অলকানন্দাকে সংগ্রহ করলাম সেই কারণেই। দামি দামি ফার্নিচারের মতোই তাকে সাজিয়ে রাখলাম আমার সাজানো ঘরে। কেউ মুগ্ধ হল, কারো চোখ টাটাল, কেউ ঘনঘন যাতায়াত আরম্ভ করল আমার প্রাসাদে।
আমি কিন্তু নির্বিকার রইলাম। বিকার দেখিয়েই বা লাভ কি আমার? ভোগস্পৃহা থাকলেও ভোগক্ষমতা তো আমার নেই।
কিন্তু অলকানন্দার ছিল। অলকানন্দা বিশ বছরের পূর্ণ যুবতী। আজন্ম দারিদ্র্য ভোগ করার পর সহসা ঐশ্বর্যের আলোয় তার চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছে। ভোগ-কামনার সকল উপাদানই তিলতিল করে প্রলুব্ধ করেছে তাকে।
না, না, আপনারা যা ভাবছেন, এ গল্প সে গল্প নয়। ভাবছেন এরপর সব সংসারে যা হয় এ সংসারেও বুঝি তাই হল। অলকানন্দা যুবক প্রেমিক সংগ্রহ করে হয় চম্পট দিল, অথবা, ভোগের পথে গা ভাসালো।
কিন্তু অলকানন্দা সে সবের ধার দিয়েও গেল না। সে দরিদ্র ছিল বটে, কিন্তু বুদ্ধিহীনা ছিল না। সে জানত ওসব পিচ্ছিল পথে একবার পা দিলে সামলানো বড় মুশকিল। আমাকে ছাড়া যায়, কিন্তু আমার বিপুল বৈভবকে হাত ছাড়া করা যায়?
ওই যে বললাম, নারীজাতি যতই দুর্জেয় হোক, একটি বিষয়ে তারা নেহাতই অকপট। সেটি অর্থ। তারা সব ত্যাগ করতে পারে, পারে না কেবল অর্থ। কারণ, এই অর্থর বনেদেই তো সংসার। অর্থ থাকলেই প্রেম থাকে, কর্তব্য থাকে, সংসারেও টান থাকে।
পাঠিকারা নিশ্চয় ভ্রকুঞ্চন করছেন। মুণ্ডপাতও করছেন। কিন্তু আত্মকাহিনিতে মিথ্যে বলতে নেই। আমার কথা আমি বলে যাই। সত্যি মিথ্যে বিচারের ভার আপনাদের।
হ্যাঁ, যা বলছিলাম। অলকানন্দা কোনওদিন তার যৌবনের ক্ষুধা নিয়ে অশান্ত হয়নি। অস্থির হয়নি। বাইরে মন দেয়নি।
তাই ধীরে ধীরে আমার মনের মধ্যে যে চিন্তাটার অঙ্কুর দেখা দিল, তা আমি আত্মকাহিনির গোড়াতেই বলেছি।
নিয়োগ-প্রথা। পুরাকালে যা ঘটেছে। একালে তা ঘটবে না কেন? পরপুরুষের বীজ গ্রহণ করে নারী সন্তানবতী হয়েছে সেকালে–একালে হলে দোষ কি? হলেই বা পরভৃত সন্তান। আমার বিপুল বৈভবের একজন উত্তরাধিকারী তো প্রয়োজন।
তাছাড়া পুরাণ তো আমাদের শেখায়। সমস্যায় সুরাহার পথ দেখায়। নিয়োগ-প্রথাও কি আমার পারিবারিক জীবনে সমাধানের পথ নয়? স্ত্রী-কে সন্তানবতী করা অপারগ স্বামীর পক্ষেও সম্ভব এবং সে বিধান তো প্রাচীন পুরাণেই রয়েছে।
পাঠক-পাঠিকার মধ্যে যাঁরা মনোবিজ্ঞান নিয়ে চর্চা করেন, তাঁরা বোধকরি অন্য সন্দেহ করে বসেছেন। ভাবছেন, আমি Sadist। বিকৃত রুচির দাস। নইলে ঘরের বউকে নিয়োগ-প্রথার রাস্তা দেখাবো কেন?
আবার বলি, আত্মকাহিনীতে মিথ্যে বলতে নেই। তাই বলি, এজাতীয় একটা কেতাব অনেকদিন আগে আমার হাতে এসেছিল। নানারকম বিকৃতি আর অপরাধের ঘটনা পড়তে মন্দ লাগেনি। শুনেছি, তরুণী ভার্যাদের অনেক বৃদ্ধ উৎসাহিত করে তরুণমহলে গা ভাসাতে। গোপনে সেই দৃশ্য দেখে নাকি আবেশে বিহ্বল হয়ে পড়ে অক্ষম স্বামী পুঙ্গবা।
মিথ্যে বলব না। নিয়োগ-প্রথার কল্পনা ঠিক এই জাতীয় না হোক, বিচিত্র একটা অনুভূতি বারংবার জাগ্রত করেছে আমার সর্বদেহে। আমি পঙ্গু। আমি নির্বীজ। কিন্তু যখনি অন্তরের কন্দরে লালন করেছি নিয়োগ প্রথার সুখাবহ চিন্তাকে, মনের সিনেমায় ছবি দেখেছি অলকানন্দার স্বেদসিক্ত আবেশ বিহ্বল তন্বীরূপকে, তখনি প্রতিটি লোমকূপে অদ্ভুত একটা শিহরন অনুভব করেছি। অনাস্বাদিতপূর্ব এ শিহরণের ব্যাখ্যা আমি জানি না। কিন্তু এ রোমাঞ্চর সঙ্গে যেন তুলনা হয় না কোনও কিছুর।
বিকৃতি? হতে পারে। কথায় বলে, কানা, খোঁড়া, কুঁজো–তিন চলে না উজো। মানে, এই তিন পঙ্গু কখনো সোজা পথে চলে না। আর আমার মতো পঙ্গু বেঁকা পথে চলব, এ আর আশ্চর্য কি। দেহ-বিকৃতি থেকেই যে মন-বিকৃতি।
সে কথা থাক। অলকানন্দার কোল জোড়া হবে, অলকানন্দা সুখী হবে, আমার উত্তরাধিকারী আসবে, এই কল্পনাই হয়তো বিচিত্র সুখানুভূতিতে আমার মগজ ভরিয়ে তুলত–এমন একটা ব্যাখ্যাও তো হতে পারে?
তাই নিয়োগ-প্রথার কল্পনা প্রতিবারই আনন্দ দিয়েছে আমাকে। উন্নাসিক ব্যক্তিরা হয়তো শিউরে উঠবেন। ছিঃ ছিঃ, এ যে সামাজিক কদর্যতা।
কিন্তু আমি মানুষটাই যে কদর্য। বাইরে নয়। বাইরে আমি সুপুরুষ, মহান এবং উদারচেতা। কিন্তু আমার ভেতরে যে কদর্যত মৌচাকের মতো বাসা বেঁধে আছে। সংসারে হেন কদর্য কাজ নেই, যাতে আমি হাত পাকাই নি। সুতরাং, নিয়োগ-প্রথার কল্পনা আমাকে উল্লসিত করবে, এইটাই হয়তো স্বাভাবিক।
সব চাইতে আশ্চর্য কী জানেন? আমি কদর্য হতে পারি, কিন্তু অলকানন্দা নিশ্চয় নয়। সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। অতএব তার মতো ডানাকাটা রূপসীর ভেতরটাও দেবীজনোচিত হবে–এইটাই কি আপনারা ধরে নিয়েছেন।
আশ্চর্য সেইখানেই। অলকানন্দাকে নিয়োগ-প্রথার প্রস্তাব বেশিক্ষণ বুঝাতে হয়নি। যুক্তিতর্কের জাল বিছিয়ে বসেছিলাম ওর মস্তিষ্কধোলাই করব বলে। নিয়োগ-প্রথার দাওয়াই গুলে না খাওয়ালে সাড়া দেবে কেন মেয়েটা?
হায়! হায়! কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, অলকানন্দা আমার চাইতেও স্মার্ট। প্রথমে হাঁ করে শুনছিল। তারপর চোখ কপালে তুলে মুখখানা সিঁদুরের মতো লাল টকটকে করে ফেলল। তারপর ফিক করে হেসে ফেলে বললে–যাঃ!
আমি আবার সেই শিহরণটা অনুভব করলাম মেরুদণ্ডের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত। ওকে বুকের কাছে টেনে নিলাম। তুলতুলে গালদুটো টিপে দিলাম। কালো জামের মতো কালো-কালো চোখ দুটোর পানে তাকিয়ে নিবিড়কণ্ঠে বললাম–ঠাট্টা নয় অলকানন্দা। মহাভারতে যা আছে, তা কি খারাপ?
