অলকানন্দা পরমানন্দে বিভোর হল।
এই গেল আমার আত্মকাহিনি প্রথম পর্ব। এবার শুনুন দ্বিতীয়পর্ব।
অলকানন্দা যথারীতি পার্টিতে গিয়েছে। আমি সারাদিনের কাজকারবার সেরে বাড়ি ফিরেছি। রোজকার অভ্যেস মতো সুরার পাত্র নিয়ে বসেছি। সারা পৃথিবী চষে আনা সেরা সেরা মদিরা পাবেন আমার আলমারিতে। নেমন্তন্ন রইল। যে দিন খুশি আসতে পারেন।
খুব মন দিয়ে একটা নতুন ককটেল পাঞ্চ করছিলাম। পাঁচরকম সুরা মিশিয়ে, তাতে বরফখণ্ড ভাসিয়ে, বিটার আর লেমনজুসের ছিটে দিয়ে অপূর্ব এক গেলাস ককটেল বানালাম। এক চুমুক টেনে এত ভালো লাগল যে আঃ ধ্বনিটা পরম আমেজেই বেরিয়ে এল সরল কণ্ঠ দিয়ে।
ঠিক তখনি পেছন থেকে কে যেন বললে–হয়েছে? এবার ফিরুন। আর কতক্ষণ দাঁড়াবো?
মিথ্যে বলব না। আচমকা কণ্ঠস্বর আমাকে রীতিমতো চমকে দিয়েছিল। কিন্তু কি জানেন, গুরুর দয়ায় আমার মন চমকালেও বাইরেটা কখনো চমকায় না। তাই ধীরস্বরে পেছন ফিরলাম।
ফিরে দেখলাম, একটা কিম্ভুতকিমাকার মানুষ দাঁড়িয়ে আমার পাঁচ হাত পেছনে। হাতে একটা রিভলভার।
লোকটাকে কিম্ভুতকিমাকার বললাম অন্য কারণে। আজকাল কি এক ফ্যাশান হয়েছে মোটা মোটা জুলপি রাখার। মানাক আর না মানাক, মুখ সরু হোক কি চেহারা লিকপিকে হোক–জুলপি রাখতেই হবে। জুলপিধারী ভাবে না জানি কি খোলতাই হয়েছে মুখশ্রী। আর আমি ভাবি, চিড়িয়াখানার বনমানুষ, না, সার্কাসের সঙ?
তা, সেদিন যা দেখলাম, তাকে জুলপি না বলে গালপাট্টা বলা উচিত। দু-গাল জুড়ে ইয়া মোটা দাড়ি। চিবুকে একটাও চুল নেই। গোঁফও নেই। চুলের বহর কেবল দু-গালে। ফুলো ফুলো গাল। মাথার মাঝখানটা গড়ের মাঠের মতো পরিষ্কার। কানের ওপর কয়েকগাছি চুলের সংখ্যা গুনে বলা যায়। সার্সির কাঁচে নাক চেপে ধরলে ডগাটা যেরকম বিচ্ছিরি থ্যাবড়া দেখায়, এর নাসিকাগ্রও তাই। চোখ দুটোতে ডাহা বোকামি মাখানো।
এহেন মানুষকে কিম্ভুতকিমাকার বলব না তো কাকে বলব?
বোকা হোক, গাধা হোক, সঙ হোক, বিদঘুঁটে হোক–একটা বিষয়ে আনাড়ি নয় আগন্তুক। রিভলভার ধরার কায়দা দেখলেই মালুম হয়, জিনিসটা ও হাতে ভালোই চলে। আগুন নিয়ে খেলাটা যেন জলভাত তাঁর কাছে।
তাই একটু ভাবিত হলাম বইকি। যার চোখে ডাহা বোকামি মাখানো, চেহারাখানা গালফুলো গোবিন্দমার্কা, তার হাতে মানুষ মারার যন্ত্র বিপজ্জনক নয় কি?
কিন্তু ওই যে বললাম গুরুর দয়া। তাই ভাবনাটাকে চোখের ধারে কাছেও ঘেঁষতে দিলাম । বরং একটু মোলায়েম হাসলাম। গেলাস দুলিয়ে ককটেল মেশাতে লাগলাম। ফলে, কাঁচের গেলাসে বরফ লাগায় টুং টাং বাজনা বাজতে লাগল। মিষ্টিচোখে এমন ভাবে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করলাম নাড়ুগোপাল আগন্তুকের যেন কন্দর্পকান্তি উত্তমকুমারের আবির্ভাব ঘটেছে আমার সামনে।
আর একটা চুমুক দিলাম গেলাসে। না, মশাই না। হাত কাঁপেনি। কঁপবে কেন? কুকাজে আমিও কি কমপোক্ত?
ধীরে সুস্থে বললাম–কী ব্যাপার? খুন করা হবে নাকি আমাকে?
গালপাট্টাধারী ফ্যাসফেসে গলায় বললে–তবে না তো কি জামাই আদর করব?
বেশ, বেশ, বলে, ফের চুমুক দিলাম তারিয়ে তারিয়ে। তারপর মিষ্টি মিষ্টি করে বললাম– কেন মরবো, সেটা না জেনে মরাটা কি ঠিক হবে? কে পাঠিয়েছে?
গালপাট্টার মুখের আর কোনও কথা নেই। রিভলভারের নলচেটা অবশ্য আমার বুকের দিকেই ফেরানো। নলচের অন্ধকার গর্তের সঙ্গে কেন জানি না পাতালের সুড়ঙ্গর সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছে হল। জগতে পাপপুণ্য বলে কোনও বস্তু যদি থাকে, পরকালের অস্তিত্ব যদি মেনে নিতে হয়। তাহলে পাতালের পথই তো আমার পথ। নরকের কুণ্ডই তো আমার শেষ পরিণতি। কীর্তির কাহিনি আজ শোনাতে বসেছি।
