আর ওই নারীটি? পাশেই অর্ধশায়িতা এই সেই মোহিনী, হতভাগ্য সুন্দরী নারী–স্বপ্ন তার চূর্ণ, ষড়যন্ত্র তার উদঘাটিত, ভবিষ্যৎ তার অন্ধকার এবং বিপদসঙ্কুল। আর তবুও যে মহিলাটি তাঁকে বিষ প্রয়োগ করতে প্রস্তুত হয়েছে, তার জন্যেও তার চিত্ত হল আর্দ্র। তিনি ওর জীবনেতিহাসের কিছুটা জানেন। তিনি জানেন, ওর চাতুর্য, ওর সৌন্দর্য বাধা কাকে বলে তা জানে না। আর আজ একজন তার পথের প্রতিবন্ধক হয়েছেন, তাই ও উন্মাদের মতো নিমর্ম ষড়যন্ত্রে সে প্রতিবন্ধক দূর করতে হয়েছে বদ্ধপরিকর। অত্যন্ত প্রাচীন ও সম্ভ্রান্ত রাজবংশে কুন্তল রায়চৌধুরীর জন্ম। সারাটা জীবন তিনি শিক্ষা, কৃষ্টি আর শান্ত পরিবেশের মধ্যে মানুষ হয়েছেন। পক্ষান্তরে মনিকা দেবীর সারা জীবনে উদ্দামতা, আলোক-উচ্ছ্বাসের উল্লাসে ভরপুর, প্রকৃতির অমোঘ ধর্মানুযায়ী তারা ক্ষণেকের জন্য পরস্পরের প্রতি আকর্ষিত হয়েছেন, কিন্তু স্থায়ী বাঁধন অসম্ভব। এ বিষয়ে তাঁর চিন্তা করে দেখা উচিত ছিল, উপলব্ধি করা উচিত ছিল এই পরিণামের। তাঁর শিক্ষিত এবং সংযত মস্তিষ্কের ওপর এখন নির্ভর করছে সকল দায়িত্ব। সমস্যাপীড়িত অসহায় নাবালকদের ওপর যেভাবে মনটি অনুকম্পায় ভরে ওঠে, মনিকা দেবীর পরিণামের কথা ভেবে কুন্তলেরও চিত্ত দ্রবীভূত হয়ে উঠল। এতক্ষণ তিনি নীরবে ঘরের মধ্যে পায়চারী করছিলেন, ওষ্ঠ দৃঢ়বদ্ধ, হস্ত দুটি মুষ্টিবদ্ধ–শেষকালে হাতের তালুতে নখের দাগ গেল বসে। এখন তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে মনিকার পাশে বসলেন এবং মনিকার ঠান্ডা নিরাসক্ত হাতটি নিজের ওপর তুলে নিলেন। তার মস্তিষ্কে একটি চিন্তা হল জাগ্রত। সাহস না দুর্বলতা? প্রশ্নটি তার কানে বেজে উঠল, চোখের সামনে মূর্তি পরিগ্রহ করল এবং যেন কল্পনার চোখে দেখতে পেলেন যে জগতের সম্মুখে বড় বড় অক্ষরে সেটি প্রকাশিত হয়েছে।
কঠিন দ্বন্দ্ব, কিন্তু জয়ী হলেন তিনি।
মনিকা, আমাদের দুজনের মধ্যে একজনকে পছন্দ করে নিতে হবে তোমাকে। সোম যদি তোমাকে সুখী করতে পারে, তাহলে আমি সরে যাব।
বিবাহ-বিচ্ছেদ? রুদ্ধশ্বাসে মনিকা বললেন।
বিষের বোতলটি বেষ্টন করে ধরল কুন্তলের হাতটি? একেও তুমি ভাবতে পার। বললেন তিনি।
কুন্তলের ওপরে চোখ তুললেন মনিকা দেবী। নতুন এক অদ্ভুত প্রভায় সমুজ্জ্বল হয়ে উঠল তার চক্ষুদুটি। এ মানুষটি এতদিন তার কাছে ছিল অপরিচিত। সেখানে সংযত, বাস্তবধর্মী, দৃঢ়চিত্ত কুন্তল রায়চৌধুরী অদৃশ্য হয়ে গেছেন। তার স্থলে তিনি যেন দেখতে পেলেন মহাবীর এক শহীদকে, যিনি স্বার্থলেশশূন্য চিত্তধর্মের অমানবিক উচ্চতায় উন্নীত। তীব্র কালকূটের বোতলটি তিনি দুহাতে চেপে ধরলেন।
আমাকে ক্ষমা করো তুমি!
মৃদু হাসলেন কুন্তল : এখনও সেই ছোট্ট খুকিটিই আছ দেখছি।
দু-হাত কুন্তলের দিকে বিস্তার করলেন মনিকা। ঠিক সেই সময়ে দরজায় টোকার শব্দ শোনা গেল এবং ঘরে প্রবেশ করলো একটি পরিচারিকা। এই রহস্যময় কক্ষে যেভাবে প্রত্যেকে করে চলাফেরা, ঠিক সেই রকম অদ্ভুত নিঃশব্দে সে প্রবেশ করল। ট্রের ওপর একটি কার্ড। মনিকা সে দিকে এক লহমা তাকালেন।
অপরেশ সোম! আমি দেখা করবো না।
লাফিয়ে উঠলেন কুন্তল :
অভ্যর্থনা করে নিয়ে এসো। এই মুহূর্তে।
কয়েক মিনিট পরে দীর্ঘ, উন্নতনাসা, প্রশস্ত ললাট একজন যুবাপুরুষ ঘরে প্রবেশ করলেন। স্মিত বদনে প্রফুল্ল ভঙ্গিতে তিনি ঘরে ঢুকলেন। কিন্তু যখন দরজা তার পেছনে হল রুদ্ধ এবং সম্মুখের মুখ কটির ওপর পরিস্ফুট হল স্বাভাবিক ভাবপ্রকাশ, তখন ধীরে-ধীরে তার মুখ থেকে মিলিয়ে গেল হাসির শেষ রেশটুকুও। দুজনের মুখ পর্যায়ক্রমে দেখে নিলেন। বললেন, মতলব কী?
কুন্তল এবং তার কাঁধের ওপর একটি হাত রাখলেন।
বদ মতলব অন্তত নয়–কুন্তলের জবাব।
বদ মতলব?
আমি সব জানি। কিন্তু আমাদের অবস্থা পাল্টাপাল্টিভাবে হয়ে গেলে আমিও তাই করতাম।
এক পা পিছিয়ে গেলেন সোম এবং প্রশ্নভরা দৃষ্টিতে মনিকার দিকে তাকালেন। মনিকা মাথা হেলিয়ে সায় দিলেন, তারপর মনোরম গ্রীবাটি পুনরায় সোজা করলেন।
মৃদু হাসলেন কুন্তল :
স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ফাঁদ পেতেছি বলে শঙ্কার কোনও কারণ তোমার নেই। এ বিষয়ে আমাদের খোলাখুলি কথা হয়ে গেছে। শোন অপরেশ, চিরকাল তুমি স্পোর্টসম্যান। এখানে এই বোতলটা দেখ। কীভাবে এটা এল এখানে, তা নিয়ে চিন্তা করো না। যদি আমাদের মধ্যে একজন এটা পান করে তাহলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মনি, এবার বেছে নাও।
রহস্যময় ঘরটিতে সক্রিয় হয়েছিল আরও একটি রহস্যঘন শক্তি। কক্ষের মধ্যে উপস্থিত ছিল চতুর্থ একটি পুরুষ। যদিও জীবন-নাটকের সঙ্কটম মুহূর্তে তিনটি প্রাণী তার সম্বন্ধে মোটেই চিন্তা করেনি, করবার অবসরও ছিল না। কতক্ষণ ধরে সে সেখানে আছে, কতটুকু সে শুনেছে, কেউ বলতে পারে না। তিনটি প্রাণীর ক্ষুদ্র দল হতে বেশ খানিকটা দূরে দেওয়াল-গাত্রে সে গুঁড়ি মেরে বসেছিল। ভয়াবহ সর্পাকৃতি তার গঠন, নীরব এবং দক্ষিণ হস্তের ঈষৎ স্পন্দন ব্যতীত সর্বদেহ-স্থির। একটি চতুষ্কোণাকৃতি বস্তুর অন্তরাল থেকে সে রয়েছে দৃষ্টির অগোচরে এবং একটি কৃষ্ণবস্ত্র এমনভাবে বস্তুটিকে আচ্ছাদিত করেছে যে তারও অবয়বাদি লক্ষ্য করা যায় না। নিবিষ্ট মনে নাটকের প্রতিটি আবেগময় মুহূর্ত সে গভীর আগ্রহে লক্ষ্য করছে, তার মধ্যস্থতা করার সময় প্রায় আসন্ন। কিন্তু অপর প্রাণীত্রয় তার বিষয়ে চিন্তা করল খুবই অল্প। নিজেদের অভিনীত উদ্বেগ আর শিহরণময় নাটকে তারা এমন গভীরভাবে মগ্ন যে, চক্ষু এড়িয়ে গেল তাদের চেয়েও অধিকতর সক্রিয় একটি শক্তির, যে শক্তি যে-কোনও মুহূর্তে দৃশ্যের পরিচালনা-ভার তুলে নিতে পারে স্বহস্তে।
