প্রস্তাবে প্রস্তুত, অপরেশ? কুন্তল প্রশ্ন করলেন। দীর্ঘ পুরুষটি মাথা হেলিয়ে সায় দিলেন।
না! না! চিৎকার করে উঠলেন মনিকা।
ছিপি খুলে ফেললেন কুন্তল। পাশের টেবিল থেকে এক প্যাকেট তাস তুলে নিলেন। কার্ড এবং বোতল রইল পাশাপাশি।
মনিকার ওপর আমরা দায়িত্বটুকু ছেড়ে দিতে পারি না। বললেন তিনি ও এস অপরেশ, তিনের মধ্যে একটি বেছে নাও।
অপরেশ টেবিল অভিমুখে অগ্রসর হলেন। অঙ্গুলি নির্দেশ করে দেখিয়ে দিলেন মৃত্যুনিদেশী তাসগুলি। স্ত্রীলোকটি হাতের ওপর ভর দিয়ে সম্মুখে ঝুঁকে পড়লেন এবং উদভ্রান্ত দৃষ্টি মেলে রইলেন তাকিয়ে।
আর ঠিক এই সময়ে যেন বজ্রপাত হল। আগন্তুক উঠে দাঁড়িয়েছে। বিবর্ণ এবং গম্ভীর সে।
আচম্বিতে তিনজনেই তার উপস্থিতি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠলেন। প্রত্যেকে তার দিকে ফেরালেন মুখ। চোখে তাঁদের ব্যগ্র অনুসন্ধিৎসা। আগন্তুক শান্ত, বিষণ্ণভাবে তাঁদের দিকে তাকাল। কর্তৃত্বব্যঞ্জক তার আকৃতি।
একি হলো? একসাথে প্রত্যেক শুধোলেন। রাবিশ! উত্তর দিলে সে রাবিশ! সমস্ত রীলটা আবার আমাদের আগামীকাল তুলতে হবে!
* রহস্য-পত্রিকায় প্রকাশিত। বৈশাখ ১৩৬৩।
নিয়োগ প্রথা
প্রথাটা নতুন কিছু নয়। অনেক প্রাচীন। নিয়োগ-প্রথার বহু নজির আছে ভারতের পৌরাণিক ইতিবৃত্তে। বিবাহিতা নারী পরপুরুষের সাহচর্যে সন্তানসম্ভবা হতে পারে এই প্রথায়।
পুরাণে যা আছে, তা কি সামাজিক কদর্যতা হতে পারে? বিদুর এবং পাণ্ডুর মতো ব্যক্তিরা যদি নিয়োগ প্রথা অনুযায়ী পরভৃত সন্তান হয়েও সমাজ শিহরামান হতে পারেন, তবে একালেও তা সম্ভব হবে না কেন?
ভয়ঙ্কর সেই অ্যাকসিডেন্টের পর থেকেই এ চিন্তা যেন উর্ণনাভের মতো জাল বুনে চলেছে আমার মগজে। চিন্তার জট যতই জটিল হয়েছে, নিয়োগ প্রথা ততই উঁকিঝুঁকি মেরেছে মস্তিষ্কের কোষে কোষে।
অভিশপ্ত সেই দুর্ঘটনায় মানুষ বাঁচে না। কিন্তু ভোগান্তি আমার কপালে আছে। নইলে বেঁচে গিয়ে মরে থাকব কেন?
ভাবছেন বুঝি হেঁয়ালি করছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ও জিনিসটা আমার চরিত্রে নেই। তাই কাগজ কলম নিয়ে বসেছি বিচিত্র এই আত্মকাহিনি লিখতে।
পড়তে-পড়তে আপনার মনে হতে পারে উদ্ভট, অলীক, অবিশ্বাস্য। মনে হতে পারে, ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনায় মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে গিয়েছে আমার। তাই অসম্ভব কাহিনির অবতারণা করে ইন্ধন জোগাচ্ছি পঙ্গু কল্পনাকে।
পঙ্গু! সত্যিই আমি আজ পঙ্গু। কিন্তু কল্পনায় নয়। হাত-পা-চোখের মতো কোনও প্রত্যঙ্গও পঙ্গু নয়। পঙ্গু কেবল আমার পৌরুষ।
হ্যাঁ, আমার পৌরুষ। যে পৌরুষ প্রতিটি নারীর কাম্য। আজ তা অনুপস্থিত আমার মধ্যে। সংক্ষেপে বংশরক্ষায় আমি অক্ষম। বীজশূন্য আমার পুরুষ দেহ। তাই তো বলছিলাম, ভয়ঙ্কর সেই দুর্ঘটনা আমাকে নবজীবন দেয়নি–দিয়েছে জীয়ন্ত-মৃত্যু।
তা সত্ত্বেও বিয়ে করেছিলাম অলকানন্দাকে। কারণ অলকানন্দা এমনই মেয়ে যাকে দেখলেই বিয়ে করতে সাধ যায়। আমি প্রচণ্ড নাস্তিক। ঈশ্বর মানি না। স্বর্গ, মর্ত, পাতালের অস্তিত্ব স্বীকার করি না। কিন্তু শুধু আপনাকেই বলি, স্বর্গ বলে যদি সত্যিই কোনও দেবলোক থাকে এবং সেখানকার দেবসভায় উর্বশী কি তিলোত্তমাকে বিউটি-কনটেস্টে টেক্কা দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে স্বচ্ছন্দ্যে আমার বউ অলকানন্দাকে আপনারা নিয়ে যেতে পারেন। ইন্দ্র প্রমুখ বহু সৌন্দর্য-রসিকের মুন্ডু ঘুরিয়ে দেবার মতো রূপ নিয়ে মর্তে জন্মগ্রহণ করেছিল মানবী অলকানন্দা।
তবে হ্যাঁ, এই মুহূর্তে তাকে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। কেন, তা বলার জন্যেই এই উদ্ভট আত্মকাহিনির অবতারণা।
অলকানন্দার জন্ম গরীবের ঘরে। কিন্তু আমার আবির্ভাব অতি ধনী পরিবারে। সেইসঙ্গে ছিল আমার প্রয়াস এবং নাস্তিকতাবাদ। আমার বিশ্বাস, প্রকৃত নাস্তিক না হলে খাঁটি অসৎ হওয়া যায় না। আমার বিবেকেও ও সবের বালাই নেই।
ফলে যাবতীয় অপকর্মে আমি হাত পাকিয়েছি। বিবেককে টাকার আফিং খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি। তা না হলে পৌরুষহীন হয়েও অলকানন্দাকে বিয়ে করলাম কী করে?
টাকার জোরে তো বটেই। মেয়েদের চরিত্র যতই দুৰ্জ্জেয় হোক না কেন, একটা ব্যাপারে তারা অতিশয় অকপট। সেটি হল অর্থ। রৌপ্যমুদ্রার পর্বত এদেরকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে।
তাই অতি সহজেই অলকানন্দা আমার ঘরনী হল। জেনে শুনেই হল। তার নারী জীবনের চরম সাধ মেটাতে আমি অপারগ জেনেও হাসিমুখে সে বরমাল্য দিল আমার গলায়। চোখে চোখ রেখে হেসেও ফেলল।
আরও আছে। অলকানন্দা আমার চাইতে কত বছরের ছোট জানেন। তিরিশ বছরের। আমি পঞ্চাশ ছাড়িয়েছি। কোথায় বানপ্রস্থ অবলম্বন করব, তা না পাণিপীড়ন করে বসলাম অলকানন্দার। হঠাৎ ওকে চোখে পড়ায় মাথার মধ্যে যেন দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। সারা জীবনে অনেক মেয়ে মানুষ ঘেঁটেছি। কিন্তু এমন আহা মরি রূপ তো দেখিনি।
প্রেম? উঁহু। এ শর্মার অন্তর পাথর দিয়ে বাঁধানো। এ সব মেয়েলী ছেনালীপনা আমার আসে না। প্রেম-টেম নয় মশায়। বড়লোকের সংগ্রহবাতিক বলতে পারেন। হীরে মুক্তোর মতো দামি দুষ্প্রাপ্য জিনিস দেখলেই ছোঁ মেরে এনে কোষাগারে রাখার বদখেয়াল। এ খেয়াল আমারও আছে। কারণ আমি বড়লোক। অর্থের জাদু বলে সমাজের শীর্ষস্থানীয়। কাজেই ঠাটবাট বজায় রাখার জন্যে একজন অনিন্দ্য সুন্দরী প্রয়োজন বই কি।
